মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিরহাট গজারিয়া খালের সেতুটি ধসে পড়ার শঙ্কা, ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে হাজারো মানুষ, পুনর্নির্মাণের দাবি স্থানীয়দের

ফটিকছড়ির ভূজপুর থানার ২ নম্বর দাঁতমারা ইউনিয়নের শান্তিরহাট বাজার, বেতুয়া, তারাখোঁ সড়কের গজারিয়া খালের ওপর নির্মিত ঐতিহ্যবাহী সেতুটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এই সেতুটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৬৮ সালে দাঁতমারা ইউনিয়নের মেম্বার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজু মিয়ার প্রচেষ্টায় সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে সময় এ অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নির্মাণসামগ্রী আনা-নেওয়া ছিল কষ্টসাধ্য। নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ।
তৎকালীন এলাকার জনপ্রতিনিধি ফজু মিয়া মেম্বার ছিলেন সেতুটির অন্যতম স্বপ্নদ্রষ্টা। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি মুক্তিবাহিনীর সদস্য হওয়ায় পাক-হানাদার বাহিনী তাকে ধরে এনে নির্মাণাধীন তার স্বপ্নের এই সেতুর ওপর ব্রাশফায়ার করে হত্যা করে। স্বাধীনতার পর সেতুটির কাজ সম্পন্ন হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অবহেলা ও ভাঙনের কারণে এটি আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুটির পূর্ব পাশের অংশ মাঝখানে ফেটে অনেকটা নিচের দিকে দেবে গেছে। এ ছাড়া খালের পূর্ব পাশের বাঁধ ভেঙে মাটি সরে যাওয়ায় সেতুর গাইড ওয়াল ভেঙে দুই দিকে সরে গিয়ে গর্ত তৈরি হয়েছে। নিচে মূল পিলারগুলোতেও বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে কংক্রিট খসে পড়ে রড বের হয়ে গেছে। খালের দুই পাড়ে ভয়াবহ ভাঙনের কারণে সেতুটির স্থায়িত্ব নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, এটি দাঁতমারা ইউনিয়নের প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার মানুষের চলাচলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংযোগ। ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় ভারী যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও বিকল্প সড়কের দূরত্ব বেশি হওয়ায় প্রতিদিন কার, মাইক্রোবাস, সিএনজি, চাঁদের গাড়ি ও মিনিট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করছে।
সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শান্তিরহাট উচ্চবিদ্যালয়, শান্তিরহাট মিশকাতুন্নবী দাখিল মাদ্রাসা, শান্তিরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খাদিজাতুল কোবরা মহিলা মাদ্রাসা, ছোট বেতুয়া মাদ্রাসা, রহমানিয়া বালক-বালিকা মাদ্রাসাসহ অন্তত ৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শত শত শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সেতু পারাপার হচ্ছে।
সেতুটি পুনর্নির্মাণ করা হলে বড় বেতুয়া, ছোট বেতুয়া, তারাখোঁ, চুড়ামণি, গড়াভাঙ্গা ও হাতিমারা এলাকার মানুষের যোগাযোগব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। কৃষিপণ্য পরিবহন, বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জরুরি সেবাখাতে ব্যাপক সুবিধা সৃষ্টি হবে। সেতুটির পাশেই রয়েছে তারাখোঁ বন বিট, ফলে বন বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনাতেও সহজ হবে।
এ বিষয়ে দাঁতমারা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হাকিম বলেন, “সেতুটি পুনর্নির্মাণের জন্য উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে একাধিকবার আবেদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “দাঁতমারা ইউনিয়নের মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেতু। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ, স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে। সামনের বর্ষায় পানির স্রোত বৃদ্ধি পেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
এলাকাবাসীর দাবি, ইতিহাস, জনদুর্ভোগ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে গজারিয়া খালের ওপর একটি নতুন আধুনিক সেতু নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।








