পাহাড়ের গায়ে মেঘের আলিঙ্গন, দূরে নীলচে পর্বতমালা, সবুজ বন আর পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছ জলের ছন্দ—প্রকৃতির এমন অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে প্রতিবছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন অসংখ্য পর্যটক। শহরের ব্যস্ততা, যানজট ও কোলাহল পেছনে ফেলে পার্বত্য অঞ্চলে সবুজ পাহাড়ে এসে অনেকেরই মনে হয়, প্রকৃতির কাছে ফিরে পাওয়ার মতো আনন্দ আর কিছুতেই নেই—সাঙ্গু পত্রিকার প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপকালে এমনটাই বলছিলেন আব্দুল মান্নান নামের এক পর্যটক।
বান্দরবানের পাহাড়ি জনপদে পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করে পাহাড়, মেঘ, ঝরনা ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রা। ভোরের আলো ফুটতেই পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের আনাগোনা, বিকেলে সূর্যের নরম আলো আর সন্ধ্যায় পাহাড়ের নীরবতা—সব মিলিয়ে পর্যটকদের মনে তৈরি হয় ভিন্ন এক অনুভূতি।
পর্যটক ইসমাইল হোসেন বলেন, পাহাড়ে এসে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখাই নয়, এখানকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও আতিথেয়তাও ভ্রমণকে আরও অর্থবহ করে তোলে। পাহাড়ি পথে হাঁটা, ঝরনার পানিতে পা ভেজানো কিংবা কোনো উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারপাশের বিস্তীর্ণ সবুজ দেখা—প্রতিটি মুহূর্তই যেন আলাদা গল্প হয়ে জমা হয় স্মৃতিতে।
বিশেষ করে বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য যেন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। পাহাড়ের গায়ে নেমে আসে মেঘের আস্তরণ। কোথাও ঝরনা হয়ে নামে পাহাড়ি জলধারা, আবার কোথাও সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথে ছুটে চলে পর্যটকদের গাড়ি। প্রকৃতির এই রূপ মোবাইল ক্যামেরায় বন্দি করতেও ব্যস্ত থাকেন অনেকে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে পাহাড়ে ঘুরতে আসা রাকিব ইসলাম বলেন, শহরের জীবনে প্রতিদিনের ব্যস্ততার মধ্যে প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ খুব কম। পাহাড়ে এসে মনে হচ্ছে, কয়েক দিনের জন্য অন্য এক জগতে চলে এসেছি। এখানকার পরিবেশ ও দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধ করার মতো।
আরেক পর্যটক নাসিমা আক্তার বলেন, পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশের মেঘ ও সবুজ প্রকৃতি দেখার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। ছবি তুলে রাখছি, কিন্তু বাস্তবে যে সৌন্দর্য দেখছি, ছবিতে তার পুরোটা ধরা যায় না।
রুমার ট্যুরিস্ট গাইড সমিতির সভাপতি মো. বেলাল উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিন শ পর্যটক পাহাড়ে আসেন। পাহাড়ি এলাকায় পর্যটনের সম্ভাবনা অনেক। পরিকল্পিত পর্যটন অবকাঠামো, নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও পরিবেশের প্রতি সম্মান রেখে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি না করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয়রা। পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিক ও বোতলসহ বিভিন্ন বর্জ্য পাহাড়ি পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রকৃতিকে ভালোবেসে ভ্রমণ এবং যেখানে-সেখানে ময়লা না ফেলার বিষয়ে সচেতন হওয়ার তাগিদ রয়েছে।
এদিকে উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের পক্ষ থেকে পর্যটকদের সুবিধার জন্য বিভিন্ন স্থানে কটেজ, যাত্রীছাউনি ও রেস্টুরেন্টসহ নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পাহাড় শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের একধরনের নীরব সম্পর্ক তৈরির স্থান। পাহাড়ের নীরবতা, মেঘের ভেলা, ঝরনার শব্দ আর সবুজের মায়া অনেক পর্যটকের মনে তৈরি করে দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি। তাই ছুটির দিনে কিংবা অবসর পেলেই অনেকে আবারও ফিরে আসতে চান পাহাড়ের সেই চেনা-অচেনা সৌন্দর্যের কাছে।
প্রকৃতির এই টানেই পাহাড়ে আসা পর্যটকদের মুখে শোনা যায় একটাই কথা—পাহাড়ে এলে মন ভালো হয়ে যায়। আর সেই ভালোলাগার গল্পই বারবার মানুষকে টেনে নেয় পাহাড়-পর্বতের পথে।