চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একের পর এক হত্যা, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই এবং কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটেছে। মাত্র ১১ দিনের ব্যবধানে দুটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড, দুই সাংবাদিকের বাড়িতে চুরি ও ডাকাতি এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতায় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে। সন্ধ্যার পর অনেক এলাকায় মানুষের চলাচল কমে গেছে। ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও সাধারণ বাসিন্দাদের অভিযোগ, অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠলেও দৃশ্যমানভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
সর্বশেষ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) দিবাগত গভীর রাতে উপজেলার এক সাংবাদিকের বাড়িতে সংঘটিত দুর্ধর্ষ ডাকাতির ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। 'সময়ের কণ্ঠস্বর'-এর সাংবাদিক মো. জাহেদুল ইসলামের বাড়ির দ্বিতীয় তলার জানালার গ্রিল কেটে ৮ থেকে ১০ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল ঘরে প্রবেশ করে। ডাকাতেরা অস্ত্রের মুখে পুরো পরিবারকে জিম্মি করে ফেলে। পরিবারের সদস্যদের হাত-পা বেঁধে মারধর করা হয়। পরে স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা ও মূল্যবান মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। পুরো ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটলেও আশপাশের কেউ টের পাননি। ঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর কয়েক দিন আগে সাতকানিয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক 'আমার দেশ'-এর সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাবরের বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। চোরেরা নগদ অর্থ ও মোবাইল ফোন নিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ফেলে রেখে যায়।
এদিকে গত মঙ্গলবার রাতে উপজেলার কেরানীহাট সিটি সেন্টারে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত হন তাহমিদুল হাসান হামীম (১৯)। স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক দিন ধরে কিশোরদের দুটি পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে বিরোধ মীমাংসার জন্য কেরানীহাট সিটি সেন্টারের দ্বিতীয় তলার একটি চায়ের দোকানে বৈঠকের আয়োজন করা হয়। সেখানে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সংঘর্ষ চলাকালে হামীম প্রথমে লোহার রড দিয়ে রোহান উদ্দিনের হাতে আঘাত করেন। পরে রোহান সঙ্গে থাকা ধারালো ছুরি দিয়ে হামীমের পেটে একাধিকবার আঘাত করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন ধাওয়া করে অভিযুক্ত রোহানকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেন।
গণপিটুনির পর স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিওতে রোহান দাবি করেন, হামীমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল না। পূর্বের একটি ঘটনার জের ধরে উত্তেজনার মধ্যে তিনি ছুরিকাঘাত করেন। তবে পুলিশ বলছে, ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং অন্য কারও সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ছদাহা ইউনিয়নের হাসমত আলী সিকদার দোকানসংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই ইয়াবা ব্যবসার অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। গত এক থেকে দুই বছরে সেখানে মাদকের বিস্তার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করেই কয়েকটি কিশোর গ্যাং গড়ে উঠেছে। এসব গ্যাংয়ের সদস্যরা আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে গত ৩০ আগস্ট রাতে পুরানগড় ইউনিয়নের দক্ষিণ পুরানগড় এলাকায় জাহেদুল ইসলাম ওরফে পিচ্চি জাহেদ (৩৫) নামে এক ব্যক্তিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। একই ঘটনায় আহত হন তাঁর বন্ধু ওয়াহিদ। হত্যার চার দিন পর নিহতের মা বাদী হয়ে বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিন ওরফে মিষ্টি জসিমকে প্রধান আসামি করে ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও পাঁচ থেকে ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। পুলিশ জানিয়েছে, নিহতের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ছিল।
একের পর এক হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। তাঁদের অভিযোগ, অপরাধীদের একটি অংশ রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কিশোর গ্যাংগুলো দিন দিন আরও সংঘবদ্ধ হচ্ছে। সন্ধ্যার পর বিশেষ করে কেরানীহাট, ছদাহা, পুরানগড়, হাসমত আলী সিকদার দোকানসংলগ্ন এলাকা এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাবর বলেন, কেরানীহাট এলাকায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ আতঙ্ক নিয়ে চলাফেরা করেন। প্রশাসনের আরও কঠোর ও দৃশ্যমান ভূমিকা প্রয়োজন।
এদিকে চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ড ও অপরাধের ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন। তিনি অপরাধী, কিশোর গ্যাং ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে হবে না; জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষক, অভিভাবক এবং সামাজিক ও ধর্মীয় নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে। নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান চালানো হচ্ছে। গত কয়েক সপ্তাহে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় মাদকবিরোধী শোভাযাত্রা ও সচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং অন্যদের শনাক্তে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।