বিতর্ক নিয়েই আসছে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা

চট্টগ্রামের আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে অন্যতম বৃহৎ উপজেলা ফটিকছড়ি। বিস্তীর্ণ জনপদ, পাহাড়-সমতল মিলিয়ে গড়ে ওঠা এই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হতে চলেছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের খসড়া প্রস্তাবে ফটিকছড়িকে বিভক্ত করে নতুন ‘ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা’ গঠনের প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। খুব শিগগিরই প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এ প্রস্তাব অনুমোদন পেতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব আব্দুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রি-নিকার সভায় নতুন উপজেলা গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক যাচাই-বাছাই শেষে বিষয়টি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাস ফটিকছড়িতে। বর্তমানে উপজেলাটিতে রয়েছে দুটি থানা, দুটি পৌরসভা এবং ১৮টি ইউনিয়ন। বিশাল ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও জনসংখ্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন উপজেলা গঠনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রত্যাশা, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি সেবা আরও দ্রুত ও সহজলভ্য হবে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আসবে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম হবে আরও কার্যকর।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, এই বিভাজন কোনো রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতার ফল নয়; বরং এটি প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জনসেবার মানোন্নয়নের অংশ। নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হলে সরকারি উন্নয়ন বরাদ্দ, অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে। শুরুতে একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়োগের মাধ্যমে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হবে।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বিতর্কও সামনে এসেছে। প্রস্তাবিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সঙ্গে বৃহত্তর সুয়াবিল ইউনিয়ন এবং নাজিরহাট পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। এ নিয়ে বৃহত্তর সুয়াবিল অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। সংগঠনটির দাবি, এসব এলাকা নতুন উপজেলার সঙ্গে যুক্ত হলে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
নতুন উপজেলার সদর দপ্তর কোথায় হবে, তা নিয়েও রয়েছে মতপার্থক্য। এক পক্ষ চায় সুয়াবিল ইউনিয়ন ও নাজিরহাট পৌরসভাকে যুক্ত করে ভুজপুর এলাকায় সদর দপ্তর স্থাপন করা হোক। অন্য পক্ষের দাবি, সদর দপ্তর হওয়া উচিত নারায়ণহাট ইউনিয়নের জুজখোলা মৌজায়। এ বিষয়ে একাধিক গণশুনানি অনুষ্ঠিত হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সচেতন মহল চায়, এমন স্থানে সদর দপ্তর হওয়া প্রয়োজন, যেখান থেকে সব ইউনিয়নের মানুষ সমানভাবে প্রশাসনিক সুবিধা ভোগ করতে পারবেন।
ফটিকছড়ির উত্তরাঞ্চলের মানুষের অভিযোগ, তারা দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের মূলধারা থেকে পিছিয়ে রয়েছেন। উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নাজিরহাটে হওয়ায় দূরবর্তী এলাকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন। এই হাসপাতালের সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি ভোগ করেন পার্শ্ববর্তী হাটহাজারী উপজেলার বাসিন্দারা।
শিক্ষা ক্ষেত্রেও উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল। নব্বইয়ের দশকের আগে সেখানে উল্লেখযোগ্য কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না। পরে স্থানীয় শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে কয়েকটি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হলেও এখনো সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের অভাব রয়েছে। পাশাপাশি অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভাতেই নতুন উপজেলা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার প্রস্তাব বর্তমানে নিকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
নিকারের অনুমোদনের পর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করবে নতুন উপজেলা। তখন দেশে উপজেলার সংখ্যা ৪৯৫ থেকে বেড়ে হবে ৪৯৬।








