বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্বের উদ্যোগ: অর্থনৈতিক উন্নয়ন-সংকট মোকাবিলায় সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ চায় বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতের সংস্কার ও বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করেছে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ত্রৈমাসিক কিস্তিতে সাড়ে ৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে বাংলাদেশ।
এরই মধ্যে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছে আইএমএফ। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে নতুন অংশীদারত্ব ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের দল বসে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভার ফাঁকে এসব আলোচনা হয়। কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে (কিউএসএনসিসি) অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে বৈঠকেও বাংলাদেশের ঋণ ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলো উঠে আসে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, পরবর্তী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের দল বসে বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত কাজ করবে। এরপর আলোচনা শেষে বিষয়গুলো কীভাবে চূড়ান্ত করা হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে চায় বলেও জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বছরটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য একটি সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। বৈশ্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বৈঠকে বাংলাদেশের সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের নতুন অংশীদারত্ব ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে চুক্তির বিভিন্ন ইস্যু চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল নীতিগত বিষয়গুলোতে সমস্যা না থাকলেও আলোচনা শেষে যৌথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে কীভাবে বিষয়গুলো চূড়ান্ত রূপ পাবে, তা নির্ধারণ করা হবে।
দিনের শুরুতে অর্থমন্ত্রী ব্যাংক অব আমেরিকা, গুগল, আইএমএফ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও মুডিসের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণ, আর্থিক খাতের সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পায়।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক সংকটের সময়ে স্বল্প আয়ের দেশগুলোর জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা ও অংশীদারত্ব সবচেয়ে বড় শক্তি। দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে উন্নয়ন সহযোগীদের সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ।
রাজস্ব বাড়ানো ও ব্যাংক খাতে সংস্কার
এদিকে রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং কর-জিডিপি অনুপাত উন্নত করার বিষয়ে আইএমএফের পরামর্শের সঙ্গে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারেই রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে পৃষ্ঠপোষকতার সংস্কৃতি, কর অব্যাহতি ও কর জালিয়াতির কারণে রাজস্ব আহরণ বাড়েনি।
তিতুমীরের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার টাস্কফোর্স গঠন করেছে এবং রাজস্ব আহরণে অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। তার দাবি, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত অর্থবছরে রাজস্ব আয়ে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। বর্তমান সরকার ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি দায়িত্ব নেওয়ার পর ৩০ জুন পর্যন্ত রাজস্ব আয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ।
তিনি বলেন, অতীতে আইএমএফের কর্মসূচিতে থেকেও কার্যকর সংস্কার করা হয়নি। সে সময় কর-জিডিপি অনুপাত ছিল মাত্র ৬ দশমিক ৭ শতাংশ। বর্তমান সরকার সরকারি হিসাব যাচাইযোগ্য করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আইবাসসহ সরকারি ব্যবস্থায় সংরক্ষিত তথ্য যাচাই করা যায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণে প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি বাস্তব ফলাফল দেখাতে হবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে আইএমএফের পূর্বাভাসের ব্যাখ্যায় তিতুমীর বলেন, সংস্কার বাস্তবায়ন না হলে অর্থনীতির যে পরিস্থিতি হতে পারে, সেই প্রেক্ষাপটে আইএমএফের প্রক্ষেপণ দেখতে হবে। তার দাবি, আইএমএফের আর্টিকেল ফোর মিশনের প্রক্ষেপণে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথাও রয়েছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অতীতে ব্যাংক থেকে অর্থ লুটপাটের কারণে সৃষ্ট সংকট মোকাবিলায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে। এ পরিস্থিতির জন্য সাধারণ মানুষকে কেন মূল্য দিতে হবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিতুমীর বলেন, গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে আমানতকারীরা তাদের প্রাপ্য অর্থ উত্তোলনের সুযোগ পাচ্ছেন। তার দাবি, আস্থা ফেরায় অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলনের চাপ নেই; বরং অনেকে নতুন করে আমানত রাখছেন। অন্য যেসব ব্যাংকে অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে রেজল্যুশন অ্যাক্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার কমে আসাও ব্যাংকগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসার ইঙ্গিত দেয়।
কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্য কমানোর লক্ষ্য
রাজস্ব ও ব্যাংক খাতের সংস্কারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য কমানোকে সরকারের অর্থনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেন তিতুমীর। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী ম্যানুফ্যাকচারিং হাব ও এক্সপোর্ট গেটওয়ে গড়ে তোলার কথা বলেছেন। উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়িয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই এর লক্ষ্য।
দারিদ্র্য কমাতে ফ্যামিলি কার্ড এবং কৃষকদের সহায়তায় ফার্মার্স কার্ডের উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমেছেন, তাদের সেখান থেকে বের করে আনা এবং নতুন করে মানুষের দরিদ্র হয়ে পড়া ঠেকাতে চায় সরকার।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব প্রসঙ্গে তিতুমীর বলেন, এসব সংকট বাংলাদেশের তৈরি নয়। তবে এর প্রভাব যেন সাধারণ মানুষের ওপর না পড়ে, সে জন্য সরকার কাজ করছে। জ্বালানি, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও সার আমদানির ব্যয়ের পাশাপাশি কৃষক ও পরিবহন খাতের ওপর এর প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, আর কোনো মানুষ যেন দারিদ্র্যসীমার নিচে না চলে যায়।










