রাজনৈতিক সমর্থন ব্যালটে দেখাবেন, অফিসে নয়: কর্মকর্তাদের প্রধানমন্ত্রী

সরকারি কর্মকর্তাদের কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি সমর্থন থাকলে তার প্রতিফলন ব্যালট বাক্সে ঘটাতে হবে, সরকারি অফিসে নয়—এমন মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের প্রতি প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সমর্থন থাকাকে ব্যক্তিগতভাবে দোষের মনে করেন না। তবে সেই সমর্থনের প্রতিফলন সরকারি কাজে থাকা উচিত নয়।
রোববার (৮ নভেম্বর) সন্ধ্যায় সাভারের বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (বিপিএটিসি) মিলনায়তনে ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে নবীন বিসিএস কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মজীবনে আপনাদের কী করা উচিত কিংবা উচিত নয়, এসব নিয়ে আপনাদের সামনে দীর্ঘ কোনো বক্তব্য দেওয়ার অবকাশ রয়েছে বলে আমি মনে করি না। কারণ কী করা উচিত কিংবা উচিত নয়, আমি বিশ্বাস করি, সেটি অবশ্যই আপনারা নিজেরাই ভালো জানেন। বরং জানা বিষয়গুলো কর্মক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সদিচ্ছা থাকাটাই জরুরি বিষয়।’
সরকারপ্রধান হিসেবে নবীন কর্মকর্তাদের কাছে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, যে কোনো বয়সের একজন নাগরিক কোনো সহযোগিতার জন্য অফিস-আদালতে তাদের কাছে গিয়ে যেন কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
এ প্রসঙ্গে একটি ‘গোল্ডেন রুল’ স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘ট্রিট আদার্স হাউ ইউ ওয়ান্ট টু বি ট্রিটেড।’ অর্থাৎ, অন্যের সঙ্গে তেমন আচরণ করুন, যেমন আচরণ আপনি নিজের জন্য প্রত্যাশা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জীবনে কখনো কখনো অন্যের সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। সহযোগিতা পাওয়ার সময় অন্যের কাছ থেকে নিজের জন্য যে ধরনের ব্যবহার প্রত্যাশা করেন, কেউ সহযোগিতার জন্য এলে তার সঙ্গেও তেমন আচরণ করতে হবে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আইন ও বিধিবিধান মেনে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানবিক আচরণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন কর্মকর্তাকে অবশ্যই বিধিবদ্ধ নিয়মের আওতায় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে পুরো বিষয়টি সামলানোর সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে মানবিক আচরণ করা হয়েছে কি না, আধুনিক রাষ্ট্র ও প্রশাসনে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, কোনো নাগরিক আবেদনপত্র নিয়ে এলে তাতে ভুল থাকলে তাকে ভুল সংশোধন করে আনতে বলা বেআইনি বা অন্যায় নয়। তবে সুনির্দিষ্টভাবে ভুলটি দেখিয়ে দিয়ে কোথায়, কার কাছে গিয়ে সেটি সংশোধন করা যাবে, সেই পরামর্শ দিলে তা হবে মানবিকতা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। দেশের জনগণ কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুধু আদেশ-নির্দেশ নয়, মানবিকতাও আশা করে।
কর্মকর্তাদের পদায়ন ও পদোন্নতির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটি দেশের জনপ্রশাসনে হাজার হাজার পদ-পদবি রয়েছে। প্রশাসনের প্রতিটি পদই রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় পছন্দের পদে পদায়ন কিংবা পদোন্নতির জন্য কেউ কেউ নিজেদের পেশাগত দক্ষতা ও সততার সঙ্গে আপস করেন।
তিনি বলেন, যে কোনো সময় দেশের যে কোনো স্থানে জনপ্রশাসনের যে কোনো পদে দায়িত্ব পালনের জন্য নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখা চূড়ান্ত পেশাদারত্বের পরিচায়ক। সবার মনে রাখা জরুরি, একটি সরকার যেমন চিরস্থায়ী নয়, জনপ্রশাসনের কোনো পদও কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়।
নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে সব মিলিয়ে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। প্রশিক্ষণ শেষে কেউ প্রশাসন, কেউ পররাষ্ট্র, কেউ কৃষি, কেউ ট্যাক্সেশন, শিক্ষা কিংবা তথ্য ক্যাডারে যোগ দেবেন। কাজের ধরন ও কর্মস্থল আলাদা হতে পারে। প্রশাসনিক ক্যাডার ভিন্ন হলেও সবার প্রথম ও প্রধান পরিচয় তারা জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন,‘ইউ আর দেয়ার টু সার্ভ দ্য পিপল।’
সরকারের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে জনপ্রশাসনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে এবং তা সরকারি প্রশাসনের মাধ্যমেই করছে। তবে পার্থক্য হলো, এসব এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে তারা জনগণের সামনে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলেন। জনগণ সেই ইশতেহারের পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে নির্বাচনী ইশতেহার এখন দেশের জনগণের ইশতেহার, জনগণের দলিল। সেই ইশতেহার বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। প্রশাসনিক কাজের মাধ্যমে সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের আন্তরিকভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করেন তিনি।
সরকারি সেবা সহজ ও নাগরিকবান্ধব করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রশাসনে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে সরকারি সেবা আরও সহজ করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক উদ্যোগের চেয়েও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইতিবাচক মানসিকতা বেশি কার্যকর। এ বিষয়ে নবীন কর্মকর্তারা ভূমিকা রাখবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা রক্ষার বিষয়েও নবীন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষা ও পরিচ্ছন্নতার দিকে আরও বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতসহ চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও দেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
বক্তব্যের শুরুতে নবীন কর্মকর্তাদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা জীবনের আরেকটি অধ্যায় শুরু করতে যাচ্ছেন। একাডেমিক জ্ঞান অর্জনের পর ব্যবহারিক জীবনে সেই জ্ঞান প্রয়োগের কলাকৌশল তারা শিখেছেন। এখন সরকারি প্রশাসনে যার ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হবে, অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগ করে যথাযথভাবে সেই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মজীবন শুরু করতে যাওয়া কর্মকর্তাদের অধিকাংশই সম্ভবত প্রথমবারের মতো পদায়ন পাচ্ছেন। তারা এখন রাষ্ট্রের জনপ্রশাসনের অংশ। সরকারি প্রশাসন যত বেশি দক্ষ হবে, সরকারের কার্যক্রমও তত বেশি সফল হবে। তাই সরকারের সার্বিক সফলতার জন্য দক্ষতা, সততা ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রশাসন জরুরি। এসব বৈশিষ্ট্য শুধু একজন কর্মকর্তাকেই সমৃদ্ধ করে না, রাষ্ট্র ও সরকারকেও সমৃদ্ধ করে।
প্রধানমন্ত্রী নবীন কর্মকর্তাদের ভবিষ্যৎ কর্মময় জীবনের সুখ, শান্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও সাফল্য কামনা করেন।
রোববার সন্ধ্যা ৬টায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চার মাসব্যাপী ৮১তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে শীর্ষ ১০ জনের হাতে সনদ তুলে দেন তিনি। পরে নবীন কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।









