আজ মঙ্গলবার ১৬ অগাস্ট ২০২২, ৩১শে শ্রাবণ ১৪২৯
বাঘ দিবস

সুন্দরবনের পর্যটন স্পটেও আসছে বাঘ, সংখ্যা বাড়ার আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক : | প্রকাশের সময় : শুক্রবার ২৯ জুলাই ২০২২ ১০:৫৭:০০ পূর্বাহ্ন | জাতীয়

# ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠনের ফলে বাঘ হত্যা কমেছে

# ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ’র তথ্য অনুযায়ী কম্বোডিয়া, লাও পিডিআর এবং ভিয়েতনামে বাঘ স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে

# বাঘ হত্যা বন্ধে শাস্তির বিধান বাড়ানো হয়েছে

# বাঘ হত্যা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবেও গণ্য হবে

সুন্দরবনে বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব চিরাচরিত। এই দ্বন্দ্ব নিরসনে সুন্দরবন সংলগ্ন জনগণ নিয়ে গঠন করা হয়েছে ৪৯টি ‘ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম’। এতে বাঘ হত্যা কমেছে কিছুটা। এখন সুন্দরবনের পর্যটন স্পটগুলোতেও দেখা মিলছে রয়েল বেঙ্গল টাইগার। পর্যটকদের ক্যামেরায় ধরা পড়ছে সেই দৃশ্য। আর তা ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে ২০১৪-১৫ সালে বন অধিদপ্তর পরিচালিত জরিপে সুন্দরবনে ১০৬টি বাঘের সন্ধান পাওয়া যায়। এরপর ২০১৭-১৮ সালের জরিপে ১১৪টি বাঘের সন্ধান পায় বন অধিদপ্তর। অর্থাৎ তিন বছরের ব্যবধানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ে ৮ শতাংশ। চলতি বছর তৃতীয়বারের মতো ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে মাধ্যমে বাঘ গণনার  কাজ শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে জানা যাবে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা কত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুন্দরবনে বনদস্যুদের আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ও চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য কমায় বাঘের সংখ্যা সবশেষ জরিপে বেড়েছে। এরই মধ্যে বাঘের প্রজনন, বংশ বৃদ্ধিসহ অবাধ চলাচলের জন্য সুন্দরবনের অর্ধেকেরও বেশি এলাকাকে সংরক্ষিত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে টহল ফাঁড়ি। পাশাপাশি চোরা শিকারিদের তৎপরতা বন্ধে চালু হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রোলিং। বর্তমানে সুন্দরবনের বিভিন্ন স্থানে বাঘ দেখতে পাচ্ছেন পর্যটকরা। এছাড়া বন বিভাগের কর্মকর্তারাও আগের তুলনায় বেশি বাঘ দেখছেন। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায় বাঘের সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে সঠিক জরিপ ছাড়া সেটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

বন বিভাগের তথ্যমতে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘ ছিল ৩৫০টি। এরপর ১৯৮২ সালের জরিপে ৪২৫টি বাঘ পাওয়া যায়। এর দুই বছর পর ১৯৮৪ সালে সুন্দরবন দক্ষিণ বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপ চালিয়ে ৪৩০ থেকে ৪৫০টি বাঘ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর ১৯৯২ সালে ৩৫৯টি বাঘ থাকার তথ্য জানায় বন বিভাগ। পরের বছর ১৯৯৩ সালে সুন্দরবনের ৩৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পাগমার্ক পদ্ধতিতে জরিপ চালিয়ে ৩৬২টি বাঘ রয়েছে বলে জানান ধন বাহাদুর তামাং। ২০০৪ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ৪৪০টি। তবে তার আগে ১৯৯৬-৯৭ সালে বাঘের সংখ্যা উল্লেখ করা হয় ৩৫০ থেকে ৪০০টি। ওই সময়ে পায়ের ছাপ দেখে বাঘ গণনা করা হয়।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণের জন্য ‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্প’ শীর্ষক প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। এ প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে বাঘ গণনা, বয়স ও লিঙ্গ অনুপাতে সুন্দরবনের কম বাঘ সম্পন্ন এলাকায় বাঘ স্থানান্তর, অন্তত দুটি বাঘের শরীরে স্যাটেলাইট ট্রান্সমিটার  স্থাপন ও মনিটরিং করা, বাঘের পরজীবীর সংক্রমণ ও অন্যান্য ব্যাধি এবং এর মাত্রা নির্ণয়, উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, সুন্দরবনের লোকালয় সংলগ্ন এলাকায় নাইলনের রশির বেষ্টনী তৈরি করা হবে। এরই ধারাবাহিকতায় বন অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আগামী অক্টোবর থেকে সুন্দরবনে শুরু হবে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের কাজ। পাশাপাশি বাঘের খাদ্য হিসেবে বিবেচিত সুন্দরবনে থাকা চিত্রা হরিণ ও শূকরের সংখ্যাও গণনা করা হবে।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, ২০১৮ সালে যে জরিপ হয়েছে সে আলোকে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি, এরপর আর জরিপ হয়নি। আমাদের পরিকল্পনা আছে। হয়তো আগামী এক বছরের মধ্যে বাঘের জরিপ কার্যক্রম আবার শুরু করবো। আগে অনেক সময় বাঘ লোকালয়ে এলে তাকে পিটিয়ে মারা হতো। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় সুন্দরবনসহ ৪৯টি গ্রামের জনগণকে সম্পৃক্ত করে ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে। এখন আর বাঘ পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটে না। এখন লোকালয়ে বাঘ এলে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সেগুলোকে আবার ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, আমরা স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম করেছি। তারা সেখানে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে আমাদের সঙ্গে কাজ করেন। কোনো বাঘ যদি লোকালয়ে চলে আসে- তারা যাতে আমাদের খবর দেয়, গ্রামবাসী বাঘটাকে যেন মেরে না ফেলে সেই ভূমিকাটাও তারা পালন করেন। এই জনসম্পৃক্ততার কারণে বাঘ পিটিয়ে মারার ঘটনা কমে এসেছে।