আজ সোমবার ২৭ জুন ২০২২, ১৩ই আষাঢ় ১৪২৯

‘দায়মুক্তি’ দিয়ে পাচারের টাকা দেশে আনার সুযোগ, দণ্ডিতদের কী হবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক : | প্রকাশের সময় : শুক্রবার ১৭ জুন ২০২২ ০৭:৫২:০০ অপরাহ্ন | অর্থনীতি

কর দেওয়ার মাধ্যমে পাচার করা অর্থ দেশে ফেরত আনার পক্ষে-বিপক্ষে রয়েছে নানা মত। প্রশ্ন উঠেছে, এতদিন যারা অর্থপাচারে জড়িত এবং অভিযুক্ত, তারা কি সরকারের সিদ্ধান্তের ফলে পরিত্রাণ পেতে যাচ্ছেন? নাকি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা বাতিল হচ্ছে? এমন সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন আইনজ্ঞরা।

গত ৯ জুন জাতীয় সংসদে ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য ৬ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাজেটের বিশাল ব্যয় মেটানোর জন্য অর্থ সংগ্রহে অর্থমন্ত্রী বিদেশ থাকা সম্পদের ‘দায়মুক্তি’ দিয়ে তা দেশে আনার ঘোষণা দেন। জানানো হয়, ওই সিদ্ধান্তের ফলে ১৫ থেকে ৭ শতাংশ কর দিয়ে বিদেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি দেশে সরকারের খাতায় বৈধ আয়ের তালিকায় যুক্ত করা যাবে। সেই অর্থ দেশেও আনা যাবে। কিন্তু ওই আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না।

তবে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত দেশের প্রচলিত আইনবিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিলে দুদক, এনবিআর ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের মামলা করার বিধান রাখার মানে কী? হঠাৎ করেই কেন এই শর্ত সামনে আসলো, এর পেছনে হয়তো ‘রহস্য’ আছে।’

সে ‘রহস্য’ কী হতে পারে জানতে চাইলে মনজিল মোরসেদ বলেন, ‘পাচার হওয়া ওই অর্থের কিছু ভাগ তো দেশে যারা আছেন তারাও ভোগ করেছেন। অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট শক্ত অবস্থান নিয়ে আছে। মূলত অর্থ পাচারকারীদের সুবিধা করে দিতেই হয়তো এ সিদ্ধান্ত।’ সরকারের এমন সিদ্ধান্ত বেআইনি বলেও মনে করেন তিনি।

অর্থ পাচারের অভিযোগে ভারতে গ্রেফতার পি কে হালদারের বিষয়টি গত ১৬ মে বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের নজরে আনা হয়। বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন সংশ্লিষ্ট কোর্টের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন মানিক।

তখন হাইকোর্ট অর্থ পাচারকারীদের বিষয়ে তার অবস্থান নিয়ে মন্তব্য করে বলেছিলেন, ‘প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারকে গ্রেফতার করায় ভারত সরকারকে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। আমাদের মেসেজ ক্লিয়ার (পরিষ্কার  বার্তা), দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অপরাধের বিরুদ্ধে আমরা (সুপ্রিম কোর্ট) জিরো টলারেন্স। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না, সে যেই হোক। আমরা এ ব্যাপারে সিরিয়াস।’ এ মামলা ছাড়াও অর্থ পাচারের অভিযোগ থাকায় সহসা জামিনও মিলছে না অভিযুক্তদের।

এদিকে সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পর আগে যারা অর্থ পাচারের অভিযোগে দণ্ডিত হয়েছেন, বা পি কে হালদারের মতো অভিযুক্ত হয়েছেন তাদের ‘দায়মুক্তি’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর উত্তর খুঁজতে কথা হয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অর্থ পাচারের মামলায় যারা ইতোমধ্যে দণ্ডিত হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে সরকারের এমন সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে না। এমনকি যাদের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা চলমান তারাও এর আওতায় পড়বেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার মূলত একটি অর্থবছরকে কেন্দ্র করে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তারা হয়তো অর্থ ফেরত আনার একটি কৌশল হিসেবে এ পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে সেটা সরকারের পলিসি মেকারদের বিষয়। এতে দুদক আইন বা তাদের কর্মকাণ্ডে কোনও ব্যাঘাত সৃষ্টি করবে না বলে আমি মনে করি।’

এদিকে মনজিল মোরসেদ বলছেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে পাচার করা অর্থ দেশে আনলেই যে তারা দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন, তা কিন্তু না। সে ক্ষেত্রে দুদকের সুযোগ রয়েছে ওই ব্যক্তিরা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ কোত্থেকে অর্জন করলেন, তা জানতে চেয়ে মামলা করার।’