বিদ্যুতের তারে ঝরল দুই কৃষকের প্রাণ, পথে বসার আশঙ্কায় ইউনুচের পরিবার

চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে ধানের চারা রোপণের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুই কৃষকের মৃত্যুর ঘটনায় শোকে স্তব্ধ দুই পরিবার। বিশেষ করে নিহত মো. ইউনুচের (৩৫) মৃত্যুতে তার তিন ছোট সন্তানসহ দুটি পরিবার চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এ ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২। পাশাপাশি নিহতদের স্বজনরা প্রতিটি পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
গত রবিবার (১৯ জুলাই) বিকেলে উপজেলার পাইন্দং ইউনিয়নের একটি কৃষিজমিতে ধানের চারা রোপণের সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান কৃষিশ্রমিক মো. ইউনুচ ও মো. হাসেম (৫০)। সোমবার রাত ৯টায় ভূজপুরের ফকিরহাটের মিরেরখিল জামে মসজিদ মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়।
নিহত ইউনুচ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দৈনিক মজুরির আয়ে চলত তার স্ত্রী ও তিন সন্তান-নাদিয়া আক্তার (৭), ইমাম হোসেন (৫) এবং নাদিহা (২)-এর সংসার। তবে তার দায়িত্ব শুধু নিজের পরিবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না। দুই বছর আগে বড় ভাই ইদ্রিসের মৃত্যুর পর ভাইয়ের তিন সন্তান ও স্ত্রীকেও নিজের আয়ে সহায়তা করে আসছিলেন তিনি। তার আকস্মিক মৃত্যুতে এখন দুটি পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
অন্যদিকে, নিহত হাসেমের পরিবারেও শোকের ছায়া নেমে এসেছে। যদিও পরিবারের অন্য উপার্জনক্ষম সদস্য থাকায় তারা অন্তত জীবিকার একটি অবলম্বন ধরে রাখতে পেরেছেন। তবে ইউনুচের পরিবারের সামনে এখন জীবিকা, সন্তানদের লেখাপড়া ও নিত্যদিনের ব্যয় মেটানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কয়েকদিনের ভারী বর্ষণে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির তার ছিঁড়ে কৃষিজমির পানিতে পড়ে ছিল। খুঁটির গাই তার না থাকায় পুরো জমির পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী হয়ে ওঠে। সেই পানিতে নেমে কাজ করার সময় মুহূর্তেই বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রাণ হারান দুই কৃষক।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, দুর্ঘটনার পর বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হলেও উদ্ধারকাজে বিলম্ব হয়। পরে স্থানীয়রাই মরদেহ উদ্ধার করেন। এরপর বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান।
চট্টগ্রাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ (ফটিকছড়ি) জোনাল অফিসের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. আশিক মাহমুদ সুমন বলেন, গাই তার তুলে ফেলার কারণে বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাটিও একই কারণে হয়েছে। ঘটনার আগে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় গাই তার পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং ছিঁড়ে যাওয়া তার মেরামত করা হয়েছে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ক্রস আর্ম অপসারণ করে নতুন ক্রস আর্ম স্থাপনের কাজ চলছে।
ঘটনার পর ফটিকছড়ি থানা পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলাও হয়েছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহত দুই পরিবারের প্রত্যেককে প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়দের দাবি, পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি পরিবারকে অন্তত ১০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
স্থানীয়দের দাবি, কৃষিজমির পাশের ঝুঁকিপূর্ণ বৈদ্যুতিক খুঁটি ও অবকাঠামো দ্রুত অপসারণ করে নিরাপদ বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
ভূজপুর ইউপি চেয়ারম্যান এএইচএম শাহজাহান চৌধুরী শিপন বলেন, ঘটনার পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে পরিবারগুলোর জন্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা চাই, তারা যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা দ্রুত পায়।








