নতুন উপজেলা, পুরোনো বিরোধ: সদর দপ্তর নিয়ে উত্তপ্ত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’

দীর্ঘদিনের দাবি, প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে নতুন ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। বুধবার (১ জুলাই) সচিবালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২১তম সভায় প্রধানমন্ত্রী নতুন এ উপজেলা গঠনের অনুমোদন দেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু এ তথ্য গণমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন।
কিন্তু নতুন এ উপজেলা ঘোষণার পরপরই সদর দপ্তরের অবস্থানকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। একাংশ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও অন্য অংশ এটিকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
উপজেলার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গণশুনানির সুপারিশ ও প্রশাসনিক যৌক্তিকতাকে উপেক্ষা করে সদর দপ্তরের অবস্থান নির্ধারণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই একমাত্র পথ।
উত্তরাঞ্চল নারায়নহাটের বাসিন্দা ও সরকারের সাবেক এক সচিব মেজবাহ উদ্দিন বলেন, 'সুয়াবিল ও উত্তরের ৩ ইউনিয়ন ভূজপুরে উপজেলা হলে তাদের কোনো কাজে আসবে না; বিধায় নতুন উপজেলার সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলন ও যুগপৎ আইনি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে। আমরা ব্যক্তিস্বার্থের উপজেলা চাই না।'
আবার ভূজপুরের বাসিন্দারা সরকারের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলনে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানান।
হারুয়ালছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন চৌধুরী বলেন, 'ভূজপুরের আশপাশের বাসিন্দাদের এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর হতে পারে না। এবার উপজেলা গঠনের মধ্য দিয়ে এলাকার তৃণমূলের উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে এবং সরকারের সেবাপ্রাপ্তিও সহজ হবে।'
নিকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত হয়েছে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলা। একই বৈঠকে কুমিল্লায় ‘বাঙ্গরা’ এবং ময়মনসিংহে ‘পাগলা’ নামে আরও দুটি উপজেলা অনুমোদন দেওয়া হয়। পাশাপাশি চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার অংশ নিয়ে ‘হালদা’ নামে একটি নতুন থানা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্থানীয়দের দাবি, নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত সর্বশেষ গণশুনানিতে নারায়ণহাট ও দাঁতমারার মধ্যবর্তী একটি সুবিধাজনক স্থানে সদর দপ্তর স্থাপনের বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনের সরেজমিন পরিদর্শন, যোগাযোগব্যবস্থা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসেবার বিষয় বিবেচনায় জুজখোলা মৌজায় সদর দপ্তর স্থাপনের প্রস্তাবও উঠে আসে। কিন্তু এসব উপেক্ষা করে পরে ভিন্ন এক স্থানের (ভূজপুর মৌজা) প্রস্তাব পাঠানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ধারণা, সেই স্থানটি ঠিক রেখেই নিকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন বাস্তবায়নের পথে। এরপর থেকেই উত্তরাঞ্চলের ছয় ইউনিয়নের বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।
সদর দপ্তরের অবস্থান নিয়ে চলমান এ বিরোধের জেরে গত মঙ্গলবার উপজেলার হেয়াকোঁ বাজার, নারায়ণহাট, বালুটিলা ও সুয়াবিল এলাকায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন স্থানীয়রা। এতে কয়েক ঘণ্টা ঢাকা–খাগড়াছড়ি ও খাগড়াছড়ি–চট্টগ্রাম আঞ্চলিক মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনকারীরা বলেছিলেন, নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্তকে তারা স্বাগত জানালেও সদর দপ্তর এমন স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ছয়টি ইউনিয়নের মানুষের জন্য সমানভাবে সহজপ্রাপ্য ও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর। গণশুনানির সুপারিশ এবং বাস্তব পরিস্থিতি উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। কিন্তু একদিনের মাথায় বুধবার নিকারের সভায় সরকারের এই সিদ্ধান্তে আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি আরও প্রকট হলো।








