সৌদি আরবে সাত হাজার বছরের প্রাচীন বাণিজ্যিক জনপদ আল-উলা
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৫৮ অপরাহ্ন

সৌদি আরবে সাত হাজার বছরের প্রাচীন বাণিজ্যিক জনপদ আল-উলা

সৌদি আরবে সাত হাজার বছরের প্রাচীন বাণিজ্যিক জনপদ আল-উলা
ছবি সংগৃহীত।

সৌদি আরবের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর আল-উলা। প্রাচীন সভ্যতা, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ধর্মীয় ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এ জনপদ হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। একসময় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হিসেবে পরিচিত আল-উলা বর্তমানে সৌদি আরবের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটক ও দর্শনার্থীরা এর প্রাচীন স্থাপনা, পাথরে খোদাই করা সমাধি এবং বিস্ময়কর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে ছুটে আসেন।

আল-উলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক নিদর্শনগুলোর একটি হলো ‘এলিফ্যান্ট রক’ বা হাতির পাথর। বিশাল এই পাথরটি দূর থেকে দেখতে অনেকটা দাঁড়িয়ে থাকা হাতির মতো। দীর্ঘ সময় ধরে বাতাস, বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের ফলে পাথরটি এমন অনন্য আকৃতি পেয়েছে। এটি মানুষের তৈরি কোনো ভাস্কর্য নয়; বরং প্রকৃতির নিজস্ব শিল্পকর্ম। সূর্যাস্তের সময় লালচে বালু আর বিশাল পাথরের সমন্বয়ে এখানকার দৃশ্য পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। বছরের বিভিন্ন সময়ে এখানে দর্শনার্থীদের উল্লেখযোগ্য সমাগম ঘটে।

আল-উলা শুধু একটি পর্যটন শহর নয়, এটি আরব উপদ্বীপের প্রাচীন ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, এ অঞ্চলে হাজার হাজার বছর ধরে মানুষের বসতি ছিল। প্রাচীন দাদান ও লিহইয়ান রাজ্যের বিকাশের মধ্য দিয়ে আল-উলা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে নাবাতীয় সভ্যতারও গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল এ অঞ্চলে।

প্রাচীনকালে ধূপ, সুগন্ধি দ্রব্য ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য পরিবহনের বাণিজ্যপথে আল-উলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এ অঞ্চলের পাথুরে পাহাড়, প্রাচীন বসতি, শিলালিপি ও সমাধিগুলো অতীতের মানুষের জীবনযাত্রা, বিশ্বাস এবং স্থাপত্যশৈলীর পরিচয় বহন করে। এসব নিদর্শন আল-উলাকে যেন একটি উন্মুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে পরিণত করেছে।

আল-উলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হলো হেগ্রা, যা মাদায়েন সালেহ নামেও পরিচিত। এটি সৌদি আরবের প্রথম ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এখানে নাবাতীয় সভ্যতার তৈরি পাথর কেটে নির্মিত শতাধিক সমাধি রয়েছে। এসব সমাধির সম্মুখভাগে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন নকশা ও শৈল্পিক কারুকাজ, যা প্রাচীন স্থাপত্যকলার উৎকর্ষের সাক্ষ্য দেয়।
হেগ্রার সঙ্গে ইসলামী ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। রাসুলুল্লাহ হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাবুক অভিযানের সময় আল-হিজর অঞ্চল অতিক্রম করেছিলেন বলে সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে এ অঞ্চলে প্রবেশের সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নির্দেশনা ও সতর্কতার বিবরণ পাওয়া যায়। তিনি সাহাবিদের আল্লাহর শাস্তিপ্রাপ্ত জাতির বসতিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে শিক্ষা গ্রহণ ও আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

ইসলামী বিশ্বাস অনুযায়ী, সামূদ জাতির কাছে আল্লাহ তাআলা নবী সালেহ (আ.)-কে পাঠিয়েছিলেন। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে এ জাতির ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। সামূদ জাতি পাহাড় কেটে ঘরবাড়ি নির্মাণে পারদর্শী ছিল। কিন্তু তারা নবী সালেহ (আ.)-এর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে এবং আল্লাহর নিদর্শন উটনীর ব্যাপারে অবাধ্যতা প্রদর্শন করে। পরিণতিতে তারা আল্লাহর শাস্তির সম্মুখীন হয়।
আল-হিজর ও মাদায়েন সালেহের সঙ্গে সামূদ জাতির ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—কোরআনে সামূদ জাতির ঘটনা বর্ণিত হলেও বর্তমানে আল-উলা অঞ্চলে দৃশ্যমান সব প্রাচীন স্থাপনা বা সমাধিকে সরাসরি সামূদ জাতির নির্মাণ বলে চিহ্নিত করা ঐতিহাসিকভাবে সঠিক নয়। হেগ্রার সংরক্ষিত সমাধিগুলোর বড় অংশ নাবাতীয় সভ্যতার নিদর্শন। তাই ধর্মীয় ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক তথ্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

আল-উলার আরেকটি উল্লেখযোগ্য স্থান হলো জাবাল ইখমাহ। এখানে পাহাড়ের পাথরে খোদাই করা অসংখ্য প্রাচীন শিলালিপি রয়েছে। এসব লিপির মাধ্যমে প্রাচীন আরবের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে স্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীন লিপি ও শিলালেখার কারণে জাবাল ইখমাহকে অনেক সময় উন্মুক্ত গ্রন্থাগারের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

আল-উলার পুরোনো শহরও দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। কাদা ও অন্যান্য স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত ঘরবাড়ি, সরু গলি এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য এ শহরের অতীত জীবনযাত্রার চিত্র তুলে ধরে। একসময় এখানকার পুরোনো বসতিতে অসংখ্য মানুষ বসবাস করতেন। বর্তমানে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণ ও পর্যটনের উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, উসমানীয় শাসনামলে নির্মিত হিজাজ রেলওয়ের সঙ্গে আল-উলার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠিত এ রেলপথ দামেস্ক থেকে মদিনা পর্যন্ত হজযাত্রী ও যাত্রী পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আল-উলা অঞ্চলের রেলওয়ে স্টেশন সেই সময়ের যোগাযোগব্যবস্থা ও ঐতিহাসিক পরিবর্তনের স্মারক হিসেবে পরিচিত।

বর্তমানে সৌদি আরবের পর্যটন উন্নয়ন পরিকল্পনায় আল-উলা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন, মরুভূমির অনন্য ভূপ্রকৃতি, পাথুরে পাহাড়, ঐতিহ্যবাহী বসতি এবং আধুনিক পর্যটনসুবিধার সমন্বয়ে শহরটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছে ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

বিশেষ করে এলিফ্যান্ট রক, হেগ্রা, জাবাল ইখমাহ ও আল-উলার পুরোনো শহর দেখতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকেরা আসেন। সৌদি আরবে ধর্মীয় সফরে আসা অনেক মানুষও দেশটির ঐতিহাসিক স্থানগুলো সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হন।

সব মিলিয়ে আল-উলা শুধু একটি প্রাচীন বাণিজ্যিক শহর নয়; এটি আরব উপদ্বীপের সভ্যতা, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাকৃতিক বিস্ময়ের এক অনন্য মিলনস্থল। হাজার বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে থাকা এ জনপদ অতীতকে জানার পাশাপাশি বর্তমান প্রজন্মকে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানবসভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
 




পটিয়ায় বাড়ির ছাদে থাই আনার ও মালটা চাষে প্রশংসিত তরুণ

পটিয়ায় বাড়ির ছাদে থাই আনার ও মালটা চাষে প্রশংসিত তরুণ
ছবি সংগৃহীত।

পটিয়া উপজেলার খরনা-কচুয়াই ইউনিয়নের ফকিরপাড়া এলাকার তরুণ শিক্ষানবীশ আইনজীবী আবদুল আজিজ নিজের বাড়ির ছাদে বিভিন্ন জাতের ফলের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় প্রশংসা কুড়িয়েছেন। বিশেষ করে চলতি মৌসুমে তাঁর ছাদবাগানে থাই জাতের বড় আনার (ডালিম) ও মালটার সফল ফলন স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

শুধু থাই আনারই নয়, তাঁর ছাদবাগানে রয়েছে আঙুর, আম, মালটা, কমলা, লিচুসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ। নিয়মিত পরিচর্যা ও আন্তরিক প্রচেষ্টায় সীমিত জায়গায় তিনি গড়ে তুলেছেন দৃষ্টিনন্দন ও সমৃদ্ধ একটি ফলের বাগান।

আবদুল আজিজ জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি দেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা এবং চট্টগ্রামের কয়েকটি উপজেলা থেকে উন্নত জাতের ফলের চারা সংগ্রহ করেন। পরে সেগুলো টবে রোপণ করে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে ছাদেই ফল উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। দীর্ঘদিনের শ্রম ও যত্নের ফল হিসেবে এবার থাই জাতের বড় আনার ও মালটার সফল ফলন পেয়েছেন, যা তাঁর কাছে বড় অর্জন।

তিনি বলেন, ছাদবাগান শুধু একটি শখ নয়, এটি পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি পরিবারের জন্য নিরাপদ ও বিষমুক্ত ফলের উৎস হতে পারে। আমি চাই আরও তরুণ ছাদবাগানে আগ্রহী হোক এবং নিজেদের বাড়িতে সবুজের পরিসর গড়ে তুলুক। কেউ ছাদবাগান করতে আগ্রহী হলে আমি সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

স্থানীয় বাসিন্দা ও ক্রীড়া সংগঠক ইঞ্জিনিয়ার জসিম উদ্দিন বলেন, আবদুল আজিজ অত্যন্ত পরিশ্রমী ও উদ্যমী একজন তরুণ। কোনো ধরনের সরকারি বা কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণ ছাড়াই তিনি ছাদে বিভিন্ন জাতের ফল উৎপাদন করে অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগ শুধু এলাকাবাসীকেই অনুপ্রাণিত করছে না, বরং ছাদবাগান বিষয়ে নতুন আগ্রহও সৃষ্টি করেছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরি সহায়তা পেলে তিনি আরও বড় পরিসরে সফলতা অর্জন করবেন বলে আমার বিশ্বাস।

স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের এ সময়ে ছাদবাগান পরিবেশ সংরক্ষণ, সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের একটি কার্যকর মাধ্যম। আবদুল আজিজের উদ্যোগ প্রমাণ করেছে, ইচ্ছাশক্তি, শ্রম ও সঠিক পরিচর্যা থাকলে সীমিত জায়গাতেও ব্যতিক্রমী সাফল্য অর্জন সম্ভব।