সাইবার হুমকিতে কর্মস্থলে অনিয়মিত মানবিক চিকিৎসক, বিপাকে শত শত রোগী

পিতৃহীন থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত মাহিনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরী। তাঁর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন ২৫০ জন থ্যালাসেমিয়া রোগী। সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির পর তিনি হাসপাতালে অনিয়মিত। তাঁকে ফিরে পেতে চান রোগী ও সহকর্মীরা।
১৪ বছরের সাখাওয়াত হোসেন মাহিন। পাঁচ বছর বয়সে ধরা পড়ে থ্যালাসেমিয়া। সেই থেকে প্রতি মাসে তাকে রক্ত নিতে হয়। অন্য শিশুদের মতো স্বাভাবিক জীবন কাটানোর বয়সে নিয়মিত চিকিৎসা আর রক্ত নেওয়াই তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। বাবা নেই। ছেলের চিকিৎসার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন মা বিলকিস আক্তার। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না।
এই কঠিন সময়ে মাহিনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরী। প্রতি মাসে মাহিনের রক্ত নেওয়ার জন্য প্রায় ১ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হয়। ওষুধ কেনার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করতেন তিনি। পিতৃহীন শিশুটির চিকিৎসা যেন অর্থের অভাবে ব্যাহত না হয়, সে জন্য দায়িত্ব নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছিলেন এই চিকিৎসক।
মাহিনের মা বিলকিস আক্তার বলেন, “ডা. জয়নাল স্যার আছেন বলেই মাহিনের চিকিৎসা করাতে পেরেছি। এখন তিনি হাসপাতালে আসেন না, তাই খুব কষ্টে পড়েছি। মোবাইল ফোনে তাঁর পরামর্শ নিয়েই মাহিনের চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছি।”
মাহিনের মতো অনেক রোগীর কাছেই ডা. জয়নাল মুহুরী শুধু একজন চিকিৎসক নন, ভরসার মানুষ। তাঁর তত্ত্বাবধানে রয়েছেন থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ২৫০ জন রোগী। তাঁদের মধ্যে ৩৭ জনকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছেন তিনি। এতে জেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সও সহযোগিতা করে।
কিন্তু সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির মুখে সেই চিকিৎসকই এখন কর্মস্থলে অনিয়মিত। তাঁর অনুপস্থিতিতে উদ্বেগে পড়েছেন দীর্ঘদিন ধরে তাঁর চিকিৎসা নেওয়া রোগী ও স্বজনেরা।
গত ৭ সেপ্টেম্বর চাকরি ছাড়ার লিখিত আবেদন জমা দেন ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরী। কর্তৃপক্ষ তাঁকে অব্যাহতি দেয়নি। আবেদনটি পুনর্বিবেচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। তবে এরপর থেকে নিয়মিত হাসপাতালে আসছেন না তিনি। তাঁর অনুপস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শিশু রোগী ও তাদের অভিভাবকেরা।
ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ রোগী চিকিৎসা নেন। তাঁদের প্রায় ১০ শতাংশই শিশু। অর্থাৎ প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি শিশু আসে এখানে। উপজেলায় সরকারি পর্যায়ে শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে মূল ভরসা ছিলেন ডা. জয়নাল মুহুরী।
রোগী ও স্বজনদের কাছে তিনি পরিচিত একজন মানবিক চিকিৎসক হিসেবে। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হলেও তিনি সব ধরনের রোগী দেখতেন। মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শুনতেন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিতেন না। অসহায় রোগীদের কখনো কখনো নিজের পকেট থেকেও আর্থিক সহায়তা করেছেন। এসব কারণে ফটিকছড়ির অনেক মানুষের কাছে তিনি ‘মানবিক ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত।
করোনা মহামারির সময়ও চিকিৎসাসেবা দিয়ে গেছেন তিনি। একপর্যায়ে নিজেও আক্রান্ত হন। সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসেন রোগীদের কাছে।
মো. আলী নামের এক বাবা জানান, তাঁর শিশুসন্তান দীর্ঘদিন নানা অসুখে ভুগছিল। বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েও ফল পাননি। পরে ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরীর চিকিৎসা নেন। মো. আলী বলেন, “এই ডাক্তারের চিকিৎসা আর ওষুধে আল্লাহ সন্তানকে সুস্থ রেখেছেন। আমি নামাজ পড়ে ওনার জন্য দোয়া করি, যেন তিনি ভালো থাকেন, এভাবে মানুষের সেবা করতে পারেন।”
শাকিলা জাহানও এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। কিন্তু ডা. জয়নালকে না পেয়ে হতাশ হয়েছেন। তিনি বলেন, “উনি না থাকায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। উনার আচরণ খুব ভালো। আমরা চাই তিনি আবার স্বপদে ফিরে আসুন।”
রোগী ও সহকর্মীদের দাবির মুখে ডা. মুহুরীকে আবার নিয়মিত হাসপাতালে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. তৌহিদুল আলম।
তিনি বলেন, “মানবিক চিকিৎসক হিসেবে তিনি উপজেলায় পরিচিত। এটা স্বাস্থ্যসেবার জন্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু সাইবার বুলিং ও ব্যক্তিগত আক্রমণে তাঁর মতো একজন চিকিৎসক হেরে গেলে সেটা আমাদের জন্য অশনিসংকেত। কর্তৃপক্ষ তাঁর আবেদন পুনর্বিবেচনার জন্য রেখেছে।”
চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, “সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির বিষয়টি প্রশাসন ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তাঁরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন।” তিনি জানান, রোগী ও সহকর্মীদের অনুরোধের পর ডা. মুহুরী শিগগিরই তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন।
ফিরবেন কি না, জানতে চাইলে ডা. জয়নাল আবেদিন মুহুরী বলেন, “আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সহকর্মী, রোগী আর অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী স্বপদে ফিরতে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে এখনো ভাবিনি। আশা করছি, একদিন সবার শুভবুদ্ধির উদয় হবে।”
একদিকে সাইবার বুলিং ও প্রাণনাশের হুমকির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে রোগী ও সহকর্মীদের ফিরে আসার অনুরোধ—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি ডা. জয়নাল মুহুরী।











