সীতাকুণ্ডে সরকারি পোর্টাল ক্লোন করে জমি জালিয়াতি জোড়া মামলা, প্রধান আসামি কারাগারে

৫৭.৪৫ শতক পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগ | সরকারি কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করে ওয়ারিশ সনদ তৈরির অভিযোগ | স্বামী দেলোয়ারসহ অজ্ঞাতনামা সাইবার চক্রের সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে জাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি, সরকারি কর্মকর্তাদের নাম, সিল ও স্বাক্ষর জাল এবং ৫৭.৪৫ শতক পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগে পৃথক দুই আদালতের নির্দেশে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় দুটি নিয়মিত মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া মামলার প্রধান আসামি মোছা. হাছিনা বেগম প্রকাশ কালনীকে (৬৪) কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। তবে মামলার অপর এজাহারনামীয় আসামি তাঁর স্বামী মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন (৬৬) এবং নকল ওয়েবসাইট তৈরির সঙ্গে জড়িত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি।
বুধবার (১৪ অক্টোবর ২০২৬) চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৭-এর বিচারক মো. সাখাওয়াত হোসেন গ্রেপ্তারকৃত হাছিনা বেগমকে কাস্টডি ওয়ারেন্টের (Custody Warrant) মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন। এর আগে মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সীতাকুণ্ড মডেল থানার দুই তদন্ত কর্মকর্তার পৃথক তদন্তের অংশ হিসেবে পরিচালিত অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
মামলার নথি ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, সীতাকুণ্ড পৌরসভার ০-৯ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম শিবপুর এলাকার বাসিন্দা মরহুম মো. খায়ের উল্লাহ মৃত্যুর আগে দুই কন্যা, জ্যেষ্ঠ কন্যা হাছিনা বানু এবং কনিষ্ঠ কন্যা মোছা. হাছিনা বেগম প্রকাশ কালনীকে রেখে যান। অভিযোগ অনুযায়ী, পৈতৃক সম্পত্তিতে উভয়ের প্রাপ্য হিস্যা থাকা সত্ত্বেও সম্পত্তির একক নামজারির মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ কন্যার হিস্যা থেকে তাঁকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, হাছিনা বেগম তাঁর স্বামী দেলোয়ার হোসেন ও অজ্ঞাতনামা সাইবার অপরাধীদের সহায়তায় সীতাকুণ্ড পৌরসভার মূল সরকারি ডাটাবেজ পোর্টাল https://sitakunda.prottoyon.net-এর আদলে একটি নকল ক্লোন ওয়েবসাইট তৈরি করেন। অভিযোগে উল্লিখিত নকল ওয়েবসাইটের ঠিকানা হলো: https://sitakunda.prottoyon.com-web.l7l0.cfd/verify_qrcode.php?tracking_id=74
ওই ওয়েবসাইট ব্যবহার করে কিউআর (QR) কোডযুক্ত একটি জাল ওয়ারিশ সনদ তৈরি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। সনদটির নম্বর ১০৪৪৪৬ এবং তারিখ ১২ এপ্রিল ২০২৬।
অভিযোগ অনুযায়ী, সনদটিতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম এবং সীতাকুণ্ড মডেল থানার অফিসার ইনচার্জের স্ক্যান করা সিল ও স্বাক্ষর ব্যবহার করা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জাল ওয়ারিশ সনদটি সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে দাখিল করে শিবপুর মৌজার আরএস/বিএস দাগভুক্ত মোট ০.৫৭৪৫ একর, অর্থাৎ ৫৭.৪৫ শতক পৈতৃক সম্পত্তির একক নামজারি খতিয়ান তৈরি করা হয়। খতিয়ানটির নম্বর ২০২৬-১০০০৩৩। এর মাধ্যমে বাদীর মায়ের প্রাপ্য সম্পত্তির হিস্যা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিষয়টি জানার পর পৌর প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। পৌরসভার নিজস্ব তদন্তে সনদটি সরকারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তৈরি হয়নি, বরং নকল ওয়েবসাইট ব্যবহার করে জাল নথি প্রস্তুত করা হয়েছে বলে উঠে আসে। পরে সীতাকুণ্ড পৌরসভা স্মারক নং সীঃপৌঃ/২০২৬/১৭৮, তারিখ ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মাধ্যমে সনদটি অবৈধ ঘোষণা করে বাতিল করে।
এ ঘটনা নিয়ে এর আগে ‘দৈনিক আমার দেশ’, ‘দৈনিক সমকাল’, ‘দৈনিক মানবজমিন’, ‘দৈনিক সাঙ্গু’, ‘দৈনিক কর্ণফুলী’ ও ‘দৈনিক চট্টগ্রাম মঞ্চ’সহ বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় গণমাধ্যমে সচিত্র অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।
সংক্ষুব্ধ হাছিনা বানুর পক্ষে তাঁর ছেলে অ্যাডভোকেট মো. আলী আজম গত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ চট্টগ্রামের পৃথক দুই আদালতে নালিশি আবেদন করেন। সাইবার পিটিশন মামলা নং ৫২৬/২০২৬ (চট্টগ্রাম)-এ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ও জেলা ও দায়রা জজ কাজী মিজানুর রহমান অভিযোগকারীর জবানবন্দি গ্রহণ এবং নথিপত্র পর্যালোচনা করেন। পরে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬-এর ১৮(১)(খ)(গ), ১৯(১)(গ), ২১(১), ২২(১) ও ২৭(১) ধারায় নিয়মিত মামলা রুজুর জন্য সীতাকুণ্ড মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে ২৫ নভেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের আদেশ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের স্মারক নং ১৫১২/২৬-এর ভিত্তিতে ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ৫৬ নম্বর মামলা রেকর্ড করা হয়।
একই দিনে সীতাকুণ্ড থানার আমলী আদালত-৭-এ দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারায় সি.আর. মামলা নং ৮০৭/২০২৬ দায়ের করা হয়। সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাখাওয়াত হোসেন নালিশি দরখাস্তটি এজাহার হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত মামলা রুজুর নির্দেশ দেন। আদালতের স্মারক নং ১১৯৪-এর ভিত্তিতে ১ অক্টোবর ২০২৬ সীতাকুণ্ড মডেল থানায় ৫ নম্বর মামলা রুজু করা হয়।
সাইবার সুরক্ষা আইনের ৫৬ নম্বর মামলার তদন্তভার পান সীতাকুণ্ড মডেল থানার এসআই মো. মাহমুদুল হাসান। অন্যদিকে দণ্ডবিধির ৫ নম্বর মামলার তদন্তভার পান এসআই মো. কামরুজ্জামান।
মামলাসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুই তদন্ত কর্মকর্তার তৎপরতায় তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সীতাকুণ্ডের শিবপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ নম্বর আসামি হাছিনা বেগম প্রকাশ কালনীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন বুধবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৭-এর বিচারক মো. সাখাওয়াত হোসেন তাঁকে জেলহাজতে পাঠানোর আদেশ দেন।
তবে মামলার অপর এজাহারনামীয় আসামি দেলোয়ার হোসেন এবং নকল ওয়েবসাইট তৈরিতে জড়িত থাকতে পারেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
মামলার বাদী অ্যাডভোকেট মো. আলী আজম বলেন, “সরকারি ওয়েবসাইট ক্লোন করে এবং সরকারি কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করে জাল ওয়ারিশ সনদ তৈরির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। ওই সনদ ব্যবহার করে পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। প্রধান আসামি হাছিনা বেগম গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ায় আমরা আইনের প্রতি আস্থাশীল হয়েছি। তবে তাঁর স্বামী দেলোয়ার হোসেনসহ নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদেরও দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী ও চট্টগ্রাম জেলা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর (অতিরিক্ত পিপি) অ্যাডভোকেট মো. সরওয়ার হোসাইন লাভলু বলেন, “সরকারি ওয়েবসাইটের আদলে নকল পোর্টাল তৈরি করে কর্মকর্তাদের সিল-স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগ রাষ্ট্রীয় ও স্থানীয় সরকারি ডিজিটাল সেবার নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক। পৃথক দুই আদালতের নির্দেশে দুটি মামলা রুজু হয়েছে। প্রধান আসামি গ্রেপ্তার হওয়ার পর আদালত তাঁকে জেলহাজতে পাঠিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “এখন তদন্তের মাধ্যমে নকল ওয়েবসাইটটি কে তৈরি করেছে, কারা প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে এবং জাল সনদ প্রস্তুত ও নামজারির সঙ্গে আর কারা জড়িত, তা বের করা জরুরি। আমরা আশা করছি, পুলিশ আইনানুগভাবে জিজ্ঞাসাবাদ ও ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে পলাতক আসামি এবং নেপথ্যের সাইবার চক্রের সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনবে।”
পুলিশ জানিয়েছে, মামলার অপর আসামি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে নকল ওয়েবসাইট তৈরির উৎস, জাল সনদ প্রস্তুতের প্রক্রিয়া এবং বিতর্কিত নামজারির সঙ্গে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
এদিকে সরকারি পোর্টাল ক্লোন করে জাল নথি তৈরির অভিযোগের পাশাপাশি পৈতৃক সম্পত্তির নামজারি নিয়ে ওঠা বিরোধের নিষ্পত্তি এখন তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়া সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় নির্ধারিত হবে।








