৫৫ বছরেও সেতু নেই, টোলে সাঁকো পাড়ি ১০ গ্রামের মানুষ

ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানার নারায়ণহাটে হালদা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি আজকের নয়। স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় ৫৫ বছর ধরে এলাকার মানুষ একটি সেতুর আশায় প্রহর গুনছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু নারায়ণহাটের হালদা নদীর দুই পাড়ের অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রামের হাজারো মানুষের ভাগ্যে এখনো জোটেনি একটি নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে প্রতিদিন টোল দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের সাঁকো কিংবা নৌকায় পারাপার করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
নারায়ণহাট বাজার সংলগ্ন হালদা নদী নারায়ণহাট ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। নদীর দক্ষিণ পাশে রয়েছে জমিদারপাড়া, সুন্দরপুর, হাপানিয়া, রাজারটিলা, আনিচারখিল, খালাছিপাড়া, সন্দ্বীপপাড়া, পিলখানা, সুন্দর শাহ ছিলাইসহ একাধিক গ্রাম। অন্যদিকে উত্তর পাশে রয়েছে নারায়ণহাট বাজার, ইউনিয়ন পরিষদ, ভূমি অফিস, বাসস্টেশন, নারায়ণহাট ডিগ্রি কলেজ, কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, মহিলা মাদ্রাসা, বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
এছাড়া সেতুর দক্ষিণ পাশেই অবস্থিত নারায়ণহাট ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, নারায়ণহাট দাখিল মাদ্রাসা, হাপানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সামসুনাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, এ গণি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নারায়ণহাট ফরেস্ট রেঞ্জ অফিস এবং হযরত শাহ সুন্দর (রহ.)-এর ঐতিহাসিক আস্তানা শরীফ। এসব শিক্ষা, ধর্মীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত করতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে এলাকাবাসীর উদ্যোগে নির্মিত অস্থায়ী কাঠের সাঁকোই ছিল দুই পাড়ের মানুষের একমাত্র ভরসা। সাঁকোটি ব্যবহার করতে প্রতিদিন টোলও দিতে হয় স্থানীয়দের। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে সাঁকোটির একটি অংশ একাধিক বার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমানে সাধারণ মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো ও নৌকায় নদী পার হতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী, নারী, বৃদ্ধ ও রোগীদের দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন প্রায় ২০ হাজার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও অন্যান্য প্রয়োজনে এ পথে যাতায়াত করেন। কিন্তু একটি স্থায়ী সেতু না থাকায় জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া, কৃষিপণ্য বাজারজাত করা কিংবা মৃত ব্যক্তির মরদেহ গ্রামে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়। ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মালবাহী যানবাহন সরাসরি গ্রামে প্রবেশ করতে না পারায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে জোয়ার-ভাটার প্রভাবে নদী উত্তাল হয়ে উঠলে পারাপার আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। নৌকার স্বল্পতা, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং দুর্ঘটনার আশঙ্কা নিয়ে প্রতিদিন পথ চলতে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক শিক্ষার্থীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় নদী পার হওয়ার জন্য। এতে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত জুলাই থেকে একটি পক্ষের বাধার কারণে ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিতভাবে যেতে পারছেন না চেয়ারম্যান আবু জাফর মাহমুদ। ফলে জনসেবামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘদিনের অনেক সমস্যারও কার্যকর সমাধান হচ্ছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “চেয়ারম্যান সাহেব যদি নিয়মিত পরিষদে থাকতে পারতেন, তাহলে হয়তো এতদিনে আলোচনার মাধ্যমে অনেক সমস্যারই সুরাহা বের হয়ে আসত। কিন্তু আদালতের রায় পাওয়ার পরও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় তিনি অফিস করতে পারছেন না, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তির ওপর।”
এলাকাবাসীর দাবি, নারায়ণহাট বাজার সংলগ্ন হালদা নদীর ওপর প্রায় ১০০ মিটার দৈর্ঘ্যের একটি আধুনিক সেতু নির্মাণ করা হলে অন্তত ১০ থেকে ১২টি গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের অবসান হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, গত সরকারের আমলে এখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য প্রস্তাব ও প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছিল সেটি কার্যকর না হওয়ায় এলাকাবাসীর দুর্ভোগ বিবেচনায় একটি বেইলি সেতু নির্মাণের প্রস্তাবনাও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিলো। তবে স্থানীয় জনগণের প্রত্যাশা, সাময়িক সমাধান নয়; বরং একটি টেকসই ও স্থায়ী সেতুই পারে এ অঞ্চলের কয়েক দশকের বঞ্চনার অবসান ঘটাতে।
চেয়ারম্যান আবু জাফর মাহমুদ বলেন, নারায়ণহাট বাজার সংলগ্ন হালদা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। তিনি জানান, সেতুটি বাস্তবায়নের জন্য তিনি ইতিপূর্বে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ ও তদ্বির করেছেন। তিনি বলেন, “সেতুটি অত্যন্ত জরুরি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজে যাতায়াত করতে গিয়ে সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। তাই জনস্বার্থে দ্রুত সেতুটি নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
২নং ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুল হালিম বলেন, হালদা নদীর ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ এ এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। সেতুর অভাবে প্রতিদিন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুটি নির্মাণ করা হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং এলাকার সার্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি এলাকাবাসীর দাবি, নারায়ণহাটের হালদা নদীর ওপর দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করে হাজারো মানুষের নিরাপদ যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিত করা হোক।








