পারমাণবিক হামলা হলে আমরা প্রস্তুত আছি: ইরানের রাষ্ট্রদূত

ওমানের মধ্যস্থতায় আলোচনা সফলতার দিকে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই হামলা চালিয়েছে আমেরিকা ও ইসরায়েল। এখনও যেকোনও মুহূর্তে ইরানের ওপর নতুন করে হামলা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পারমাণবিক হামলা করলে ইরান প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমি জাহানাবাদি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) ঢাকায় ইরান দূতাবাস আয়োজিত মতবিনিময় সভায় এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি ইরানের বর্তমান অবস্থান, পারমাণবিক ইস্যু, হরমুজ প্রণালি এবং বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলেন।
৯ মাস ধরে যুদ্ধ চলছে, লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাতে ঘোষণা করেছিলেন যে আলোচনা সফলতার দিকে যাচ্ছে। আর সকালে আমেরিকা ও ইসরায়েল আমাদের ওপর হামলা করলো। আমাদের উপলব্ধি হলো, আমেরিকা ও ইসরায়েল যুক্তির ভাষা বোঝে না। তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না। তাদের কাছে আলোচনা মানে আত্মসমর্পণ।’
তিনি দাবি করেন, ‘গত ৯ মাস ধরে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলছে। পরিকল্পনা ছিল আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করবে, প্রতিবেশী দেশ থেকে বিরোধীদের ইরানে ঢোকাবে, আমাদের ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করবে, আমাদের ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে নিয়ে যাবে। এর কোনোটিই ঘটেনি। আমেরিকার সব ঘাঁটি এখন আমাদের হামলার আওতায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও সামরিক কমান্ডারসহ ৪৫০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক শহীদ হয়েছেন।’ তার মতে, ‘এর মধ্য দিয়ে আমেরিকা বিশ্বে নিজের আধিপত্যের শেষের দিকে যাচ্ছে।’
তার ভাষায়, ‘আমার পূর্বাভাস, আবারও যুদ্ধ হবে। আলোচনা খুব একটা আশাব্যঞ্জক নাও হতে পারে। তবে আমরা গণতন্ত্র ও আলোচনায় বিশ্বাসী। আমেরিকা যুদ্ধে যা অর্জন করতে পারেনি, তা এখন আলোচনার টেবিলে পেতে চায়। আমরা নতুন যুদ্ধের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করেছি, তবে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সৎভাবে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছি।’
পারমাণবিক হামলার আশঙ্কা ও ইসরায়েল প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আমেরিকা পারমাণবিক হামলা চালাতে পারে কি না জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমেরিকার ইতিহাসে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের নজির আছে। তাই তারা আবারও এই অপরাধ করতে পারে। আমেরিকা এখন কঠিন পরিস্থিতিতে আছে, তাদের বৈশ্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা ঝুঁকিতে। নিজেকে বাঁচাতে তারা যেকোনও অপরাধ করতে পারে, পারমাণবিক হামলাও।’
আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে ইরানের বড় শত্রু কে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে কোনও পার্থক্য দেখি না। আমাদের দৃষ্টিতে ইসরায়েল আমেরিকার একটি অঙ্গরাজ্য। ইসরায়েলই আমেরিকার নীতি নির্ধারণ করে। আমেরিকার অর্থনীতি, নিরাপত্তা, সংস্কৃতি সবকিছু জায়নবাদীরা পরিচালনা করে।’
পারমাণবিক হামলা ঠেকাতে ইরানের পরিকল্পনা কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মধ্যে যৌক্তিকতা দেখি না। তাই এই হামলা ঠেকানো যাবে না। কিন্তু যদি এমন হামলা হয়, তাহলে আমেরিকা ও ইসরায়েলকে আমরা কঠিন জবাব দেবো।’
হরমুজ প্রণালি খোলার শর্ত
হরমুজ প্রণালি খোলা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেন, ওমান ও কাতারের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তবে এখনই খোলা হচ্ছে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আমেরিকা ইরানের ওপর অবরোধ না ভাঙবে, ততক্ষণ হরমুজ নতুন করে খোলা হবে না। আমরা আমেরিকাকে যে প্রস্তাব দিয়েছি, সেখানে বলেছি— অবরোধ তুলে নেওয়া, পুনরায় হামলা না করার প্রতিশ্রুতিসহ আগের ঘোষিত শর্তগুলো মানলে আমরা হরমুজ খুলে দিতে প্রস্তুত।’
বাংলাদেশের জাহাজ ও জ্বালানি প্রসঙ্গ
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে বাংলাদেশের মতো দেশ, যার জ্বালানি সরবরাহ হরমুজের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কীভাবে সহায়তা করবে ইরান— এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘সত্যি কথা হলো, যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত পারস্য উপসাগরে কারো জন্যই কিছু করা সম্ভব নয়। তবে বাংলাদেশের কোনও জাহাজ যদি হরমুজ পার হতে চায়, দুটি শর্ত মানলে আমাদের পক্ষ থেকে কোনও সমস্যা নেই।’
শর্ত দুটি হলো— ইরানের সঙ্গে সমন্বয় করে চলাচল করা এবং ইরানের নির্ধারিত নিরাপদ রুট মেনে চলা।
তিনি দাবি করেন, ‘এখনও প্রতিদিন জাহাজ চলাচল করছে। যেসব জাহাজ হামলার শিকার হচ্ছে বা মাইনে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছে, তারা আমাদের নির্ধারিত রুটের বাইরে দিয়ে যাচ্ছে। নির্ধারিত রুটে গেলে এবং আমাদের জানালে কোনও সমস্যা নেই।’
বাংলাদেশের কোনও জ্বালানিবাহী জাহাজ এই রুট ব্যবহার করেছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই তথ্য আপনাদের সরকারের কাছে আছে। আমরা জাহাজ চলাচলের তথ্য রাখি, কিন্তু কোন দেশের কোন জাহাজ কী উদ্দেশ্যে যাচ্ছে, সেটা আমরা প্রকাশ করতে চাই না যাতে দেশগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি না হয়। তবে আপনাদের দেশে এখনও টহল আছে এবং আপনাদের কোনও জাহাজে হামলা হয়নি, এটাই প্রমাণ করে যে প্রক্রিয়াটি চলছে।’










