নারীর ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নে কক্সবাজারে ৬ লাখ ৫১ হাজার ১৭৭টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এ কার্যক্রম পরিচালনায় জেলায় ৮৫৩ জন তথ্যসংগ্রহকারী ও ১১১ জন সুপারভাইজার নিয়োজিত রয়েছেন। সোমবার (১২ অক্টোবর) থেকে দেশব্যাপী একযোগে এ তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
সরকারের এ কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র, অতিদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবারের নারীপ্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার মাধ্যমে নারীর মর্যাদা, অধিকার ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবারকেন্দ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এ কর্মসূচির অন্যতম লক্ষ্য।
সোমবার কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে জেলা পরিষদের প্রশাসক এ টি এম নুরুল বশর চৌধুরী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সাধারণ) শাহেদুল আলম, কক্সবাজার প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী, সাংবাদিক ইউনিয়ন কক্সবাজারের সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় কেন্দ্রীয় সংবাদ সম্মেলনের সঙ্গে জুম প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হয়ে কর্মসূচির বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলার ১১টি উপজেলা ও শহর সমাজসেবা ইউনিটের আওতায় মোট ৩১ লাখ ৩১ হাজার ৯৪ জন মানুষ এবং ৬ লাখ ৫১ হাজার ১৭৭টি পরিবার রয়েছে। এসব পরিবারের তথ্য সংগ্রহে ৮৫৩ জন তথ্যসংগ্রহকারী ও ১১১ জন সুপারভাইজার দায়িত্ব পালন করবেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে জেলায় ১৭০টি ট্যাব সরবরাহ করা হয়েছে।
কর্মসূচির আওতায় নিয়োজিত কর্মীরা বিশেষায়িত ট্যাব ব্যবহার করে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সরেজমিনে পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করবেন। সংগৃহীত তথ্য সরাসরি অনলাইন ডেটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
জেলা পর্যায়ে ৪ ও ৫ অক্টোবর প্রশিক্ষক প্রশিক্ষণ (টিওটি) অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ১০ ও ১১ অক্টোবর উপজেলা পর্যায়ে তথ্যসংগ্রহকারী ও সুপারভাইজারদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম পর্যায়ে উপজেলা পর্যায়ে ১৭০ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
জেলার ১১টি উপজেলা ও শহর সমাজসেবা ইউনিটের নির্দিষ্ট ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রথম পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএমখালী, ভারুয়াখালী ও চৌফলদণ্ডী; রামু উপজেলার গর্জনিয়া, কচ্ছপিয়া ও ঈদগড়; উখিয়ার রাজাপালং, জালিয়াপালং ও হলদিয়াপালং; টেকনাফ পৌরসভা, হ্নীলা ও বাহারছড়া; চকরিয়ার সুরাজপুর-মানিকপুর, ডুলাহাজারা ও লক্ষ্যারচর; মাতামুহুরীর কোনাখালী, পশ্চিম বড় ভেওলা ও ঢেমুশিয়া; পেকুয়ার রাজাখালী, উজানটিয়া ও মগনামা; কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, বড়ঘোপ ও উত্তর ধুরুং; মহেশখালীর ছোট মহেশখালী, বড় মহেশখালী ও কুতুবজোম; ঈদগাঁওয়ের ইসলামপুর, পোকখালী ও জালালাবাদ এবং শহর সমাজসেবা ইউনিটের ১, ৩ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ড রয়েছে।
কক্সবাজারে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাইলট কার্যক্রম শুরু হয় গত ১৬ মে। চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে পরিচালিত এ কার্যক্রমে ৩০৪ জন উপকারভোগী নির্বাচিত হন। পাইলট কর্মসূচির জেলা বাস্তবায়ন ও সমন্বয় কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয় ২৯ জুলাই।
দেশব্যাপী পাইলট কার্যক্রমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত আট বিভাগের ৪৪ জেলার ৫৫টি উপজেলা ও সিটি করপোরেশনের ৫৭টি ইউনিটে মোট ১ লাখ ১২ হাজার ৯৪টি পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রক্সি মিনস টেস্ট (পিএমটি) স্কোরের ভিত্তিতে নির্বাচিত ৭১ হাজার ৮৩১ জন যোগ্য উপকারভোগীকে ফ্যামিলি কার্ড ও ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা যাচাই করে উপকারভোগী নির্বাচনের জন্য স্কোরিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) খানা আয়-ব্যয় জরিপের ভিত্তিতে শহর ও গ্রামীণ এলাকার জন্য পৃথক ডোমেইনে স্কোর নির্ধারণের কথা জানানো হয়েছে। সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিটি পরিবারের স্কোর নির্ধারণ করা হবে এবং সেই স্কোরের ভিত্তিতে উপকারভোগী নির্বাচন করা হবে।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কর্মসূচির মূল দর্শন হলো—‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। এর মাধ্যমে পরিবারকেন্দ্রিক উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি এবং টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংবিধানের ১৫(ক) অনুচ্ছেদে নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ মৌলিক প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। এ সাংবিধানিক দায়িত্বের আলোকে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর খাদ্যনিরাপত্তা এবং জীবনধারণের মৌলিক চাহিদা পূরণে সহায়তা দেওয়াই ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
কর্মসূচি বাস্তবায়নে সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা ও পরামর্শ কামনা করেছে জেলা সমাজসেবা কার্যালয় ও জেলা প্রশাসন।