লামার ফাইতংয়ে দুই বোনের বিরুদ্ধে জমি জালিয়াতির অভিযোগ

বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে চরম দরিদ্রতা ও অসহায়ত্বকে পুঁজি করে দুই বোনের বিরুদ্ধে জমি জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। একই জমি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি এবং বিক্রির পর জমির দলিল হস্তান্তর না করায় চরম জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অভিযুক্ত দুই বোন হলেন—লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নের ফাদুরছড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত আবদু ছালাম ও মৃত খুরশিদা খাতুনের মেয়ে মদিনা বেগম (৫০) ও জরিনা বেগম (৪৭)। অন্যদিকে তাঁদের অসচ্ছলতার সুযোগ নিয়ে একটি দালাল চক্র ক্রেতাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতে নানা ষড়যন্ত্র করছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী মমতাজ বেগম, হামিদা আক্তার, মো. লালু, নুরুল কবির ও জাহাঙ্গীর আলমসহ স্থানীয়রা।
মঙ্গলবার (৫ আগস্ট) সরেজমিনে জানা যায়, মদিনা বেগম ও জরিনা বেগমের বাবা মৃত আবদু ছালাম লামা উপজেলার ৩০৬ নম্বর ফাইতং মৌজার ফাদুরছড়া এলাকায় আর/৩৩০ নম্বর হোল্ডিং সূত্রে ৫ একর ৩য় শ্রেণির জমির মালিক ছিলেন। ২০১৭ সালে ‘মক্কা মদিনা ব্রিকস’ (এমএমবি) নামের একটি ইটভাটা স্থাপনের জন্য মূল মালিক আবদু ছালামের স্ত্রী খুরশিদা খাতুন ও দুই মেয়ে মদিনা বেগম ও জরিনা বেগম ৫ বছরের জন্য উক্ত জমি ভাড়া দেন। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দুই বোন স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে উক্ত জমি রুহুল আমিন নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেন (১৪ এপ্রিল ২০১৯ তারিখের ২৮৮/২০১৯ নম্বর চুক্তিনামা দলিলসূত্রে ৪ একর ৯০ শতক)। এ নিয়ে পরবর্তীতে মামলা-মোকদ্দমা হলে দেওয়ানি আদালত রুহুল আমিনকে জমির বৈধ মালিক হিসেবে স্বীকৃতি দেন।
ইটভাটার মালিক মুমিনুল ইসলাম ও গিয়াস উদ্দিন জানান, উক্ত জমিতে ইতোমধ্যে 'এমএমবি' ইটভাটা গড়ে ওঠায়, ইটভাটার মালিক ওয়াহিদুল ইসলাম বায়নানামা দলিল (৩০৫/২০২১ ও ২৪২/২০২২ নম্বর) সূত্রে রুহুল আমিনের কাছ থেকে ৩ একর ১০ শতক জমি ক্রয় করেন। ইটভাটার অপর অংশীদার ফরিদ উদ্দিন রুহুল আমিনের বাকি অংশ ক্রয় করেন। এছাড়া জমির মূল মালিক মৃত আবদু ছালামের দ্বিতীয় স্ত্রী ও সন্তানরাও এই সম্পত্তির অংশীদার হওয়ায় ভাটার অন্য অংশীদার গিয়াস উদ্দিন তাঁদের কাছ থেকেও তাঁদের প্রাপ্য অংশ কিনে নেন। পাশাপাশ পার্শ্ববর্তী আলী আহমদের ছেলে আলী হোসেনের কাছ থেকেও ইটভাটার জন্য ৫ একর জমি ভাড়া নেওয়া আছে। তাঁদের ভাষ্য, "রেকর্ডপত্রে যে পরিমাণ জমি রয়েছে, বর্তমানে আমাদের দখলে ততটুকু নেই। তা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা আমাদের কাছ থেকে অবৈধভাবে টাকা হাতিয়ে নিতে না পেরে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে।"
অভিযোগ রয়েছে, রুহুল আমিনের কাছে ৪ একর ৯০ শতক জমি বিক্রির পরেও মদিনা ও জরিনা তথ্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে স্থানীয় স্ট্যাম্পে (গ্রাম্য কাগজে) আরও ৯০ শতক জমি বিক্রি করেন। এর মধ্যে আবু বক্কর ছিদ্দিকের স্ত্রী মমতাজ বেগমের কাছে ৩০ শতক, জাহাঙ্গীর আলমের কাছে ৩০ শতক, হামিদা বেগমের কাছে ১০ শতক, মো. লালুর কাছে ১০ শতক এবং নুরুল কবিরের কাছে ১০ শতক জমি বিক্রি করা হয়।
ভুক্তভোগী ক্রেতারা জানান, জমি বুঝিয়ে দেওয়া হলেও তাঁদের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও দুই বোন বিষয়টি এড়িয়ে চলছেন। ভুক্তভোগী মমতাজ বেগম বলেন, "দুই বোন এখন এলাকায় থাকেন না। জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে কিছু ভূমিদস্যু ও দালালের সহায়তায় ইটভাটা মালিক ও আমাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করছেন। টাকা না দেওয়ায় তাঁরা মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য ছড়াচ্ছেন।"
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত মদিনা বেগম বলেন, "এই জমি আমাদের। আমরা কারও কাছে জমি বিক্রি করিনি। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা জমি উদ্ধার এবং জালিয়াতিতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।"
এ বিষয়ে লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইছার হামিদ জানান, "বিষয়টি মূলত জমি জমা সংক্রান্ত বিরোধ। আদালতই এই সমস্যার আইনি সমাধান দেবেন। তবে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটে এবং শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে, সেজন্য ফাইতং পুলিশ ক্যাম্পকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে বলা হয়েছে।"











