নাতির বিয়ের ঘর সাজাচ্ছিলেন দাদী, ফিরল কাফনে মোড়া লাশ
যে ঘরে কয়েকদিন পর নতুন বউ উঠার কথা ছিল, সেই ঘরেই এখন শোকের মাতম। দেয়ালে রঙের কাজ চলছিল, আত্মীয়স্বজনেরা ব্যস্ত ছিলেন বিয়ের প্রস্তুতিতে। কিন্তু সব আয়োজন থামিয়ে দিয়ে সাদা কাফনে মোড়ানো অবস্থায় বাড়ি ফিরলেন ওমানপ্রবাসী তরুণ মোহাম্মদ রায়হান। আর নাতির নিথর দেহ জড়িয়ে বুকফাটা আহাজারি করছিলেন শতবর্ষী দাদী রবিজা খাতুন।
ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের ছোট ছিলোনিয়া গ্রামের বাড়িটিতে শুক্রবার দুপুর থেকেই নেমে আসে শোকের ছায়া। ওমানপ্রবাসী যুবক মোহাম্মদ রায়হান সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
বাড়ির উঠোনজুড়ে তখন স্বজনদের আহাজারি। সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়েছেন শতবর্ষী দাদী রবিজা খাতুন। বারবার নাতির মুখ ছুঁয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, “এঁন অইবু জানিলি ভাইয়ুরে আঁই ঘরত বাঁধি রাইখতাম, এঁহন আঁই কেনে বাঁইচ্চুম! (এমন হবে জানলে নাতিকে আমি ঘরে বেঁধে রাখতাম, এখন আমি কেন বেঁচে থাকি)।
স্বজনরা জানান, ছোটবেলা থেকেই রায়হান দাদীর খুব আদরের ছিলেন। কোলেপিঠে করে বড় করেছেন তিঁনি। স্কুলে যেতে না চাইলে হাত ধরে নিয়ে যেতেন। বিদেশ যাওয়ার সময়ও চোখের পানি ফেলেছিলেন বৃদ্ধা দাদী। সেই নাতির লাশ দেখে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি।
পরিবার জানায়, রায়হানের মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। মায়ের মুখ দেখতে প্রায় এক মাস আগে ওমান থেকে দেশে ফেরেন তিনি। পরিবারের ইচ্ছা ছিল এবার দেশে এসে বিয়ে করে সংসার শুরু করবেন। সেই প্রস্তুতিও চলছিল পুরোদমে। বাড়ির দেয়ালে নতুন রঙ করা হচ্ছিল, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তাও অনেকটাই চূড়ান্ত ছিল।
কিন্তু শুক্রবার সকালে বন্ধুদের সঙ্গে সীতাকুণ্ডে বেড়াতে গিয়ে ঘটে দুর্ঘটনা। জুমার নামাজ আদায়ের জন্য সীতাকুণ্ডের গফুর শাহ জামে মসজিদের দিকে মোটরসাইকেলে রওনা হন রায়হান। পথে মোটরসাইকেলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রায়হানের ফুফাতো ভাই আলমগীর বলেন, “প্রবাসে থেকে অনেক কষ্ট করছে। পরিবারের জন্য নিজের সুখ-শান্তি বিসর্জন দিয়েছে। মামি অসুস্থ হওয়ার পর সব ফেলে দেশে চলে আসছে। আমরা ভাবছিলাম এবার ওর সংসার হবে। কিন্তু এভাবে চলে যাবে, কখনো ভাবিনি।”
মামাতো ভাই তারেকুল ইসলাম সাদ্দাম বলেন, “ছোটবেলা থেকেই খুব ভদ্র আর দায়িত্ববান ছিল রায়হান। বিদেশে থেকেও পরিবারের সব খোঁজখবর রাখত। দাদীর ওষুধ থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করত।”
শতবর্ষী রবিজা খাতুনের চোখে এখন শুধু নাতির শৈশবের স্মৃতি। তিনি বলছেন, “আঁর রায়হান ইস্কুলত ন যাইত, আঁই হাত ধরি ধরি লই যাইতাম।” আবার কখনো নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠছেন, “বিদেশত্তুন আইচ্ছি নাতি, আঁই কইলাম যে বউ আইন্নুম। হাইরে নাতি, বউ আঁর আনিত নপাইল্লাম।”
ঘরের এক কোণে এখনো পড়ে আছে রঙের বালতি আর তুলি। অসমাপ্ত দেয়াল যেন সাক্ষী হয়ে আছে একটি পরিবারের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, একটি সড়ক দুর্ঘটনা শুধু একজন তরুণের প্রাণই কেড়ে নেয়নি; কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ, অসুস্থ মায়ের শেষ ভরসা এবং এক শতবর্ষী দাদীর বেঁচে থাকার শেষ আনন্দটুকুও।








