বন পাহারায় মানবেতর জীবন: ভূজপুর নারায়ণহাট রেঞ্জে জনবল, আবাসন ও যানবাহন সংকট

দেশের বনজ সম্পদ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা এবং সরকারি রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বন বিভাগ। কিন্তু মাঠপর্যায়ে বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই আজ নানা সংকটে জর্জরিত। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন নারায়ণহাট রেঞ্জের বিভিন্ন বিটে সরেজমিন পরিদর্শনে জনবল, আবাসন, স্যানিটেশন ও যানবাহন সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তার অধীনে এসিএফ এবং নারায়ণহাটে কর্মরত সহকারী বন সংরক্ষকের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এই প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় নারায়ণহাট, হাজারীখিল ও হাসনাবাদ রেঞ্জের মাধ্যমে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ব্যবস্থাপনা করা হয়।
নারায়ণহাট রেঞ্জের অধীনে রয়েছে নারায়ণহাট বিট, বালুখালী বিট, দাঁতমারা বিট, ধুরুং বিট এবং ফটিকছড়ি এসএফপিসি। হাজারীখিল রেঞ্জের অধীনে রয়েছে হাজারীখিল বিট, বারমাসিয়া বিট ও ফটিকছড়ি বিট। হাসনাবাদ রেঞ্জের অধীনে রয়েছে হাসনাবাদ বিট ও তারাকো বিট। এসব বিটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশাল বনাঞ্চল, সামাজিক বনায়ন এলাকা এবং সংরক্ষিত বনভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, উল্লিখিত প্রায় সব বিটেই তীব্র জনবলসংকট রয়েছে। অনেক বিটে অনুমোদিত পদের তুলনায় কর্মরত কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা অত্যন্ত কম। কোথাও একজন কর্মকর্তা বা কয়েকজন বনপ্রহরীকে বিশাল এলাকা তদারক করতে হচ্ছে। ফলে নিয়মিত টহল, অবৈধ গাছ কাটা প্রতিরোধ, বনভূমি দখল রোধ, সামাজিক বনায়ন তদারকি এবং বন মামলা পরিচালনা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
জনবলসংকটের পাশাপাশি আবাসনসংকটও প্রকট আকার ধারণ করেছে। যেসব বিটে কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন, সেসব স্থানে পর্যাপ্ত আবাসিক ভবন নেই। অনেক স্থানে জরাজীর্ণ ভবনে বসবাস করতে হচ্ছে। কোথাও আবার আবাসনের অভাবে অফিস কক্ষেই রাতযাপন করতে হয়। বেশ কয়েকটি বিটে মেঝেতে গাদাগাদি করে ঘুমানোর বাস্তবতাও দেখা গেছে। এতে একদিকে যেমন মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক বিটে ন্যূনতম স্যানিটেশন ব্যবস্থাও নেই। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট কিংবা নিরাপদ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে কোনো কোনো স্থানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জঙ্গলের ঝোপঝাড়ে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারতে হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চললেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের অন্যতম বড় অভিযোগ হলো যানবাহনসংকট। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি বনাঞ্চল ও দুর্গম এলাকা তদারকের জন্য প্রয়োজনীয় মোটরসাইকেল, জিপ কিংবা টহলযানের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে বনাঞ্চলের কোথাও অবৈধভাবে গাছ কাটার খবর পাওয়া গেলেও দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। অনেক সময় বন কর্মকর্তারা পৌঁছানোর আগেই কাঠ পাচারকারীরা গাছ কেটে ট্রাক বা অন্যান্য যানবাহনে তুলে পালিয়ে যায়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বিট কর্মকর্তা বলেন, বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা রাষ্ট্রের অমূল্য সম্পদ রক্ষায় দিনরাত কাজ করলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা ক্ষেত্রে অবহেলার শিকার। বন রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় জনবল, আবাসন, যানবাহন কিংবা মৌলিক সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি দূর করা হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের উদ্যোগে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
বাংলাদেশের বন সংরক্ষণে বন আইন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইনসহ বিভিন্ন আইন কার্যকর রয়েছে। এসব আইনে অবৈধ গাছ কাটা, বনভূমি দখল, বন্যপ্রাণী শিকার ও বনজ সম্পদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে জনবল ও লজিস্টিক সহায়তার অভাবে এসব আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অনেক ক্ষেত্রেই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন বিভাগ কেবল পরিবেশ রক্ষার institution বা প্রতিষ্ঠান নয়; এটি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পদেরও রক্ষক। পরিকল্পিত সামাজিক বনায়ন, বনভূমির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় সম্ভব। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা যাবে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ, আধুনিক আবাসন নির্মাণ, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত যানবাহন সরবরাহ, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর টহল ব্যবস্থা চালু এবং সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অন্যথায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ বনসম্পদ রক্ষা করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়বে।
রাষ্ট্রের অন্যতম আয়ের উৎস এবং পরিবেশ সুরক্ষার প্রধান ভিত্তি বন বিভাগ। অথচ বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না হলে বন সংরক্ষণের জাতীয় লক্ষ্য অর্জনও কঠিন হয়ে উঠবে। তাই চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের নারায়ণহাট, হাজারীখিল ও হাসনাবাদ রেঞ্জের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।








