বান্দরবানের খেয়াচল্যংয়ে ভুয়া জোত পারমিটে বন উজাড়ের অভিযোগ

বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার খেয়াচল্যং রেঞ্জে জোত পারমিটের আড়ালে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। রেঞ্জ কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামানের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অবস্থান না করা, একই হোল্ডিং বারবার ব্যবহার এবং সরেজমিনে গাছ যাচাই ছাড়াই পারমিটের কার্যক্রম সম্পন্ন করার অভিযোগ তুলে তাঁর দায়িত্বকালে দেওয়া অনুমোদনগুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
রাশেদুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাসের মধ্যে ২০টি জোত পারমিট অনুমোদন করেছেন। খেয়াচল্যং রেঞ্জের অধীন ৩১৭ নম্বর ক্যাচলং ও ৩৪৯ নম্বর ঘেরাউ মৌজায় ব্যক্তিমালিকানাধীন জোতের হোল্ডিং সীমিত এবং আগেও এসব মৌজায় জোত পারমিটের কার্যক্রম হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। একই হোল্ডিং পুনরায় ব্যবহার করে গাছ কাটার কাগজপত্র তৈরি এমন অভিযোগও উঠেছে।
সরেজমিনে পরিদর্শনে, খেয়াচল্যং রেঞ্জ কার্যালয়ের প্রধান ফটক ও কক্ষগুলো তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। পরিদর্শনের সময় সেখানে রেঞ্জ কর্মকর্তা কিংবা অন্য কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন না। স্থানীয় জানান, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও কর্মীরা নিয়মিত রেঞ্জ এলাকায় অবস্থান করেন না; তাঁরা বান্দরবান জেলা শহরে থাকেন।
দুর্গম বনাঞ্চলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনুপস্থিতির এই অভিযোগ বন পাহারা ও কাঠ পরিবহন তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কার্যালয়ের উপস্থিতি রেজিস্টার, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন বিবরণ এবং টহলের তথ্য পরীক্ষা করলে অভিযোগের বাস্তবতা স্পষ্ট হতে পারে।
অভিযোগ উঠেছে, পাহাড়ি এলাকার দাঁড়ানো গাছ সরেজমিনে যাচাই ও পরিমাপ না করেই ‘এ-ফরম’ তৈরি করা হয়েছে। একই মৌজা ও হোল্ডিং বারবার ব্যবহার করে কাগজপত্র সাজানো এবং জেলা শহরে বসে খাড়া মার্কা ও পাস মার্কা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব কাজে ভূমি প্রশাসনের কিছু ব্যক্তির সঙ্গে যোগসাজশ ও অর্থ লেনদেনের দাবি করা হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম কিংবা নির্দিষ্ট লেনদেনের প্রমাণ প্রতিবেদনে উপস্থাপন করা হয়নি।
জোত পারমিটের মাধ্যমে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির গাছ কাটার অনুমোদন নিয়ে সংরক্ষিত বনের কাঠ সরানো হয়েছে-এ অভিযোগের নিষ্পত্তিতে অনুমোদিত জমির অবস্থান ও মালিকানার তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি পারমিটে উল্লিখিত গাছের প্রজাতি, সংখ্যা ও পরিমাণের সঙ্গে বাস্তবে কাটা এবং পরিবহন করা কাঠের হিসাব মেলানো প্রয়োজন।
ভুয়া জোতের আড়ালে চম্পাফুল, গুটগুটিয়া, বৈলাম, গর্জন ও শিউরীর মতো শতবর্ষী মাদার ট্রি নিধন করার ফলে বনাঞ্চলের ক্যানোপি ধ্বংস হচ্ছে এবং এশীয় হাতি, মায়াহরিণ ও বিরল প্রজাতির উল্লুকের মতো বিপন্ন বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল স্থায়ীভাবে বিলীন হয়ে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে চরম সংঘাত তৈরি হচ্ছে। এছাড়া নির্বিচারে পাহাড় ন্যাড়া করার কারণে বর্ষা মৌসুমে মারাত্মক পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক ঝিরি ও পাহাড়ি ছড়াগুলো শুকিয়ে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট দেখা দিচ্ছে।
রোয়াংছড়ির খেয়াচল্যং অঞ্চলের বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও ছাত্র সংগঠনের জোরালো অভিযোগ, ডেপুটি রেঞ্জার মো. রাশেদুজ্জামান সরকারি বৈধ কাগজপত্রের আড়ালে এলাকার সহজ-সরল ও দরিদ্র আদিবাসীদের নাম ব্যবহার করে কৃত্রিম কাগজপত্র সাজিয়ে তাদের অধিকার হরণ করছেন এবং বাঙালি কাঠ ব্যবসায়ীদের সাথে সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সংরক্ষিত বনাঞ্চল সাফ করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক বনে গেছেন। বন, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষায় এই বিতর্কিত কর্মকর্তার ৬ মাসে ইস্যুকৃত সকল জোত পারমিটের নথি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের মাধ্যমে অবিলম্বে তদন্ত করে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও পরিবেশবাদী মহল।
এই বিষয়ে বক্তব্য নিতে রাশেদুল ইসলামকে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি।










