বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বেসরকারি পুঁজিতে জোর বিশ্বব্যাংকের
সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ অপরাহ্ন

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বেসরকারি পুঁজিতে জোর বিশ্বব্যাংকের

বিদেশি বিনিয়োগ টানতে বেসরকারি পুঁজিতে জোর বিশ্বব্যাংকের
ছবি সংগৃহীত।

বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহে জোর দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক। এ লক্ষ্যে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো, ঋণ ও পুঁজিবাজারের সক্ষমতা বাড়ানো, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং নীতিগত সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে সংস্থাটি।

একই সময়ে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ আকর্ষণে কৃষি ও কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন, শিল্পায়ন এবং দুদেশের মধ্যে যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ। তবে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাংকের নতুন কোনো বিনিয়োগ কর্মসূচি বা নির্দিষ্ট অর্থায়নের ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সোমবার (১২ অক্টোবর) শুরু হওয়া বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় বেসরকারি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। সভায় অংশ নিতে গিয়ে থাই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

তিনি জানান, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন ও শিল্পায়নের মতো খাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে থাই ব্যবসায়ীদের আগ্রহ রয়েছে। পাশাপাশি থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দুদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ডের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, দুদেশের মধ্যে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংযোগ গড়ে তুলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বাড়ানো সরকারের লক্ষ্য।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, আগামী ১৪ অক্টোবর বার্ষিক সভায় ‘কর্মসংস্থানের জন্য বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহ’ বিষয়ে একটি বিশেষ অধিবেশন রয়েছে। এতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গাসহ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও আর্থিক খাতের প্রতিনিধিদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। অধিবেশনে উদীয়মান অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি, পুঁজিবাজার শক্তিশালী করা, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমাতে বিভিন্ন আর্থিক নিশ্চয়তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা হবে।

এক বছরে ১১২০০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সংস্থাটি ১১২ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২০০ কোটি ডলারের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহে সহায়তা করেছে। ২০২২ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩৫ বিলিয়ন বা ৩ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। অর্থাৎ, চার বছরে এ ধরনের বিনিয়োগ তিন গুণের বেশি বেড়েছে।

বিশ্বব্যাংকের নিজস্ব অর্থায়নের সঙ্গে বেসরকারি পুঁজি যুক্ত করে ২০২৬ অর্থবছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মোট অর্থায়ন ও বিনিয়োগ সংগ্রহের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

সংস্থাটির মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের চাহিদা পূরণে শুধু সরকারি অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ যুক্ত করা প্রয়োজন। এ কারণে নিজস্ব অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করা এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানোর কৌশলকে গুরুত্ব দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় সম্ভাবনা

বাংলাদেশে মৌসুমে আম, কাঁঠাল, লিচু ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের সরবরাহ বেশি থাকলেও পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার অভাবে অনেক পণ্য নষ্ট হয়। এতে কৃষকেরা অনেক সময় ন্যায্য দাম পান না। এসব পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

থাই চেম্বারের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় খাতগুলো তুলে ধরা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা বলেন, কৃষিজাত পণ্য এবং হালাল খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে থাই বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা গেছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত ফল ও অন্যান্য কৃষিপণ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাত করা গেলে এ খাতে বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

এ ধরনের বিনিয়োগ শুধু রপ্তানি আয় বাড়াবে না, বরং কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, অপচয় কমানো এবং গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, অবকাঠামো, উৎপাদনশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগেও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে।

যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়তে চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশ ও থাইল্যান্ডের মধ্যে যৌথ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দুদেশের মধ্যে এমন উৎপাদন নেটওয়ার্ক তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে কোনো পণ্যের প্রাথমিক উপকরণ বাংলাদেশে উৎপাদিত হবে, মধ্যবর্তী পণ্য থাইল্যান্ডে তৈরি হবে এবং পরে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হবে। আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে থাইল্যান্ডে প্রাথমিক বা মধ্যবর্তী পণ্য তৈরি করে বাংলাদেশে চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদনের সুযোগও রয়েছে।

এ ধরনের উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলে দুই দেশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারবে। এতে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়বে।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, শুধু পণ্য আমদানি-রপ্তানির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সীমাবদ্ধ না রেখে শিল্পায়ন, মূল্য সংযোজন ও যৌথ উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এতে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর বাজারের পাশাপাশি অন্যান্য আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রেনং-চট্টগ্রাম সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

থাইল্যান্ডের রেনং বন্দর ও বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ আরও বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, দুই বন্দরের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো এবং পণ্য পরিবহনকে আরও গতিশীল করা গেলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক সহজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ পেতে পারেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা যৌথ উৎপাদন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে।

মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা

থাইল্যান্ডসহ আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) কাঠামোর সুবিধা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, শুল্কসুবিধা কাজে লাগিয়ে দুদেশের বাণিজ্য বাড়ানো সম্ভব। তবে লক্ষ্য শুধু বাণিজ্য ঘাটতি কমানো নয়, বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও রপ্তানির পরিমাণ বাড়ানো।

বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বহুমুখী উদ্যোগ

থাইল্যান্ডের সঙ্গে বিনিয়োগ আলোচনার পাশাপাশি অন্যান্য দেশ থেকেও বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা চলছে বলে জানান রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগ উদ্যোগ শুরু হয়েছে। জাপানের টয়োটা ও মারুবেনি করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল এবং প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও যোগাযোগের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার মতে, বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা এবং ব্যবসার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং নতুন শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে।

তিনি জানান, বন্ধ কলকারখানা চালুর ক্ষেত্রে সাত শতাংশ ঋণাত্মক সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এ অর্থায়নের বিস্তারিত শর্ত ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি তিনি তুলে ধরেননি।

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, উৎপাদন সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করা। এ লক্ষ্য অর্জনে থাইল্যান্ডের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশের সামনে কী সুযোগ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বর্তমানে বিনিয়োগের গতি, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব আদায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বব্যাংকের ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদে বলা হয়েছে, এসব কাঠামোগত সমস্যার কারণে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রতিবেদনটিতে ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের উন্নতি এবং সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হলে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে বলে আশা করছে সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের মতে, অর্থনীতিকে টেকসই প্রবৃদ্ধির ধারায় ফেরাতে ব্যাংক খাত, রাজস্ব আহরণ ও জ্বালানি খাতে দ্রুত সংস্কার প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে নতুন ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

এ পরিস্থিতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের সামনে অর্থায়নের সুযোগ তৈরির পাশাপাশি ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নের চ্যালেঞ্জও রয়েছে। নীতির ধারাবাহিকতা, সহজে ব্যবসা শুরু ও পরিচালনার সুযোগ, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ জনবল, দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে।

বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ-বিষয়ক মূল্যায়নেও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যবসার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সীমিত সরকারি বিনিয়োগের বিষয়গুলো উঠে এসেছে। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগের জন্য তুলনামূলক অনুকূল পরিবেশ তৈরি হতে পারে।

ঝুঁকি কমাতে নতুন আর্থিক কৌশল

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল অবকাঠামো, অর্থায়নের উচ্চ ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি বড় বাধা। এসব ঝুঁকি কমাতে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণ নিশ্চয়তা, বিনিয়োগের ঝুঁকি ভাগাভাগি এবং স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের মতো ব্যবস্থা ব্যবহার করছে।

বিশেষ করে বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ নিশ্চয়তা সংস্থার (এমআইজিএ) মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের নির্দিষ্ট ঝুঁকির বিপরীতে নিশ্চয়তা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এতে কোনো প্রকল্পে সরাসরি অর্থায়নের পাশাপাশি অন্য বিনিয়োগকারীদেরও অর্থ আনতে উৎসাহিত করা সম্ভব।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো নিজস্ব অর্থায়নকে কাজে লাগিয়ে আরও বেশি বেসরকারি পুঁজি আকৃষ্ট করা। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো নতুন নিশ্চয়তা বা বিনিয়োগ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সংস্থাটির বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের কৌশল থেকে দেশটি কীভাবে বাস্তব সুবিধা নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে নতুন অর্থায়ন, বিনিয়োগ নিশ্চয়তা, সম্ভাবনাময় খাত চিহ্নিতকরণ এবং সংস্কারের বিষয়ে সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনার ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য শেষ পর্যন্ত সাফল্য নির্ভর করবে শুধু বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতির ওপর নয়, বরং কতটা নতুন পুঁজি আসছে, কতটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, তার ওপর।

থাইল্যান্ডের সঙ্গে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালাল খাদ্য উৎপাদন, যৌথ শিল্পায়ন ও সামুদ্রিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ এবং বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহের কৌশলকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের সামনে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে।




জ্বালানি খাতের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চায় বাংলাদেশ

জ্বালানি খাতের চাপ মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চায় বাংলাদেশ
ছবি সংগৃহীত।

বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি খাতে সৃষ্ট চাপ মোকাবিলা এবং বাড়তি ব্যয়ের বোঝা সামলাতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ। এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সোমবার (১২ অক্টোবর) থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সাধারণ সভায় অংশগ্রহণের শুরুতে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। এ চাপ সামাল দিতে এক ধরনের আর্থিক সুরক্ষা প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংক এ বিষয়ে সহযোগিতার ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। ভবিষ্যতেও সংস্থাটি বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার বিষয়টি শুধু বিদ্যমান তহবিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি খাতে চলমান সংকটের প্রভাব মোকাবিলায়ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও প্রক্রিয়াগত কাজ চলছে। দুপক্ষের অংশীদারত্বের আওতায় কীভাবে সহযোগিতা আরও কার্যকর করা যায়, সে বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে চলমান উদ্যোগগুলোর সামঞ্জস্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন। এ নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।




আইএমএফের শর্ত মানবে না সরকার, বিকল্প অর্থায়নের খোঁজ—ব্যাংককে বড় পরীক্ষা বাংলাদেশের

আইএমএফের শর্ত মানবে না সরকার, বিকল্প অর্থায়নের খোঁজ—ব্যাংককে বড় পরীক্ষা বাংলাদেশের
ছবি সংগৃহীত।

বৈশ্বিক অর্থনীতি যখন মূল্যস্ফীতি, উচ্চ সুদের হার, সরকারি ঋণের চাপ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মঞ্চ হয়ে উঠছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংকক। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনা করবেন বিশ্বের নীতিনির্ধারকরা।

১২ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠেয় এ সভা বাংলাদেশের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে আইএমএফের নতুন ঋণ কর্মসূচি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি ফেরানোর বিষয়ে আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ তৈরি হয়েছে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় আইএমএফের কাছ থেকে ৪৫০ কোটি থেকে ৫০০ কোটি ডলার পেতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ব্যাংককের বৈঠকগুলোতে সরকারের নিজস্ব সংস্কার পরিকল্পনা ও অর্থনৈতিক কর্মকৌশল তুলে ধরার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বার্ষিক সভার সাইডলাইনে আইএমএফের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে ঋণের শর্ত ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। আগের ঋণ কর্মসূচির অসম্পূর্ণ শর্তগুলোও আলোচনায় আসতে পারে। এর মধ্যে বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, বিদ্যুৎ ও সারে ভর্তুকি কমানো এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। ব্যাংককের আলোচনায় অগ্রগতি হলে চলতি মাসের শেষ দিকে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসতে পারে।

নতুন ঋণের জন্য সরকারের নিজস্ব কৌশল

বার্ষিক সভায় অংশ নিতে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের ব্যাংককে যাওয়ার কথা রয়েছে। দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ সচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরের বক্তব্য অনুযায়ী, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির চাপ মোকাবিলায় সরকার বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চাপিয়ে দেওয়া সংস্কারের পরিবর্তে দেশের বাস্তবতা বিবেচনায় নিজস্ব উদ্যোগে সংস্কার বাস্তবায়ন করতে চায়।

সরকারের যুক্তি, দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি নানা চাপে ছিল। বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় কম রাজস্ব আয় এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্যসংকট অর্থনীতির অন্যতম দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার নিজস্ব কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের জানানো হবে।

সরকারের পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। সমস্যাগ্রস্ত কয়েকটি ব্যাংক ও সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলন নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, বন্ধ কলকারখানা চালু করা এবং উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরবে সরকার।

রাজস্ব আয় বাড়ানোও সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। অর্থ উপদেষ্টার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপির তুলনায় রাজস্বের অনুপাত ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে তিনটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।

তবে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি, রাজস্ব বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত পথ এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আগের ঋণ কর্মসূচির অভিজ্ঞতা

বাংলাদেশের নতুন ঋণ আলোচনার পেছনে রয়েছে আগের কর্মসূচির অভিজ্ঞতা। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয়। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর্মসূচির ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়েছিল। ওই কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩৮০ কোটি ডলার পেয়েছে।

গত বছরের নভেম্বরে আলোচনা স্থগিত হওয়ার পর ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ ছাড় আটকে যায়। নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে আলোচনা আবার শুরু করার সিদ্ধান্ত নেয় আইএমএফ। তবে নতুন সরকার আগের কর্মসূচির পরিবর্তে নতুন ঋণ প্যাকেজের জন্য আবেদন করেছে বলে ৩ জুন দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন আইএমএফের বাংলাদেশ মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনার।

এবারের আলোচনায় বাংলাদেশের সামনে বড় প্রশ্ন হলো—নতুন ঋণ পেতে কী ধরনের শর্তে রাজি হতে হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকার কতটা নিজস্ব নীতি অনুসরণের সুযোগ পাবে। একইসঙ্গে ঋণের অর্থায়ন দেশের বৈদেশিক লেনদেনের চাপ কমানো, আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা আনা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গতিশীল করতে কতটা সহায়ক হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে গত সপ্তাহে আইএমএফের কঠিন শর্ত মেনে নতুন ঋণ নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার অর্থের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন আর্থিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে বলে জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আইএমএফের কঠিন শর্তযুক্ত ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেই আগের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছে সরকার। নতুন ঋণ কর্মসূচিতে কঠিন শর্ত দেওয়া হলে তা মেনে নেওয়া হবে না। তার ভাষায়, ‘বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবি টাকা দেবে আর আমরা দেশ চালাব—এই ধারায় আমরা পরিবর্তন আনছি।’

তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক চাহিদা পূরণে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে পাওয়া সীমিত অর্থ দিয়ে সেই চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। এ জন্য আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় পুঁজিবাজারকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প অর্থায়নের নতুন কৌশল নেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রীর এ বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ নিয়ে আলোচনায় শুধু অর্থের পরিমাণ নয়, ঋণের শর্ত এবং অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সরকারের স্বাধীনতার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে। তবে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ঋণের ব্যয়, পরিশোধের সক্ষমতা এবং দেশের ঋণঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিশ্ব অর্থনীতির নতুন দিকনির্দেশনা

ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠেয় সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, উন্নয়ন সংস্থার প্রধান ও আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রায় ৩৫ বছর পর থাইল্যান্ডে ফিরছে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের এই বার্ষিক আয়োজন।

সভায় অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ গুরুত্ব পাবে এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমবাজারকে খাপ খাওয়ানো।

একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য অর্থায়নের পথ খোঁজা হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাদের পক্ষে শুধু সরকারি অর্থ দিয়ে উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের চাহিদা পূরণ করা কঠিন।

বিশ্বব্যাংকের আলোচনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পাবে। অন্যদিকে আইএমএফের আলোচনায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং সরকারি ঋণের ঝুঁকি প্রাধান্য পাবে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগই বড় চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন কয়েকটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুর্বল রাজস্ব আহরণ, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম ও খেলাপি ঋণ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং বেসরকারি বিনিয়োগে ধীরগতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করছে।

এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে শুধু বিদেশি ঋণ বা উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য স্থিতিশীল নীতিপরিবেশ নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বাড়ানো ও রাজস্ব ফাঁকি কমানোর কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশের রতানির আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাতনির্ভর। এই নির্ভরতা কমাতে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ, হালকা প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। এ জন্য প্রযুক্তি স্থানান্তর, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, সহজ অর্থায়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে।

একইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ও তুলনামূলক কম সুদের অর্থায়ন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। উপকূলীয় অঞ্চলের সুরক্ষা, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে।

অর্থায়নের পাশাপাশি দরকার বাস্তবায়ন

ব্যাংককের বার্ষিক সভায় বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি হলেও শুধু বৈঠকে অংশ নেওয়া বা নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়াই অর্থনীতির সমস্যার সমাধান করবে না। ঋণের শর্ত, অর্থ ছাড়ের সময়সূচি এবং সংস্কারের অগ্রগতি দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলবে। পাশাপাশি উন্নয়ন অর্থায়ন ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট প্রকল্প, কার্যকর পরিকল্পনা এবং অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার গুরুত্ব তাই দ্বিমুখী। একদিকে নতুন ঋণ কর্মসূচির মাধ্যমে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করা, অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও রফতানি বাড়ানোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সঙ্গে নতুন উদ্যোগের পথ খুঁজতে হবে।

সব মিলিয়ে ব্যাংককের আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন ঋণ পাওয়া, সংস্কারের শর্ত নির্ধারণ এবং বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে এই সভার ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণ। তবে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতির গতিপথ নির্ভর করবে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত, সংস্কার বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর ওপর।




মুক্তির পথ খুঁজছে ইইউ: ইউরোপের বাজারে চীনের দাপট, বাণিজ্য ঘাটতি দিনে ১০০ কোটি ইউরো

মুক্তির পথ খুঁজছে ইইউ: ইউরোপের বাজারে চীনের দাপট, বাণিজ্য ঘাটতি দিনে ১০০ কোটি ইউরো
ছবি সংগৃহীত।

চীনের সঙ্গে তৈরি হওয়া বাণিজ্য ঘাটতি, বিরল খনিজ রপ্তানিতে দেশটির কড়াকড়ি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে দিন দিন বাড়তে থাকা ভারসাম্যহীনতা মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জন্য। এর সমাধানে ব্রাসেলসের কাছে সমমর্যাদার সংলাপ ও গভীর সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।

সম্প্রতি চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওর সঙ্গে বৈঠক করতে চীন সফর করেছেন ইইউয়ের বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচ। চীন থেকে ইইউতে পণ্য আমদানির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। চীনের সঙ্গে ইইউয়ের বাণিজ্য ঘাটতি দৈনিক ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে বিগত তিন মাস ধরে চলতে থাকা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় মারোস সেফকোভিচের এ সফর। আর মূলত তার এই সফরের পরই এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নতুন করে।

বিরল খনিজ রপ্তানিতে চীনের দেওয়া বিধি-নিষেধ ইউয়ের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে। এতে দুই পক্ষের ঐতিহ্যগত বাণিজ্যিক সম্পর্কে এক ধরনের কৌশলগত টানাপোড়েনও তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিদ্যমান মতভেদ দূর করতে উন্মুক্ত সহযোগিতা এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সংলাপ অত্যন্ত জরুরি।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ‘আমরা আশা করি ইউরোপীয় পক্ষ চীনের সাথে একত্রিত হয়ে সমাধান বের করার লক্ষ্যে কাজ করবে।’ একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক উভয় পক্ষের যৌথ স্বার্থ রক্ষা করবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

কেন্দ্রবিন্দুতে বাণিজ্য ঘাটতি
বেইজিং এবং ব্রাসেলসের মধ্যে অন্যতম প্রধান এবং দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইইউয়ের বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি।

ইউরোপীয় সরকার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপের বাজারে চীনা পণ্যের অতিরিক্ত আধিপত্য নিয়ে ক্রমাগত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। তাদের অভিযোগ, চীনা পণ্যের জন্য ইউরোপের বাজার সহজ হলেও চীনে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর প্রবেশাধিকার বেশ কঠিন।

অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন অনিশ্চিত হয়ে ওঠার কারণে বেইজিংয়ের কাছে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর ইইউয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সাথে তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে কীভাবে নিজেদের অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমিয়ে আনা যায় তা নির্ধারণ করা।

ইউরোপীয় নীতি-নির্ধারকেরা এখন চীনের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং কৌশলগত নির্ভরতা কমানোর ওপর জোর দিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তবে, দুই পক্ষের এই বিরোধ এখন কেবল সাধারণ পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য শক্তি, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পগুলোর জন্য যেসব বিরল খনিজ উপাদান অপরিহার্য, সেগুলো রপ্তানিতে চীন বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে। এর ফলে ‘সাপ্লাই চেইন’ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্বেগ চরম আকার ধারণ করেছে।

ইউরোপীয় দেশগুলো বেশ কিছু দিন ধরেই বিকল্প উৎস থেকে বিরল খনিজ সংগ্রহের চেষ্টা করছে। কিন্তু চীনের ওপর এই নির্ভরতা রাতারাতি কমিয়ে আনা সম্ভব নয়।

আলোচনার টেবিলে এটিই বেইজিংকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। তবে বাণিজ্য এবং খনিজ রপ্তানিকে চীন চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করায়, ইউরোপীয় দেশগুলো দ্রুততম সময়ে বিকল্প উৎসের জন্য উৎসাহিত হতে পারে।

সবমিলিয়ে এটি উভয় পক্ষের জন্যই ভারসাম্য বজায় রাখার পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। ইউরোপ চায় অর্থনৈতিক সুরক্ষা জোরদার করতে, আর চীন চায় ইউরোপীয় বাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার এবং একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক।

আরও বিস্তৃত কৌশলগত আলোচনার প্রত্যাশায় ফ্রান্স
চলমান এই বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি চীন ও ফ্রান্সের মধ্যে একটি পৃথক কূটনৈতিক তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইমানুয়েল বোন আগামী ৯ থেকে ১৩ অক্টোবর চীন সফর করবেন। সেখানে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। বেইজিং জানিয়েছে, এই বৈঠকের মূল লক্ষ্য হবে কৌশলগত যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করা।

বিশ্ব অর্থনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের মতো ভূ-রাজনৈতিক বিষয়গুলোর সাথে চীন-ইইউ অর্থনৈতিক সম্পর্ক নিবিড়ভাবে জড়িয়ে পড়ায় এই বৈঠকের সময়কাল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ফ্রান্স সবসময় ইউরোপের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি বেইজিংয়ের ব্যাপারে একটি স্বতন্ত্র ইউরোপীয় অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে এসেছে।

তাই ইইউর বাণিজ্য কমিশনার মারোস সেফকোভিচ ও চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওর মধ্যকার কারিগরি পর্যায়ের বাণিজ্য আলোচনার পাশাপাশি, ওয়াং ই-র সঙ্গে ইমানুয়েল বনের এই বৈঠক দুই দেশের মাঝে আরও বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ সুগম করতে পারে।

বর্তমানে বেইজিং এবং ব্রাসেলসের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যা বাণিজ্য বিরোধকে বড় কোনো সংঘর্ষে রূপ না দিয়ে ইউরোপের উদ্বেগগুলো নিরসন করবে।

চীনের সমমর্যাদার সংলাপের ওপর জোর দেওয়া ইঙ্গিত করে যে, তারা এই আলোচনাকে কেবল ইউরোপের একতরফা দাবির মুখে নতি স্বীকার হিসেবে দেখতে চায় না। অন্যদিকে, ইইউ প্রশাসনও বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এবং চীনা সাপ্লাই চেইনের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করতে নিজেদের দেশে রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

এ কারণেই সাম্প্রতিক এই আলোচনা নির্দিষ্ট পণ্য বা কেবল বাণিজ্য পরিসংখ্যানের সাধারণ কোনো বিরোধের চেয়ে অনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি কীভাবে ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার যুগে একে অপরের ওপর নির্ভরতা নিয়ন্ত্রণ করবে তা-ই এখন এই সম্পর্কের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যদি বেইজিং ও ব্রাসেলস বাজারের প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য ঘাটতি এবং বিরল খনিজ সরবরাহের বিষয়ে বাস্তবসম্মত চুক্তিতে পৌঁছাতে পারে, তবে তা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনৈতিক সম্পর্ককে স্থিতিশীল করতে সহায়তা করবে।

তবে আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, ইউরোপ হয়তো চীন থেকে নিজেদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুততর করবে এবং বেইজিংকে ইউরোপীয় বাজারে আরও বেশি বিধিনিষেধ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হতে পারে।

অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা কি চীন ও ইইউয়ের সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি কৌশলগত প্রতিযোগিতাই নতুন করে নির্ধারণ করে দেবে তাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সমীকরণ— সাম্প্রতিক এই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা তারই চূড়ান্ত পরীক্ষা

সূত্র : মডার্ন ডিপ্লোমেসি