বিরোধিতা করে স্বৈরাচার ফেরার পথ খুললে গাদ্দারি হবে: প্রধানমন্ত্রী

বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারকে ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হলে তা জুলাইয়ের শহীদ ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে গাদ্দারি করার শামিল হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের নেতারা উপস্থিত না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, যাদের আত্মত্যাগের কারণে বিরোধী দলের নেতারা আজ বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, সেই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের পাশে তাদের থাকা উচিত ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধিতা করার জন্যই বিরোধিতা করলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। সংসদে বিরোধী দল অবশ্যই বিরোধিতা করবে, তবে সেই বিরোধিতা হতে হবে গঠনমূলক। পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে থেকে গেলে দেশকে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের ফলক উন্মোচন এবং আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জুলাই শহীদদের অনুষ্ঠানে বিরোধী দলের অনুপস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ
তারেক রহমান বলেন, জুলাই শহীদদের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি বিরোধী দলের নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা অনুষ্ঠানে না এলেও জুলাই শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এসে বসতে পারতেন।
তিনি বলেন, ‘সরকারের সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব আছে, থাকুক দূরত্ব। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু যাদের জীবন উৎসর্গের কারণে, যাদের আহত হওয়ার কারণে, যাদের চোখ হারানোর কারণে আজ আপনারা বিরোধীদলীয় নেতা ও সংসদ সদস্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন, সেই মানুষগুলোর মাঝেও তো আমরা আপনাদের দেখতে পাচ্ছি না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল যদি জুলাইকে ধারণ করে, তাহলে জুলাই শহীদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের উপস্থিতি থাকা উচিত ছিল। দেশের মানুষও দেখছে, বিরোধী দল বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করে যাচ্ছে। তবে বিরোধিতা করতে গিয়ে স্বৈরাচারকে ফিরে আসার পথ উন্মুক্ত করা হলে তা দেশের জন্য ভালো পরিণাম বয়ে আনবে না।
জুলাই ও মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের লক্ষ্য এক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, জুলাইয়ে যারা শহীদ হয়েছেন এবং ১৯৭১ সালে দেশকে স্বাধীন করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন, উভয়ের লক্ষ্য ছিল এক।
তিনি বলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল এ দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা, ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা, কথা বলার স্বাধীনতা, সুশিক্ষা, চিকিৎসাসুবিধা, কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।
তারেক রহমান বলেন, জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পরিবেশে ফিরে এসেছে। জনগণ গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করেছে। নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে এবং অন্য যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, তাদের বিরোধী দলের দায়িত্ব দিয়েছে।
তিনি বলেন, জুলাই শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে প্রায় ৮১৩ জন শহীদ জুলাই যোদ্ধার নাম সংরক্ষিত রয়েছে। এই স্মৃতিস্তম্ভ সব সময় মনে করিয়ে দেবে, যারা বেঁচে আছেন, দেশের জন্য ও দেশের মানুষের জন্য তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সব সময় জুলাইকে ধারণ করে। বিএনপি যেভাবে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে, একইভাবে জুলাইকে ধারণ করে। সরকার গঠনের পর থেকে জুলাইয়ে আহত যোদ্ধাদের পর্যায়ক্রমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শহীদ পরিবারের স্বজনদের সহযোগিতা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে করা হচ্ছে।
দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান
তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোট নিয়ে বিরোধী দল সংসদে বসেছে আর জনগণের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে বিএনপি। বিরোধী দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু সরকারি দল জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে না-বিষয়টি এমন নয়। সরকারি দলও মানুষের স্বার্থে কাজ করছে। তাই দোষারোপের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
তিনি বলেন, সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দলের কাজ হচ্ছে দেশের স্বার্থ এবং জনগণের স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করা। আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক। বিএনপির নেত্রী প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া দেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা আবার শুরু করেছিলেন। ‘যেখানেই গণতন্ত্র, সেখানেই বিএনপি আছে। যেখানেই বিএনপি আছে, সেখানেই গণতন্ত্র আছে,’ বলেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, সব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর একমত হওয়া সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে মতপার্থক্য স্বাভাবিক। তবে দেশের স্বার্থ, মানুষের কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, চিকিৎসাব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাব্যবস্থার মতো মৌলিক বিষয়ে একমত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সংবিধানের সংশোধন, সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্নমত থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যই জনগণ তাদের সংসদে পাঠিয়েছে। সংসদে আলোচনা, যুক্তি-তর্ক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ চায় না, সড়ক অবরোধ বা বিভিন্ন ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচির মাধ্যমে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হোক। জনগণ স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং দেশের অগ্রগতি চায়। একই সঙ্গে তারা গণতন্ত্রের চর্চা, ব্যক্তিস্বাধীনতা, ভোটের অধিকার এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উন্নতি দেখতে চায়।
প্রকৃতি রক্ষা করে স্থাপনা নির্মাণের আহ্বান
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উদ্যানটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি সংস্কার করা হয়েছে এবং জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে উদ্যানের আধুনিকায়ন করতে গিয়ে অনেক পুরোনো বড় গাছ কেটে ফেলা হয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে স্থাপত্য নির্মাণের ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব প্রকৃতির ক্ষতি কমিয়ে কাজ করতে হবে। মানুষের ও দেশের প্রয়োজনে স্থাপনা নির্মাণ করতে হলেও প্রকৃতিকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। দিন শেষে তা মানুষেরই উপকারে আসবে।
তিনি বলেন, জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, লাইব্রেরি ও বাগানসহ পুরো স্থাপনাটি জনগণের ও রাষ্ট্রের সম্পদ। দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকেরও এটি পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার দায়িত্ব রয়েছে। সবাইকে পরিবেশ নষ্ট করা এবং ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
হাসপাতাল ও সরকারি আবাসস্থলের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অসন্তোষ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দিন আগে ঢাকা শহরের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থল পরিদর্শন করেছেন তিনি। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশ ও পরিচ্ছন্নতা তুলনামূলকভাবে ভালো পেলেও সরকারি হাসপাতাল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থলের অবস্থা খারাপ দেখেছেন।
তিনি বলেন, হাসপাতাল পরিচালনার সঙ্গে অত্যন্ত শিক্ষিত ব্যক্তিরা যুক্ত। একইভাবে সরকারি আবাসস্থলে বসবাসকারীদের অনেকেই রাষ্ট্র পরিচালনা ও সরকারের নীতি বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা নিজেরা পরিবেশের বিষয়ে সচেতন না হলে সাধারণ মানুষকে কীভাবে সচেতন করবেন?
বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের চিকিৎসকদের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, চিকিৎসার প্রথম শর্ত হচ্ছে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা, পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করা। হাসপাতালের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে রোগীরা হাসপাতালে এসে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পান এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসস্থলও পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সুন্দর পরিবেশ মানুষের মন ভালো রাখে এবং মানসিক প্রশান্তি দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনবহুল বাংলাদেশে পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ যত বেশি দূষিত ও অপরিচ্ছন্ন হবে, মানুষের অসুখ-বিসুখ ও রোগবালাই তত বাড়বে। তাই সুন্দর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ শুরু করতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডেঙ্গুতে বহু মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গত প্রায় দেড় মাস ধরে সরকার বিএনসিসি, স্কাউট, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সিটি করপোরেশনগুলোর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা এবং এর প্রকোপ কমিয়ে আনা, যাতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম থাকে।
বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এডিস মশা সরকারি দল, বিরোধী দল কিংবা নিরপেক্ষ মানুষ-কাউকেই আলাদাভাবে চেনে না। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার গঠনের পর প্রথম দিকে ফজরের নামাজের পর বিভিন্ন স্থানে ঝাড়ু দিয়ে পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা গেলেও এখন আর তা তেমন দেখা যাচ্ছে না। এডিস মশা সবাইকে আক্রান্ত করতে পারে। তাই দেশের স্বার্থে এবং দেশের মানুষের স্বার্থে প্রত্যেককে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষে জুলাই শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে জুলাইয়ে আহত যোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারের সদস্য ও স্বজনদের সুস্থতা কামনা করেন তিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালামের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান ও প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা-৯ আসনের সংসদ সদস্য ও রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান (মিল্টন) এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা।










