মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ ৪ আ. লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন
বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ পূর্বাহ্ন

মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ ৪ আ. লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন

মানবতাবিরোধী অপরাধ : হানিফসহ ৪ আ. লীগ নেতার রায় যেকোনো দিন
ছবি সংগৃহীত।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষ হয়েছে। যেকোনো দিন এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়।

আসামিপক্ষে আজ যুক্তি উপস্থাপন করেন সরকারি খরচে নিয়োগ পাওয়া (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী আমির হোসেন। পরে প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তিখণ্ডন করা হয়। উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন হলে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন আদালত।

মামলায় হানিফ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন- কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চারজনই বর্তমানে পলাতক।

গত ৫ অক্টোবর আওয়ামী লীগের এই চার নেতার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে প্রসিকিউশন। আসামিরা পলাতক থাকায় স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীর যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আজকের দিন ধার্য রাখেন ট্রাইব্যুনাল। ওই দিন প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম।

প্রসিকিউশন জানায়, হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে মামলাটি আগেই শেষ হয়েছিল। কিন্তু নতুন করে কিছু অতিরিক্ত তথ্যপ্রমাণ দাখিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষ যুক্তিতর্ক সম্পন্ন করে।

প্রসিকিউটর তামিম বলেন, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন হানিফ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন দমনে সরকারের অংশ হিসেবে সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়েছিলেন তিনি। একইসঙ্গে অধীনস্তদের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে সবকিছু বাস্তবায়ন করেছিলেন। তিনি সিভিলিয়ান লিডার ছিলেন। এ কারণে অধীনদের নির্দেশ বা টেলিফোনে কথোপকথন করে এসব বাস্তবায়ন করেছেন।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন নাছিমদের একই অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অতএব একই অবস্থানে থেকে মাহবুবউল আলম হানিফকেও ট্রাইব্যুনাল একই শাস্তি দেবেন বলে আমরা আশা করছি। কেননা একটি দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সব ধরনের সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ করেছেন হানিফ। জুলাই গঅভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে উসকানি ও সহায়তার পাশাপাশি ওবায়দুল কাদেরের প্রত্যেক বৈঠকে উপস্থিত থেকে সমর্থন করেছেন তিনি। এছাড়া টেলিফোনে কথোপকথন করে কুষ্টিয়ার এসপি, জেলা-উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যাযজ্ঞ চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। টেলিফোনের সেসব কথোপকথন আমরা ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।

এর আগে, ১০ জুন এ মামলায় প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষে রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২। ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তার জেরার মধ্য দিয়ে ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। তবে প্রসিকিউশন থেকে অতিরিক্ত প্রমাণাদি দাখিল করায় পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করা হয়।

গত বছরের ২ নভেম্বর চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। ৫ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে ফরমাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন। পরদিন ৬ অক্টোবর তা আমলে নেওয়া হয়। মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য, ষড়যন্ত্র এবং কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।




শাপলা চত্বরে গণহত্যা: হাসিনা-বেনজীর-আজিজসহ ৪১ আসামির অভিযোগ গঠনের শুনানি পেছাল

শাপলা চত্বরে গণহত্যা: হাসিনা-বেনজীর-আজিজসহ ৪১ আসামির অভিযোগ গঠনের শুনানি পেছাল
ছবি সংগৃহীত।

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি হয়নি। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১ নভেম্বর দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

বুধবার (৭ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অন্য সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

ট্রাইব্যুনালে সময় চান আসামিপক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী। এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর আবদুস সোবহান তরফদার, ফারুক আহাম্মদ, জহিরুল আমিন, মঈনুল করিমসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

প্রসিকিউশন জানায়, এ মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ের শুনানির নির্ধারিত দিন ছিল। কিন্তু আসামিপক্ষ থেকে সময় চাওয়া হয়। এতে প্রসিকিউশনের আপত্তি না থাকায় শুনানির জন্য আগামী ১ নভেম্বর দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল।

এ মামলায় গ্রেপ্তার ১১ আসামি হলেন— জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ও সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাবেক মন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আবদুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, ৭১ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং সাংবাদিক ফারজানা রুপা। তারা আজ ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত ছিলেন।

শেখ হাসিনাসহ পলাতক অন্যরা হলেন— তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদ, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ, গণজাগরণ মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র‍্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালীন র‍্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপস) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (সদর দপ্তর ও প্রশাসন) মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি (ট্রাফিক-দক্ষিণ) আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল জোন) এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি (মতিঝিল বিভাগ) মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিএম ফরমান আলী।

এর আগে, ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনকে আত্মসমর্পণে দুইটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। তাদের স্থায়ী-অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়েও হদিস মেলেনি জানিয়ে প্রসিকিউশনের কাছে নন-এক্সিকিউশন রিপোর্টে (এনইআর) দাখিল করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। ১৬ সেপ্টেম্বর আত্মসমর্পণ না করায় ৩০ আসামিকে পলাতক দেখিয়ে সরকারি খরচে আইনজীবী নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আজকের দিন ধার্য করা হয়।

গত ২৭ জুলাই ৪১ আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই সঙ্গে, পলাতকদের নামে পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারদের হাজিরের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ মামলায় দুইটি অভিযোগের মধ্যে প্রথমটিতে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে ঢাকায় ৩২ জনকে হত্যার ঘটনা আনা হয়। দ্বিতীয় অভিযোগে আনা হয়েছে ৬ মে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে ২০ জনসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনা।




ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল

ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল
ছবি সংগৃহীত।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান শরিক জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছর করে কারাদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেছে প্রসিকিউশন।

সোমবার (৫ অক্টোবর) এ তথ্য জানিয়েছেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামীম বলেন, হাসানুল হক ইনুর ১০ বছরের সাজা বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করেছে প্রসিকিউশন।

এর আগে ৫ জুন মঙ্গলবার এ রায় ঘোষণা করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। রায়টি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

রায়ে তিন অভিযোগে ১০ বছর করে ৩০ বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

আসামিপক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী।
আটটি অভিযোগে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি, ১৪ দলীয় জোট সরকারের অংশীদার জাসদের সভাপতি হিসেবে তার ঊর্ধ্বতন অবস্থান থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা এবং কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলন দমনের নির্দেশনার পর ছয়জনকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।

বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার
অভিযোগে বলা হয়, হাসানুল হক ইনু ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেন।

১৪ দলের সভায় উপস্থিত থেকে উসকানি
আন্দোলন চলাকালে ১৯ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এবং জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর উপস্থিতিতে ১৪ দলীয় জোটের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমনে কঠোর থেকে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারির মাধ্যমে আন্দোলনরত নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

পরে দেশব্যাপী সেনা মোতায়েন করে আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং তা কার্যকর করা হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে হাসানুল হক ইনু নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা দিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার এসপিকে ফোন
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০ জুলাই দুপুরে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে নিজ জেলা কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা প্রণয়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে পূর্বের নির্যাতনকে অনুমোদন করেন। এই নির্দেশনার পর কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের সদস্য এবং ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডাররা ৫ আগস্ট পর্যন্ত কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়।

এতে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন। রাইসুল হকসহ অসংখ্য নিরীহ-নিরস্ত্র আন্দোলনকারী আহত হন এবং অনেককে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়।

আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ
অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র (লেথাল উইপন) ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও, হেলিকপ্টার ব্যবহার করে গুলি চালানো, বোমা হামলা, আটক ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং উসকানি প্রদান করেন।

এরই অংশ হিসেবে ২০ জুলাই দুপুরে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার, আন্দোলনকারীদের ঘেরাও করে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে হামলা এবং গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে তিনি অনুমোদন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নে শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ততার অভিযোগও আনা হয়েছে।

গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার
অভিযোগে বলা হয়, ২৭ জুলাই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক হিসেবে আখ্যায়িত করে উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।

একইসঙ্গে সরকারের জারি করা কারফিউ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও নিপীড়নকে কৌশলে সমর্থন করেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা
অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের সভায় হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। সেখানে তিনি আন্দোলনকারীদের বিএনপি, জামায়াত, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমন এবং আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্দেশনা, প্ররোচনা, উসকানি ও সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের পরিচালিত হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, হাসানুল হক ইনু সার্বক্ষণিক শেখ হাসিনার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে আন্দোলন দমনে কারফিউ বহাল রাখা, দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার এবং নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতাকে ‘জঙ্গি’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা, উসকানি ও নির্দেশনা প্রদান করেন।

এর অংশ হিসেবে ৪ আগস্ট আন্দোলন দমনে কারফিউ জারি ও গুলি চালানোর মতো পদক্ষেপে শেখ হাসিনার গৃহীত সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য টেলিফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একইসঙ্গে নিজ দলের নেতাকর্মীদেরও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ায় ৬ জনকে হত্যা
অভিযোগে বলা হয়, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে ছাত্রদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে কুষ্টিয়া জেলার সর্বস্তরের জনগণের পাশাপাশি নিরীহ-নিরস্ত্র শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, মো. উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ রাস্তায় নেমে আসেন।

সকাল ১০টার দিকে কুষ্টিয়ার হাজারো নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে সেখান থেকে চৌড়হাস হয়ে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুগত অধস্তন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মো. মাহবুবউল আলম হানিফ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-এর সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা ও নির্দেশের প্রেক্ষিতে কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান আতার নির্দেশের স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সন্ত্রাসী অজয় সুরেখা, মানব চাকী, আতিকুর রহমান অনিক, শেখ হাফিজ চ্যালেঞ্জ, রাশিদুল ইসলাম বিপ্লব, তৈয়ব বাদশা, তাইজাল আলী খান, স্বপন কুমার গং পুলিশের ছত্রছায়ায় (কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে) নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলি চালাতে থাকে।

এই গুলিবর্ষণের ফলে দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে বক চত্বর থেকে আনুমানিক ৫০ গজ উত্তরে শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, বার্মিজ গলিতে সুরুজ আলী বাবু, হরিপুরগামী রাস্তার আড়ং-এর সামনে শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুত্তাকিন, মো. উসামা, তুলাপট্টির গলিতে ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী এবং ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন।




জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রিমান্ডে

জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রিমান্ডে
ছবি সংগৃহীত।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে লাগেজ ও ট্রলি সংকটকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা এবং সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় জামায়াত নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

শনিবার (৩ অক্টোবর) দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আল-বেরুনী মীর শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।

ঢাকা মহানগর আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন  বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিমানবন্দর থানার উপ-পরিদর্শক মাজেদুল ইসলাম তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করেন।


আদালত সূত্র জানায়, শুক্রবার গ্রেফতারের পর শনিবার রিমান্ড শুনানির জন্য আখতারুজ্জামানকে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। শুনানি শেষে আদালত তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, বিমানবন্দরের ঘটনায় আখতারুজ্জামানের পেছনে কোনো কুচক্রী মহলের ইন্ধন ছিল কি না এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। এ কারণে পাঁচদিনের রিমান্ড চাওয়া হয়।


মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) মদিনা থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে (বিজি-৩৩৮) বিপুলসংখ্যক যাত্রী ঢাকায় পৌঁছান। যাত্রীর চাপ বেশি থাকায় লাগেজ পেতে বিলম্ব হয়। একই সময়ে ট্রলি সংকট দেখা দিলে কয়েকজন যাত্রীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ সেখানে গেলে তাকে লক্ষ্য করে আখতারুজ্জামান অশালীন ভাষায় কথা বলেন এবং ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া ও মারধরের হুমকি দেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে।

এজাহারে আরও বলা হয়, আখতারুজ্জামানের সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় ভিডিও ধারণ শুরু করলে নিরাপত্তা সুপারভাইজার ওয়ারেন্ট অফিসার মোহাম্মদ কামাল উদ্দিন এতে বাধা দেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে আখতারুজ্জামান ওই নিরাপত্তাকর্মীকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।


এছাড়া যাত্রীদের জমজমের পানির বোতল ছুড়ে ফেলা এবং বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একজন প্রতিনিধির সঙ্গে মারমুখী আচরণের অভিযোগও মামলায় রয়েছে।

এর আগে শুক্রবার রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট এলাকার নিজ বাসা থেকে আখতারুজ্জামানকে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাকে বিমানবন্দর থানায় করা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান।