বাঁশখালীতে সার ডিলার নিয়োগে চরম অনিয়ম

রিকশা গ্যারেজ ও সেলুনকেও দেখানো হয়েছে গোডাউন
টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে ভূঁইফোঁড় ও অনভিজ্ঞদের তালিকা
চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে সার ডিলার নিয়োগে চরম অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে ভূঁইফোঁড় ও অনভিজ্ঞদের তালিকায় স্থান দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব গোডাউন ও ধারণক্ষমতাহীন দোকান, রিকশা গ্যারেজ এবং সেলুনকেও দেখানো হয়েছে গোডাউন হিসেবে। টাকার বিনিময়ে আওয়ামী লীগের লোকজনকেও এই ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ বিএনপি নেতাকর্মীরাই। সার ডিলার নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সর্বত্র খোদ সরকারি দল বিএনপির নেতাকর্মীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। নেতাদের কেউ কেউ উপজেলা কৃষি অফিস ঘেরাওয়ের হুমকি দিয়েও ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন ও কতিপয় বিএনপি নেতা ভাগাভাগি করে সার ডিলার নিয়োগে বাণিজ্য করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এই ঘটনায় বাঁশখালীতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এর আগে ফ্যামিলি কার্ডের সুপারভাইজার নিয়োগেও উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
বাঁশখালীতে সারের এই ডিলার নিয়োগে অনিয়ম নিয়ে এখন খোদ বিএনপি নেতাদের মাঝেই দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ। অপরদিকে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সার ডিলার নিয়োগে অনিয়মের বিষয় তুলে ধরে বক্তব্য রেখেছেন বাঁশখালীর সংসদ সদস্য মাওলানা জহিরুল ইসলাম।
জানা গেছে, সারা দেশের মতো বাঁশখালীতেও সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। বাঁশখালীর একটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়নের জন্য ১৫টি পদের বিপরীতে শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। উপজেলা প্রশাসনের প্রস্তাবের আলোকে জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশে এসব নিয়োগ দেওয়া হলেও বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের অভিযোগের তীর উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে। তাছাড়া দলের কোনো কোনো নেতার বিরুদ্ধেও নিয়োগ বাণিজ্য ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ করা হচ্ছে।
উপজেলার সবচেয়ে বেশি আলোচিত স্থানগুলো হচ্ছে গণ্ডামারা, চাম্বল, সরল, কাথারিয়া ও পৌরসভা। রীতিমতো নিয়োগের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করার পর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, সরল ইউনিয়নের মিনজিরিতলা গ্রামে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া নুরুল ইসলাম আওয়ামী লীগ সমর্থক। তাছাড়া গোডাউনের অবস্থাও খুবই খারাপ। রড-সিমেন্টের গোডাউনকে সারের গুদাম হিসেবে দেখিয়েছেন তিনি। ধারণক্ষমতা যা লেখা হয়েছে তা-ও মিথ্যা। বিধি লঙ্ঘন করে যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাঁকে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাছাড়া নুরুল ইসলামের সার বিক্রির কোনো অভিজ্ঞতা নেই। টাকার বিনিময়ে প্রকৃত ব্যবসায়ী বাদ দিয়ে অনভিজ্ঞদের দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। বিপরীতে অন্য যারা আবেদন করেছিলেন, তাঁরা সকলেই ২০-২২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
গণ্ডামারা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া হোসাইন ছিদ্দিকীর নিজস্ব কোনো গোডাউন নেই। তদন্তে তাঁর পরিচয় লেখা হয়েছিল লবণের কামলা। সেলুন, অটোরিকশা গ্যারেজ এমনকি মুরগির দোকানকে গোডাউন দেখিয়ে অবৈধ অর্থের মাধ্যমে নিয়োগ ভাগিয়ে নিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সার পরিবহনের জন্য যে রাস্তা, তার অবস্থাও খুব খারাপ। হোসাইন ছিদ্দিকীর রয়েছে ট্রেড লাইসেন্সগত সমস্যা। মালিকের সঙ্গে চুক্তিতে যে দোকান দেখানো হয়েছিল, সার ডিলারের আবেদনে সে দোকান দেখানো হয়নি। তাছাড়া তাঁর নামে মালিকের সরাসরি কোনো চুক্তিপত্র নেই।
তাছাড়া চাম্বল ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া সোহাইল এন্টারপ্রাইজের সোহাইল আনোয়ার, কাথারিয়া ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া নজরুল ইসলাম ও পৌরসভার আবু তাহেরের বিরুদ্ধে রয়েছে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। তাঁদের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া হয়েছে একাধিক অভিযোগ।
অভিযোগকারীরা জানান, কৃষিপ্রধান বাঁশখালীতে সারের ডিলার একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সরবরাহ চ্যানেল। এই নিয়োগে স্বচ্ছতার ওপর এই জনপদের কৃষিনির্ভর জনজীবনের অনেক কিছুই নির্ভর করে। এই কারণে দলীয় ত্যাগীদের মূল্যায়ন বাদ দিয়ে কিংবা টাকার বিনিময়ে ডিলারশিপ নিয়োগ কোনোটাই কাম্য নয়। এইভাবে নিয়োগ হলে যে ব্যক্তি মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে ডিলারশিপ নিয়েছেন, তিনি চেষ্টা করবেন সারের কালোবাজারি করে তাঁর এই পুঁজি তুলতে। ফলে সার চলে যেতে পারে মিয়ানমারে কিংবা অবৈধ সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলবে এতে সন্দেহ নেই।
এই বিষয়ে কাথারিয়ার নজরুল ইসলাম বলেন, “আমি আওয়ামী লীগ করি না, বিএনপি সমর্থক।” তাছাড়া কাউকে টাকা-পয়সা দেওয়ার বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “দরখাস্ত করেছি, আল্লাহর পক্ষ থেকে কাজ হয়ে গেছে।”
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবদুস সবুর জানান, সার ডিলার নিয়োগে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে অর্থ লেনদেন প্রাধান্য পেয়েছে। দলের ত্যাগী নেতাদের বদলে আওয়ামী লীগের লোকজনও তালিকায় স্থান পেয়েছে।
বাঁশখালী উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব রাসেল চৌধুরী ফেসবুক পোস্টে লেখেন, “কত টাকার লেনদেনের মাধ্যমে এই ডিলারশিপ বিক্রি হয়েছে তার জবাব দিতে হবে। অন্যথায় দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কৃষি অফিস ঘেরাও করা হবে।”
বাঁশখালী পৌরসভা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক রাসেল ইকবাল মিয়া বলেন, “নেতারা এখন টাকা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। আগামীতে নেতাকর্মীদের নিয়ে এই অনিয়মের জবাব দেওয়া হবে।”
বাঁশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, “সার ডিলার নিয়োগে কৃষি অফিসের কোনো কর্তৃত্ব নেই। কৃষি অফিস ঘেরাওয়ের আগে কারা অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন, কারা অর্থ লেনদেন করেছেন সেটি বের করুন।”
বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, “সার ডিলার নিয়োগে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। জেলা সার-বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এই নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে। তবুও ভুলক্রমে কোনো আওয়ামী লীগের দোসর ডিলার নিয়োগ পেয়ে থাকলে তা তদন্ত করে বাতিল করা হবে।”








