নির্বাচনের সময় যেভাবে আলেমদের সহযোগিতা পেয়েছেন, দেশ গঠনেও একইভাবে তাঁদের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি শান্তি, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করে একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে চান তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে মাদ্রাসায় আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময়সভায় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে চট্টগ্রামের বাঁশখালী থেকে হেলিকপ্টারে করে ফটিকছড়ির পেলাগাজী দিঘির মোড় সিঅ্যান্ডবি মাঠে অবতরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে বাসযোগে তিনি বাবুনগর মাদ্রাসায় যান। মাদ্রাসায় পৌঁছানোর পর হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে দেখা হলে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন হেফাজত আমির। একপর্যায়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরে হেফাজতে ইসলামের আমিরের সভাপতিত্বে আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময়সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় হেফাজতে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান সরকারপ্রধানের কাছে সংগঠনের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে নয়টি দাবি তুলে ধরেন।
হেফাজতের ৯ দাবি হেফাজতে ইসলামের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন করা; কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন না করা; ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনা, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্স সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে এই ডিগ্রির স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা ও হিজবুত তাওহিদকে নিষিদ্ধ করা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের ‘অপতৎপরতা’ বন্ধ করার দাবিও রয়েছে হেফাজতের তালিকায়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা ‘মিথ্যা মামলা’ প্রত্যাহার করে আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্রীয় পুনর্গঠনে অংশীদার করা এবং তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার দাবিও করেছে সংগঠনটি। পাশাপাশি ভারতের মাওলানা সাদের বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমার অনুমতি না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
মতবিনিময়সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে হেফাজত আমিরের কাছে দোয়া নিতে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। নির্বাচনের পর আল্লাহর রহমতে সরকার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ সম্পন্ন করেছে। এরপর রমজান, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন, সংস্কার কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যস্ততার কারণে আসতে কিছুটা দেরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি ও অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব বিষয় সামাল দিতে সরকারকে সময় দিতে হয়েছে। তবে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তারেক রহমান বলেন, নারী-পুরুষনির্বিশেষে দেশের প্রতিটি মানুষ যেন শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে, এমন একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হবে। ‘আমরা নিজেরা ভালো থাকতে চাই, আমাদের পরিবার ভালো থাকুক, আমাদের সম্প্রদায় ভালো থাকুক— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
সন্তানদের জন্য স্কুল-কলেজে নিরাপদ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে সরকার কাজ করবে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের বিষয়ে তিনি বলেন, অঙ্গীকার পূরণে সরকার বদ্ধপরিকর। একজন মুসলমান হিসেবে অঙ্গীকার রক্ষা করা নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। কথা রাখতে না পারলে কাজের কোনো মূল্য থাকে না।
নির্বাচনের সময় সহযোগিতার জন্য আলেম, নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় সবাই একসঙ্গে থেকে যে ভূমিকা রেখেছেন এবং দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে কাজ করা, মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং দোয়া করার জন্য তিনি সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে, সমস্যা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।’ ফ্যাসিবাদের সময়ে মানুষের ওপর অত্যাচার, দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব পরিস্থিতির প্রভাব দেশের বাইর থেকেও বিভিন্নভাবে এসেছে।
মতবিনিময়সভা শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী বড় মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হন।
সভায় সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মুহাম্মদ হেলালউদ্দিন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনের সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর, মীরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান ও বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়েজী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও হেফাজত আমিরের ছেলে মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী, মাওলানা মহিউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা আজিজুল হক ইসলামীবাদী।