দেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

দেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের

দেশের প্রবৃদ্ধি ৩.৪ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস বিশ্বব্যাংকের
ছবি সংগৃহীত।

জ্বালানি খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট, আর্থিক খাতের দুর্বলতা ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণসহ দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার পাশাপাশি বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ২০২৩ সাল থেকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের জন্য বাংলাদেশের জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক, জ্বালানি ও রাজস্ব খাতে গভীর সংস্কার প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

মঙ্গলবার (০৬ অক্টোবর) প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের নতুন হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ ‘বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেট’-এ ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ৩.৪ শতাংশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়, দেশে বর্তমানে বিনিয়োগ কার্যক্রম অত্যন্ত মন্থর হয়ে পড়েছে, রপ্তানি তার গতি হারিয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি অব্যাহতভাবে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন সাধারণ পরিবারের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। পাশাপাশি আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা ঋণ মধ্যস্থতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং সীমিত রাজস্ব সংস্থানের কারণে সরকারি বড় বিনিয়োগ কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে এসব বৈরী প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, শক্তিশালী রেমিটেন্স প্রবাহ এবং ক্রমবর্ধমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সহায়তায় বাহ্যিক খাত কিছুটা স্থিতিশীলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক আশা করছে, জ্বালানি সরবরাহ ক্রমান্বয়ে সহজ হওয়া এবং সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের গতি ত্বরান্বিত হলে ২০২৮ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসম বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা এড়াতে ও বেসরকারি বিনিয়োগ-চালিত অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরতে ব্যাংকিং খাত, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ এবং জ্বালানি খাতে দ্রুত ও সাহসী সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, দরিদ্রদের সুরক্ষার পাশাপাশি আরও বেশি ও উন্নত কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলোকে ত্বরান্বিত করতে বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে সাড়া দিতে হবে। এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই, এখনই পদক্ষেপ নেওয়ার উপযুক্ত সময়।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্য ও বৈষম্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং গত বছরের তুলনায় প্রায় ২১ লাখ বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বর্তমানে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি একপ্রকার থমকে গেছে এবং বিপুল সংখ্যক নারী তাদের চাকরি হারিয়েছেন। এদিকে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক দুর্বলতা আরও তীব্র হয়েছে, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ডিসেম্বর ২০২৫-এর ৩০.৬ শতাংশ থেকে আরও বেড়ে জুন ২০২৬-এ ৩৩.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দেশের রাজস্ব আদায়ের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক; জিডিপির মাত্র ৮.৩ শতাংশ রাজস্ব আদায় হচ্ছে যা বিশ্বজুড়ে অন্যতম সর্বনিম্ন পর্যায় এবং এর ফলে প্রয়োজনীয় জনকল্যাণমূলক খাতে সরকারি ব্যয় সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ২০২৫ অর্থবছরের ৩.৫ শতাংশ থেকে রাজস্ব ঘাটতি বেড়ে ২০২৬ অর্থবছরে জিডিপির ৩.৯ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি এবং কৃষি ভর্তুকি দরিদ্র ও দুর্বল জনগোষ্ঠীকে কিছুটা রক্ষা করতে সাহায্য করলেও বাস্তবতায় প্রায় অর্ধেক দরিদ্রতম পরিবার কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতার মধ্যেই নেই।

বিশ্বব্যাংক মনে করে, উন্নততর লক্ষ্য নির্ধারণের মাধ্যমে এই সামাজিক কর্মসূচিগুলোর দারিদ্র্য-প্রতিরোধমূলক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা সম্ভব। একটি অধিক সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিত করতে পারে যে সরকারের সীমিত সম্পদ যেন প্রকৃত দরিদ্র ও দুর্বল পরিবারগুলোর কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সম্প্রসারণ করা গেলে তা লক্ষ্য নির্ধারণ এবং আওতার ঘাটতি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, একাধিক খাদ্য ভর্তুকি একত্রিত করা এবং বিদ্যমান নগদ অর্থ কর্মসূচির সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণের সঙ্গে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ যুক্ত করার মাধ্যমে দেশে অতিরিক্ত ২৮.৫ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভব।

‘বাংলাদেশ উন্নয়ন হালনাগাদ’ মূলত বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আঞ্চলিক প্রতিবেদন ‘দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক হালনাগাদ’-এর একটি পরিপূরক অংশ হিসেবে আজ প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে পুরো দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও নীতিগত অগ্রাধিকারগুলো পর্যালোচনা করা হয়েছে।

শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার কারণে বিভিন্ন বৈশ্বিক ধাক্কার মুখেও দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলটি অসাধারণ স্থিতিশীলতা দেখিয়েছে, যার ফলে এ বছর দক্ষিণ এশিয়ার প্রবৃদ্ধি ৬.৯ শতাংশে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে প্রতিকূল বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে ২০২৭ সালে এই প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে ৬.৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইয়োহানেস জুট জানান, প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিবেশে দক্ষিণ এশিয়া অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে। কিন্তু এই ইতিবাচক গতি ধরে রাখতে এবং যুবসমাজের জন্য আরও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে অঞ্চলটিকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে দ্রুত বর্ধনশীল এআই গ্লোবাল ভ্যালু চেইন দ্বারা সৃষ্ট বিশ্বব্যাপী নতুন নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে দেশগুলোর উচিত দক্ষতা, অবকাঠামো এবং সহায়ক কর্মপরিবেশে বিনিয়োগ করা, যা কর্মী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এআই-এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সক্ষম করে তুলবে।

প্রতিবেদনটিতে বিশ্বব্যাংক বিস্তারিত আলোচনা করেছে কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) কৌশলগত ব্যবহার এই অঞ্চলে প্রবৃদ্ধির একদম নতুন উৎস তৈরি করতে পারে। বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় এআই-এর প্রয়োগ ও ব্যবহার দিন দিন বাড়লেও উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় তা এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছে। তবে এই ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও প্রযুক্তিটির ব্যবহার দ্রুতগতিতে বাড়ছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন বাজারের সুযোগ খুঁজে পেতে এআই ব্যবহার করা শুরু করেছে। শুধু বেসরকারি খাতই নয়, বিভিন্ন দেশের সরকারও সম্মুখসারির কর্মীদের কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনসেবা উন্নত করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যার বাস্তব উদাহরণ দেখা যায় ভারতে ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছে এআই-ভিত্তিক নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাস পৌঁছে দেওয়া এবং বাংলাদেশে এআই-এর সহায়তায় উন্নত রেটিনাল স্ক্রিনিংয়ের মতো উদ্ভাবনী জনসেবামূলক কার্যক্রমে।

বিশ্বব্যাংক গ্রুপের এশিয়া অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রানজিস্কা ওনসোর্গে এআই প্রযুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, রপ্তানির বৈচিত্র্য ও সুযোগ সম্প্রসারণ এবং জনসেবার মানোন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক উন্নয়নের গতিপথ বদলে দেওয়ার বিশাল সম্ভাবনা রাখে। তবে এই প্রযুক্তির সুদূরপ্রসারী সুবিধাগুলো বাস্তবে পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সরকারগুলোকে অবশ্যই সেই মৌলিক ও অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দূর করতে হবে, যা এআই গ্রহণের পথে বাধা সৃষ্টি করছে।




৩০ ব্যাংকের কার্ড-এটিএমসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ, কিউ-ক্যাশ কর্তৃপক্ষকে তলব

৩০ ব্যাংকের কার্ড-এটিএমসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ, কিউ-ক্যাশ কর্তৃপক্ষকে তলব
ছবি সংগৃহীত।

একসঙ্গে ৩০টির বেশি ব্যাংকের কার্ড, এটিএম ও এনপিএসবি-সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল লেনদেন সেবা বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনায় কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্ক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে সুইচিংসহ কার্ড-সংশ্লিষ্ট সব সেবা দ্রুত পুনরায় চালুর নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, সিস্টেম মাইগ্রেশন ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে ৩০টির বেশি ব্যাংকের বিভিন্ন ডিজিটাল লেনদেন সেবা বিঘ্নিত হয়। এতে এসব ব্যাংকের গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিকেশন্স অ্যান্ড পাবলিকেশন্স থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, গ্রাহকদের স্বার্থ ও আর্থিক লেনদেনের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে কিউ-ক্যাশ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে তলব করা হয়েছে। একই সঙ্গে অতি দ্রুত সুইচিংসহ কার্ড-সংশ্লিষ্ট সব সেবা পুনরায় চালুর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

তবে এনপিএসবি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্রোভাইডার এবং অন্যান্য পেমেন্ট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক লেনদেন অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক পরিচালিত BACPS, BEFTN ও RTGS-সহ দেশের অন্যান্য পরিশোধ ব্যবস্থার কার্যক্রমও স্বাভাবিক রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিকল্প পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের অনুরোধ জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।




চলতি বছর ৩ দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, লিটারে সর্বোচ্চ ৪৩ টাকা

চলতি বছর ৩ দফায় বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম, লিটারে সর্বোচ্চ ৪৩ টাকা
ছবি সংগৃহীত।

বছরের শুরুতে দুই দফা দাম কমলেও এরপর তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে দফায় দফায় দাম বাড়ায় ৯ মাস শেষে জানুয়ারির তুলনায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে বেড়েছে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবার ব্যয়ে। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের চাপও বেড়েছে।

বছরের শুরুতে দুই দফা দাম কমলেও এরপর এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। সবশেষ সেপ্টেম্বরে বৃদ্ধির পর জানুয়ারির তুলনায় ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে বেড়েছে ৩৩ থেকে ৪৩ টাকা। অক্টোবরেও এই বাড়তি দাম বহাল রয়েছে। জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে পণ্য ও সেবার ব্যয়ে, বাড়িয়েছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচের চাপ।

সরকার স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির আওতায় আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণ করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক কয়েক মাস ওই পদ্ধতিতে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করা হয়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। এর আগে বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই দফায় দাম কমানো হয়। এরপর এপ্রিল, জুন ও সেপ্টেম্বরে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে সরকার।

সর্বশেষ ২০ সেপ্টেম্বর চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যা ২১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হয়। ফলে ডিজেলের দাম দাঁড়ায় ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা। অক্টোবর মাসে এসে আবার দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

এর আগে জানুয়ারিতে চার ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়। ফলে ডিজেলের দাম ১০৪ টাকা থেকে কমে ১০২ টাকা, কেরোসিন ১১৬ থেকে ১১৪ টাকা, পেট্রোল ১২০ থেকে ১১৮ টাকা এবং অকটেন ১২৪ থেকে ১২২ টাকা হয়।

ফেব্রুয়ারিতে আবারও চার ধরনের তেলের দাম লিটারে ২ টাকা করে কমানো হয়। এতে ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, পেট্রোল ১১৬ টাকা এবং অকটেন ১২০ টাকায় নেমে আসে। মার্চে জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত ছিল।

এরপর ১৯ এপ্রিল থেকে দাম বাড়ানো হয়। ওই দফায় ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৮ টাকা বাড়িয়ে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ২০ টাকা বাড়িয়ে ১৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। মে মাসে আবার দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়।

জুনে আবারও দাম বাড়ানো হয়। তবে ওই দফায় ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রেখে কেরোসিন, পেট্রোল ও অকটেনের দাম লিটারে ৫ টাকা করে বাড়ানো হয়। ফলে ডিজেল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ টাকা হয়। জুলাই ও আগস্টে এই দাম অপরিবর্তিত ছিল।

অর্থাৎ জানুয়ারির দামের সঙ্গে অক্টোবরের সর্বশেষ দরের তুলনায় দশ মাসে ডিজেলের দাম বেড়েছে লিটারে ৩৩ টাকা, কেরোসিন ৪১ টাকা, পেট্রোল ৪২ টাকা এবং অকটেন ৪৩ টাকা। টাকার হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে অকটেনের দাম।

ভোগান্তিতে ভোক্তারা

বারবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় সরাসরি পরিবহন খরচের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয়ও বেড়েছে বলে মনে করছেন ভোক্তারা। বিশেষ করে ডিজেলনির্ভর পরিবহন খাতে ব্যয় বাড়ায় এর প্রভাব পড়ছে পণ্য পরিবহন ও যাতায়াতের খরচে। ফলে জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের চাপ সামলাতে গিয়ে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়েছে।

উত্তরার বাসিন্দা শামসুন নাহার বলেন, গত এক বছরে বাসা ভাড়া বেড়েছে, বাস ভাড়া বেড়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। কেবল বাড়েনি তাঁদের আয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সব জিনিসের দাম বেড়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে খরচ কমাতে অনেক কিছু কাটছাঁট করছেন তাঁরা।

মানিকনগরের এক বাসিন্দা বলেন, মাসের শুরুতে বেতন পান। মধ্যবিত্ত হিসেবে এমনিতেই সারা মাস আয়-ব্যয় মিলাতে হিমশিম খেতে হয়। এর মধ্যে কোনো জিনিসের দাম বাড়লে তার সরাসরি শিকার হন তাঁদের মতো মধ্যবিত্তরা। তেলের দাম বাড়ানোর প্রভাবে বাজারে জিনিসের দাম বেড়েছে, আবার বাস ভাড়াও বেড়েছে। সরকার লোকসানের কথা বলে দাম বাড়ায়, তাঁদের কথা ভাবে না।

কেন বারবার বাড়ে দাম

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি আর ইরানের যুদ্ধ একটি বড় কারণ। তবে সবচেয়ে বড় কারণ দেশের অর্থনীতি। সরকার একদিকে ব্যয় বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে ঘাটতি বাড়ছে। আবার ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। মানুষের আয়-ব্যয় কমার ফলে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে। এ কারণে সরকার দাম বাড়িয়ে সেটি জনগণের ঘাড়ে চাপাচ্ছে।

তিনি বলেন, সব মিলিয়ে অর্থনীতি দেউলিয়া হতে বসেছে। অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।




একসঙ্গে ৩০টির বেশি ব্যাংকের সেবা বন্ধ, ভোগান্তির শঙ্কায় গ্রাহক

একসঙ্গে ৩০টির বেশি ব্যাংকের সেবা বন্ধ, ভোগান্তির শঙ্কায় গ্রাহক
ছবি সংগৃহীত।

কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম আপগ্রেড ও মাইগ্রেশনের কারণে দেশের ৩০টির বেশি ব্যাংকের বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং সেবা সাময়িক বন্ধ থাকছে। ব্যাংক ভেদে সেবার ধরন ও বন্ধ থাকার সময় কিছুটা ভিন্ন হলেও এটিএম, কার্ড, ফান্ড ট্রান্সফার, ই-কমার্স ও বাংলা কিউআরসহ গুরুত্বপূর্ণ সেবা ব্যাহত হবে। এতে জরুরি প্রয়োজনে লেনদেন করতে গিয়ে গ্রাহকদের ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এনআরবিসি ব্যাংক, কৃষি ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া ও ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক এ বিষয়ে গ্রাহকদের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও সিস্টেম মাইগ্রেশনের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে কিছু সেবা বন্ধ থাকবে।

একটি ব্যাংক জানিয়েছে, ৪ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত কিউ-ক্যাশের আওতাভুক্ত এটিএম, ক্যাশ রিসাইক্লিং মেশিন (সিআরএম), ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের লেনদেন এবং পিওএস সেবা বন্ধ থাকবে। তবে ডেবিট কার্ডসহ কিছু বিকল্প সেবা চালু থাকবে।
এনআরবিসি ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, একই সময়ে এটিএম ও সিআরএম, ডেবিট-ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন, ফান্ড ট্রান্সফার ও বাংলা কিউআর সেবা সাময়িক বন্ধ থাকবে। তবে গ্রাহকদের সুবিধার্থে এনআরবিসি প্ল্যানেট অ্যাপের মাধ্যমে বিকাশ, নগদ ও উপায়ে ফান্ড ট্রান্সফারের সুবিধা চালু থাকবে। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকগুলোর বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে বিকল্প চ্যানেলে লেনদেনের সুযোগ থাকলেও সব ব্যাংকে একই ধরনের সুবিধা থাকবে না। ফলে কোন ব্যাংকের কোন সেবা বন্ধ থাকবে, তা গ্রাহকদের নিজ নিজ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি দেখে জেনে নিতে হবে।

কিউ-ক্যাশের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ৩৭টি ব্যাংক এ নেটওয়ার্কের আওতায় সেবা নিচ্ছে। ফলে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক ব্যাংকের প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সীমিত থাকায় গ্রাহকদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে জরুরি সময়ে এটিএম থেকে টাকা তোলা, কার্ডে কেনাকাটা কিংবা ফান্ড ট্রান্সফারের প্রয়োজন হলে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন গ্রাহকেরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, নিরাপদ ও আধুনিক ব্যাংকিং সেবা নিশ্চিত করতে কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের সিস্টেম মাইগ্রেশনের কাজ চলছে। এ কারণে নেটওয়ার্কটির আওতাভুক্ত ব্যাংকগুলোর কিছু সেবা সাময়িক বন্ধ থাকবে।

তিনি বলেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি। তবে ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তারা যেন গ্রাহকদের আগে থেকেই নোটিশের মাধ্যমে বিষয়টি জানায়। এতে গ্রাহকেরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারবেন এবং ভোগান্তি কমানো সম্ভব হবে।