মার্কিন অস্ত্রেও সুরক্ষা নেই, সৌদি আরবকে নাস্তানাবুদ করছে হুথিরা
বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৪০ অপরাহ্ন

মার্কিন অস্ত্রেও সুরক্ষা নেই, সৌদি আরবকে নাস্তানাবুদ করছে হুথিরা

মার্কিন অস্ত্রেও সুরক্ষা নেই, সৌদি আরবকে নাস্তানাবুদ করছে হুথিরা
ছবি সংগৃহীত।

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জামও কিনেছে দেশটি। তবু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর সৌদি আরব প্রতিরক্ষা খাতে ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। সামরিক খাতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যয় করা দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরবের অবস্থান প্রথম দশে। দেশটির হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের উন্নত অস্ত্র।


কিন্তু এত বিপুল সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ, দেশটির বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং একাধিক দিক থেকে আসা হামলার হুমকি।

তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি


সৌদি আরবের পূর্ব দিক থেকে ইরান, দক্ষিণ দিক থেকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং উত্তর দিক থেকে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার আশঙ্কা রয়েছে।

চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছিল। অন্যদিকে, ইরাকের ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হামলার জন্য ড্রোন পাঠিয়েছে। দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নিয়ে কিংবা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে হুথিরা সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ বা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইনসহ বিশাল এলাকার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্য হাতে থাকে খুব অল্প সময়।


সৌদি আরবের একটি সূত্রের বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, হুথিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে কিছু হামলা প্রতিরোধব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় কীভাবে মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে সৌদি কর্তৃপক্ষকে।

কৌশল বদলেছে হুথিরা


সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুথিরা এখন একসঙ্গে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলা চালানোর এই কৌশল অনেকটা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার হামলার ধরনের সঙ্গে মিলে যায়।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যায়। ফলে রাডারে এগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া হুতিরা নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে, যেগুলো উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে।

কোনো একক আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাই সব ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। একাধিক দিক থেকে একসঙ্গে হামলা হলে প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।


তবে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে বাইরের সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আট বছর আগে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইয়েমেনে ইরানি উৎসের ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম ও চালকবিহীন আকাশযানের সন্ধান পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। সে সময় ইয়েমেনে আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল।

দুই বছর আগের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ প্যানেল জানায়, হুথিদের কাছে বাইরের উৎস থেকে বিভিন্ন ধরনের সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি পৌঁছানোর পরিমাণ, ধরন ও ব্যাপ্তি নজিরবিহীন। এর মধ্যে অর্থায়ন এবং যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হাটেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের বেশ মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতির এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।


গত বছর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল। বিশ্লেষক আমির বার শালোম সে সময় সিএনএনকে বলেছিলেন, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষার কিছু অস্ত্রও পরিবর্তন করে ব্যবহার করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।


তেহরানের কথায় চলবে হুথিরা?

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুথিরা। তবে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের কয়েকটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির শেষকৃত্যে যোগ দিতেও হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতে ইয়েমেনের হুতিনিয়ন্ত্রিত এলাকায় ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দেয়। এর কিছুদিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এবং কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সৌদি আরবের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক শ কোটি ডলারও দাবি করছে তারা।

ইরান জানিয়েছে, রিয়াদ ও হুথিদের মধ্যে আলোচনা শুরু করতে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত তেহরান। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের মধ্যে আলোচনা শুরুর পথ তৈরি করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে ইরান প্রস্তুত।

তবে হুথিদের রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি দাবি করেছেন, সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাব গ্রহণ করলেও হুথিরা দুই সপ্তাহ ও এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তার বক্তব্য, এবারের সংঘাত আগের মতো নয়; সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এর পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে।

যুদ্ধ চালানো নাকি সমঝোতা—কঠিন সিদ্ধান্তে রিয়াদ

হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরই রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে।

রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা সিএনএনকে জানিয়েছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার ফোনে সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পাওয়া যাচ্ছিল। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

রিয়াদে বসবাসরত এক প্রবাসী জানান, চলতি সপ্তাহে তার সন্তানদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। হামলার আগের দিনগুলোতে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা না পাওয়ায় তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন। সপ্তাহান্তে বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।

বিমানবন্দরে হামলার পর একদিকে হুতিদের সঙ্গে সমঝোতার প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে পাল্টা হামলা বাড়ানোর চাপ তৈরি হয়েছে। বিমানবন্দরে হামলায় এক ডজনের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার পর হুতিদের সঙ্গে সমঝোতা করা সৌদি সরকারের জন্য রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।

আবার ইয়েমেনে আরও জোরালো বিমান হামলা চালালে সৌদি আরবের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও বাড়তে পারে। এতে দেশটিকে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও পর্যটনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

ঝুঁকিতে রয়েছে শুধু তেলশিল্প নয়। তথ্যকেন্দ্র, সমুদ্রের পানি পরিশোধনাগার এবং বিমানবন্দর সৌদি আরবের প্রযুক্তি খাত, পানির সরবরাহ ও পর্যটন অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি মাসের শেষ দিকে রিয়াদে যুবরাজের গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে সৌদি আরবের সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কারণে এ সপ্তাহে রিয়াদে অনুষ্ঠিত বিশ্ব পেট্রোলিয়াম কংগ্রেসে বড় বড় করপোরেশনের অংশগ্রহণে অনীহা দেখা গেছে।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে নিয়ে স্থল অভিযান চালিয়ে হুতিদের পরাজিত করাও সহজ হবে না। পাহাড়ি ভূখণ্ডে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান নেওয়া হুথিরা যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। গত এক মাসে তারা সরকারি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

গত বছর হুথিদের বিরুদ্ধে সাত সপ্তাহের বিমান হামলা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার কোটি নয়, বরং ১০০ কোটির বেশি ডলার ব্যয় হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত হুথিরা লোহিত সাগরে মার্কিন জাহাজে হামলা না চালানোর বিষয়ে সম্মত হলেও ইয়েমেনে তাদের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকে। এ সময় তারা যুক্তরাষ্ট্রের বেশ কয়েকটি অত্যাধুনিক রিপার ড্রোনও ভূপাতিত করে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাতেও হুথিদের নেতৃত্বকে পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। এসব হামলায় কয়েকজন সামরিক কমান্ডার ও প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ নিহত হলেও সংগঠনটি টিকে রয়েছে।

যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের সোমবারের তথ্য অনুযায়ী, হুতিরা ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীনিয়ন্ত্রিত তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজ ঘিরে ফেলেছে। শহরটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও সরবরাহকেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব

হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে। মিসরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে সরবরাহ করা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের অস্ত্রভান্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে এবং নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্প খাতের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও সেই সম্ভাবনা নাকচও করেননি।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল র‍্যাটনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে দেশটি তার মিত্রকে পরিত্যাগ করেছে।

রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার আগে দেওয়া এক বক্তব্যে সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত র‍্যাটনি বলেছিলেন, সৌদি আরব আক্রান্ত হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে দেশটির পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কূটনীতিতে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। সেই কূটনীতি হয়তো নিখুঁত বা সন্তোষজনক হবে না, কিন্তু সংঘাতের উত্তেজনা কমাতে পারে।

তবে এমন সমঝোতা হলে ইয়েমেনে হুথিদের ক্ষমতা ও প্রভাব অক্ষুণ্ন থেকে যেতে পারে—এমনকি তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালীও হতে পারে।

সূত্র: সিএনএন




সৌদি আরব আর ‘নিরাপদ নয়’, আতঙ্কে প্রবাসীরা

সৌদি আরব আর ‘নিরাপদ নয়’, আতঙ্কে প্রবাসীরা
ছবি সংগৃহীত।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ। কিন্তু ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলায় সেই নিরাপত্তার ভাবমূর্তি বড় ধাক্কা খেয়েছে।

রাজধানীর প্রধান বিমানবন্দরে হামলার পর দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন, সৌদি আরবে তাদের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত।


শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিন দ্বিতীয় দফা হামলায় আরও একজন নিহত এবং অন্তত ১১ জন আহত হন।

ইয়েমেনের হুথি আন্দোলন সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দাম্মাম বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে সৌদি আরবের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন এবং চলতি বছরের শুরুর দিকে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বিমান হামলার জবাবেই এসব আক্রমণ চালানো হয়েছে।


সৌদি রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আল-ইখবারিয়ায় প্রচারিত বিমানবন্দরের নজরদারি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা সাদা পোশাক পরা যাত্রীরা আতঙ্কে ছোটাছুটি করছেন। বিমানবন্দরের একটি অপেক্ষাকক্ষে ধুলা ছড়িয়ে পড়ে এবং ছাদের বিভিন্ন অংশ ভেঙে মেঝেতে পড়তে দেখা যায়।

‘পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাববো’

সাত বছরের বেশি সময় ধরে রিয়াদে বসবাসকারী ৩৯ বছর বয়সী ব্রিটিশ নাগরিক বিলাল বলেন, ধর্মীয় সফরে গিয়ে তীর্থযাত্রীদের কখনোই প্রাণহানির আশঙ্কায় থাকতে হওয়া উচিত নয়।


তিনি বলেন, হুথিরা কোনোভাবেই এই হামলার যৌক্তিকতা তুলে ধরতে পারবে না। সাধারণ মানুষের ওপর হামলার কোনো অজুহাত নেই। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট অতীতে যুদ্ধে যা-ই করে থাকুক, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা সমর্থনযোগ্য নয়।

বিলাল জানান, সৌদি আরবে তার ভালো বেতনের চাকরি ও স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন রয়েছে। তাই দেশ ছেড়ে যাওয়া তার জন্য সহজ সিদ্ধান্ত হবে না। তবে হামলার ব্যাপকতা ও ঘন ঘন আক্রমণের ঘটনায় প্রবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে বেসামরিক স্থানের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।


তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনা আমার নেই। আমি ও আমার পরিবার এখানে জীবন গড়ে তুলেছি। কিন্তু পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে এবং হামলা ঘন ঘন ঘটতে থাকলে পরিবারকে দেশে পাঠানোর কথা ভাববো কি না? অবশ্যই ভাববো।

গত এক দশকে বিভিন্ন সময়ে রিয়াদে বসবাস করেছেন আরেক ব্রিটিশ নাগরিক মোহাম্মদ। তার কাছেও সৌদি আরব পরিবার নিয়ে বসবাসের জন্য নিরাপদ জায়গা ছিল। তবে দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহনকেন্দ্র বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হামলা ঠেকাতে না পারায় তিনি উদ্বিগ্ন।

মোহাম্মদ বলেন, আমার সন্তানরাও এসব ঘটনায় বেশ আতঙ্কিত। আমি তাদের আশ্বস্ত করেছি যে তারা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং কিছু বিদেশির দেশে ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানানোর পর তাদের বোঝানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার কথায়, রিয়াদ আর নিরাপদ মনে হচ্ছে না।


সৌদির অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা

হুথিদের হামলা সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, পর্যটন ও বিনোদন খাতের কেন্দ্র হিসেবে সৌদি আরবকে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে দেশটির সরকার।

রোববার রিয়াদে একটি বড় জ্বালানি সম্মেলনে প্রত্যাশার তুলনায় অল্পসংখ্যক প্রতিনিধি অংশ নেন। দুই সপ্তাহ পর সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক আয়োজন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। বিমানবন্দরে হামলার পর দেশটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সামনে স্থিতিশীল ও নিরাপদ পরিবেশ তুলে ধরতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বিরোধ। ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। ২০১৪ সালে জ্বালানি ভর্তুকি কমানো নিয়ে অসন্তোষ এবং জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হয়।

নতুন ফেডারেল কাঠামোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ইরান-সমর্থিত হুথিরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয় এবং রাজধানী সানা দখল করে। এতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আবদ-রাব্বু মনসুর হাদির সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয়।


এর জবাবে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে সামরিক অভিযান শুরু করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করাই ছিল ঘোষিত লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি বোমা ও যুক্তরাজ্যের তৈরি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে সৌদি আরব ও তার মিত্ররা ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। দীর্ঘ সংঘাতে ক্ষুধা, রোগব্যাধি ও জরুরি পরিষেবা ভেঙে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে বিভিন্ন হিসাব ও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান পরবর্তী সময়ে দেশটিকে বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক সম্মেলন, বিনোদন ও পর্যটনের অন্যতম গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।

কিন্তু হুথিদের হামলা এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন—দুই ঘটনাই সৌদির এসব উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার দুর্বলতা সামনে এনেছে। সাধারণত বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়।

ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সৌদি আরব লোহিত সাগরকে তেল রপ্তানির বিকল্প পথ হিসেবে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। কিন্তু হুথিদের লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার ফলে সেই পথও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

এর আগে সানা বিমানবন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের হামলার পর হুথিরা পাল্টা অবরোধের হুমকি দিয়েছিল। তাদের অভিযোগ, বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকার আকাশসীমা ও পরিবহনব্যবহারে বাধা দেওয়ার জবাবেই তারা সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়েও প্রশ্ন

সাম্প্রতিক সংকট উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনও সামনে এনেছে।

বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও ওমান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, অবকাঠামো কিংবা সামরিক প্রবেশাধিকারের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও প্রযুক্তি কিনতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটনকে ওই অঞ্চলের প্রধান সামরিক অংশীদার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তাদাতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক উপসাগরীয় বিশ্লেষকের মতে, এই সম্পর্ক এখন গুরুতর চাপে রয়েছে। তার বক্তব্য, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক উদ্যোগ ছেড়ে যুদ্ধের পথে যাওয়ার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে সৌদি আরব উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ, এ সংঘাত সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক মিত্রদের এমন পরিণতির মুখে ফেলেছে, যে যুদ্ধ তারা নিজেরা বেছে নেয়নি।

রিয়াদে হামলার পর ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও সৌদি আরবের হতাশা বাড়িয়েছে বলে মনে করেন ওই বিশ্লেষক। ট্রাম্প বলেছিলেন, সৌদি আরব নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম।

বিশ্লেষক বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কয়েক দশক ধরে উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন অস্ত্র কিনতে এবং ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তুলতে বলেছে। কিন্তু যখন হুমকি বাস্তবে দেখা দেয়, তখন সেটিকে সৌদি আরবের নিজের সামলে নেওয়ার বিষয় বলে উড়িয়ে দিলে ওই অংশীদারত্বের প্রকৃত মূল্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।

এ পরিস্থিতিতে গত আগস্টে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির গুরুত্ব বেড়েছে। চুক্তিটির লক্ষ্য হলো সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করা। তবে তুরস্কের সেনা মোতায়েনের সম্ভাব্য সময় ও পরিসর এখনো অনিশ্চিত।

সৌদি আরবের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু সামরিক নিরাপত্তার বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবন, বিদেশি কর্মীদের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ওপরও।

সূত্র: দ্য মিডল ইস্ট আই




সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি নির্দেশনা, মানতে হবে যেসব নিয়ম

সৌদি আরবে বাংলাদেশিদের জন্য জরুরি নির্দেশনা, মানতে হবে যেসব নিয়ম
ছবি সংগৃহীত।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশন। একই সঙ্গে সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা মেনে চলা এবং সংঘাত-সংশ্লিষ্ট ছবি, ভিডিও ও স্পর্শকাতর তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পাশাপাশি সৌদি কর্তৃপক্ষের জারি করা নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ ও প্রতিপালন করতে হবে।

এতে আরও বলা হয়, চলমান পরিস্থিতি-সম্পর্কিত যেকোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও ধারণ, আদান-প্রদান এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা সৌদি আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সৌদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি-সংক্রান্ত ছবি, ভিডিও কিংবা স্পর্শকাতর তথ্য ফেসবুক, ইউটিউব, এক্সসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ, মোবাইলে সংরক্ষণ ও অন্যের সঙ্গে আদান-প্রদান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ মিশন।

এ ছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো প্রয়োজনে প্রবাসীদের বাংলাদেশ মিশনের নির্ধারিত হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

প্রবাসীদের নিয়মিত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে বাংলাদেশ মিশনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ অনুসরণ করারও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বাংলাদেশি নাগরিকদের হতাহত হওয়ার খবর প্রবাসীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলা এবং যাচাইহীন তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এছাড়া ঝুঁকিপূর্ণ ও জনবহুল স্থানসমূহ এড়িয়ে চলার জন্য পরামর্শ প্রদান করা যাচ্ছে। যে কোন তথ্যের জন্য দূতাবাসের নিম্নোক্ত হটলাইনে যোগাযোগ করার জন্য অনুরোধ করা হলো- ৮০০১০০০১২৫ (শ্রম সংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর), ৮০০১০০০১২৬ (পাসপোর্ট সংক্রান্ত টোল ফ্রি নম্বর), ৮০০১০০০১২৪ (ডিপ্লোম্যাটিক উইং সংক্রান্ত), মৃত্যু সংক্রান্ত হটলাইন নাম্বার +৯৬৬৫৭০২১২১৮০। এছাড়া নিয়মিত আপডেটের জন্য দূতাবাসের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ ফলো করুন। ভেরিফায়েড পেজের লিংকঃ https://www.facebook.com/bdembassyriyadh




দিল্লি ১ মাস মোতায়েন থাকবে ২০ হাজার আধাসামরিক সদস্য

দিল্লি ১ মাস মোতায়েন থাকবে ২০ হাজার আধাসামরিক সদস্য
ছবি সংগৃহীত।

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি/সিজেপি), বিরোধী জোট ইন্ডিয়া ও অন্যান্য সংগঠনের বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তার দায়িত্বে মোতায়েন প্রায় ২০ হাজার আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য অন্তত এক মাস দিল্লিতে অবস্থান করবেন বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভের পাশাপাশি সামনে উৎসবের মৌসুমের বিষয়টিকেও বিবেচনায় নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এ সময় বাজার ও বিভিন্ন জনসমাগমস্থলে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে তাই বিপুলসংখ্যক আধাসামরিক সদস্যের মোতায়েন বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভের জন্য নতুন করে তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো—রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও সিবিডি ময়দান। এতদিন শহরের উচ্চ নিরাপত্তাবেষ্টিত কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত যন্তর মন্তর ছিল বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান। তবে এখন থেকে সেই স্বীকৃতি প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সূত্রের দাবি, নতুন নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত নিরীক্ষা শেষ হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের দিকে ইন্ডিয়া জোটের পদযাত্রা

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আবেদন জমা দিতে আজ সন্ধ্যায় সুপ্রিম কোর্টের দিকে পদযাত্রা করেন বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার নেতারা। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র এ পদযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।

বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে দিল্লির সীমান্ত, রেলস্টেশন, বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়া জমায়েত ঠেকানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শহরের সীমান্তবর্তী এলাকায় যানবাহনে তল্লাশি বাড়িয়েছে পুলিশ। পাশাপাশি হোটেল, অতিথিশালা, লজ ও ধর্মশালায় পরিচয় যাচাইয়ের অভিযানও জোরদার করা হয়েছে।

২০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে নয়াদিল্লি জেলা

আধাসামরিক বাহিনীর পাশাপাশি দিল্লি পুলিশের হাজার হাজার সদস্যকেও নিরাপত্তার দায়িত্বে মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার সমন্বয়ের জন্য নয়াদিল্লি জেলাকে ২০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে।

প্রতিটি এলাকায় মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন পুলিশ বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন যুগ্ম কমিশনার, উপকমিশনার ও অতিরিক্ত উপকমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তারা।

রাজনৈতিক কর্মসূচির বাইরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা

সোমবারের (১২ অক্টোবর) বিক্ষোভে আরও বেশি মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কৌশল পরিবর্তন করেছে ইন্ডিয়া জোট। কর্মসূচিটিকে কেবল রাজনৈতিক প্রতিবাদ হিসেবে তুলে না ধরে ‘গণতান্ত্রিক বিক্ষোভ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। তবে পরে কর্মসূচির বার্তায় পরিবর্তন এনে শিক্ষার্থী ও নাগরিক সমাজের সংগঠনগুলোকেও এতে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।

কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা প্রস্তুতি, বিক্ষোভস্থল পরিবর্তন ও বিপুলসংখ্যক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন—সব মিলিয়ে দিল্লিতে আগামী কয়েক সপ্তাহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।

সূত্র: এনডিটিভি