পাহাড়ে ৭৮০ পরিবারের হাতে ২ লাখের বেশি ফলদ ও বনজ চারা বিতরণ

পাহাড়ে কৃষকদের হাতে উন্নত জাতের ফলদ ও বনজ গাছের চারা। কারও হাতে নারিকেল, কারও হাতে আম কিংবা লিচুর চারা। বিনামূল্যে পাওয়া এসব চারা ঘিরে কৃষকদের চোখেমুখে স্বস্তি ও আশার ঝিলিক। পাহাড়ের মাটি ও জলবায়ুকে কাজে লাগিয়ে ফলদ ও বনজ বাগান গড়ে তোলার পাশাপাশি পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণ এবং বাড়তি আয়ের স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আওতায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের উদ্যোগে জেলার সাতটি উপজেলার ৭৮০টি পরিবারের মধ্যে দুই লাখের বেশি ফলদ ও বনজ চারা-কলম বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। বিতরণ করা চারার মধ্যে রয়েছে নারিকেল, সুপারি, আম (আম্রপালি), লিচু, মিষ্টি তেঁতুল, টক তেঁতুলসহ বিভিন্ন প্রজাতির বনজ চারা। শুধু চারা নয়, সেগুলোর সঠিক পরিচর্যা ও উৎপাদন নিশ্চিত করতে উপকারভোগীদের মধ্যে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জৈব সার, কীটনাশক ও ছত্রাকনাশকও বিতরণ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের ঘোষণা বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএডিসি) উন্নত জাতের চারা ও কলম উৎপাদনের নির্দেশনা দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতাধীন দেশের ৮৩টি হর্টিকালচার সেন্টারকে উন্নত মান ও জাতের চারা-কলম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে অর্থবছরের শুরুতেই বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ প্রয়োজনীয় চারা ও কলমের চাহিদা জানায়। সে অনুযায়ী বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারসহ দেশের বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টার এবং বিএডিসি সরকারি মূল্যে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজ চারা সরবরাহ করে। পরে জেলা পরিষদের সদস্যদের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের মধ্যে এসব চারা বিতরণ করা হয়।
বালাঘাটা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক লিটন দেবনাথ জানান, এ বছর বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ ও বনজ চারার পাশাপাশি কৃষকদের চাহিদার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উন্নত জাতের ৩ হাজার ৫০০টি নারিকেল চারাও বিতরণ করা হয়েছে।
বিনামূল্যে উন্নত জাতের চারা পেয়ে রুমা উপজেলার কৃষক লালথালানপিয়াং বম বলেন, “হর্টিকালচার সেন্টার থেকে পাওয়া উন্নত জাতের এসব চারা দ্রুত ফল দেবে বলে আশা করছি। বাড়ির চারপাশে চারা রোপণ করেছি। এসব গাছ থেকে পরিবারের পুষ্টির চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ফল বিক্রি করে বাড়তি আয়ও করা সম্ভব হবে।”
বান্দরবান সদর উপজেলার কৃষক দিল চন্দ্র তংচংগ্যা বলেন, “একসঙ্গে ফলদ ও বনজ গাছের চারা পাওয়া আমাদের জন্য বড় প্রাপ্তি। এসব চারা রোপণের মাধ্যমে পরিবারের ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থায়ী সঞ্চয় গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
থানচি উপজেলার কৃষক মেনপয় ম্রো বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগে চারা পেয়ে আমরা যেমন বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পাচ্ছি, তেমনি পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি রক্ষারও সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাম্যাচিং বলেন, “সারা দেশের মতো সাম্প্রতিক সময়ে পাহাড়ি অঞ্চলেও গরমের তীব্রতা ও তাপমাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রভাব। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের জন্য তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।”
তিনি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে বান্দরবান জেলায় ব্যাপকভাবে ফলদ ও বনজ গাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। এসব চারার যথাযথ পরিচর্যা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে পাহাড়ে সবুজ বনায়ন সম্প্রসারিত হবে, অন্যদিকে ফল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।”
পরিবেশবিদ ও কৃষিসংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ে পরিকল্পিতভাবে ফলদ ও বনজ বনায়ন সম্প্রসারণ করা গেলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। তবে শুধু চারা বিতরণ নয়, রোপণ-পরবর্তী পরিচর্যা, টিকে থাকার হার এবং ফলন পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাই হবে এ কর্মসূচির প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।










