লা রোহার বিশ্বজয়: আর্জেন্টিনাকে বোতলবন্দি করে ফুটবল সাম্রাজ্যের নতুন রাজা স্পেন!

মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি থেকে ১৬ বছর পর ফুটবল বিশ্বের রাজদণ্ড আবারও ফিরে এলো ইউরোপের টিকিটাকায়। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার রেকর্ডবুক ও কোটি ভক্তের স্বপ্নকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফুটবলের নতুন রাজা এখন স্পেন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে শ্বাসরুদ্ধকর, গতি আর কৌশলের এক চরম প্রদর্শনী শেষে লিওনেল স্কালোনির ১০ জনের আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ে ১-০ গোলে হারিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরল ‘লা রোহা’। ২০১০ সালের পর এটি তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা। বাংলাদেশ সময় গত রাত ১টায় শুরু হওয়া এই ‘মহাযুদ্ধ’ কোটি দর্শককে টেলিভিশনের পর্দায় আটকে রেখেছিল। তবে মাঠের ১২০ মিনিটের লড়াই শেষে শেষ হাসি হেসেছে স্প্যানিশ যুবারাই। লুই দে লা ফুয়েন্তের এই দলটির নিখুঁত ট্যাকটিক্যাল ফুটবলের কাছে ভাঙল আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের স্বপ্ন।
মেটলাইফ স্টেডিয়ামে তারার মেলা ও ট্রাম্পের আকাঙ্ক্ষা:
নিউ ইয়র্কের আকাশ গত দুই দিনের আবহাওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে আজ ছিল পুরোপুরি রৌদ্রময়। বিকেল তিনটায় নিউ জার্সির এই ছাদহীন স্টেডিয়ামে যখন মেসি-ইয়ামালরা মুখোমুখি হন, তখন লাখো দর্শককে রোদে পুড়েই উপভোগ করতে হয়েছে ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই। বাংলাদেশ মুদ্রায় কয়েক লাখ টাকার সর্বনিম্ন টিকিটের এই ম্যাচের গ্যালারির প্রতিটি আসন ছিল পরিপূর্ণ। সকাল থেকেই স্টেডিয়ামমুখী লাখো মানুষের স্রোতে আর্জেন্টিনার সমর্থক কিছুটা বেশি চোখে পড়লেও স্প্যানিশ দর্শকরাও কম যাননি। টাইমস স্কয়ারের মতো স্টেডিয়ামের চারপাশ মাতিয়ে রেখেছিলেন তারা। ফুটবলের এই মহোৎসবে বিনোদনের রঙ ছড়াতে হলিউড মেগাস্টার টম ক্রুজ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়ে ফুটবলকে বৈশ্বিক বার্তার মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আর বিরতির জমকালো হাফটাইম শো-তে মঞ্চ কাঁপান পপ তারকা ম্যাডোনা, জাস্টিন বিবার, শাকিরা এবং জনপ্রিয় কে-পপ ব্যান্ড বিটিএস। ম্যাচ শুরুর আগে সমাপনী অনুষ্ঠানে পারফর্ম করেন জনপ্রিয় ইউটিউবার আইশোস্পিড। এবারের সফল আয়োজনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফক্স স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের মেয়াদকালেই আবারও যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ ফেরানোর জন্য ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে ‘দারুণ প্রস্তাব’ দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানান। যদিও ফিফার নীতিমালা অনুযায়ী ২০৩৮ সালের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সেই সুযোগ নেই। ম্যাচ নিয়ে নিজের ভবিষ্যদ্বাণীতে ট্রাম্প বলেছিলেন, “মেসির বিপক্ষে বাজি ধরা কঠিন,” কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে ট্রাম্পের সেই বাজি টিকল না।
প্রথমার্ধে স্পেনের দাপট, লিসান্দ্রোর চোট:
ম্যাচের শুরু থেকেই মাঠজুড়ে দাপট দেখিয়েছে স্পেন। প্রথমার্ধে ৬৫ শতাংশ বল পজেশন আর ৩১৩টি নিখুঁত পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনা দিতে পেরেছে মাত্র ১৫৫টি পাস। প্রথম ২৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার তিন ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসি, নিকো গঞ্জালেজ ও হুলিয়ান আলভারেজ মিলে মাত্র ১৭ বার বলে পা ছোঁয়াতে পেরেছিলেন। ম্যাচের ৫ মিনিটেই স্পেনকে এগিয়ে নিতে পারতেন লামিনে ইয়ামাল। ওলমোর বাড়িয়ে দেওয়া বল ইয়ামাল নিয়ন্ত্রণে নিলেও লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রচেষ্টায় গোল লাইনের সামনে থেকে বেঁচে যায় আর্জেন্টিনা। ৭ মিনিটে সিমন দ্রুত নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে মেসিকে নিশ্চিত গোলের সুযোগ থেকে রুখে দেন। ৩৯ মিনিটে ফাবিয়ানের পাস থেকে ওয়ারজাবালের জোরালো শট নিচে নেমে এসে রুখে দেন এমি মার্টিনেজ। ৪১ মিনিটে ওয়ারজাবালকে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখা লিসান্দ্রো মার্টিনেজ দুই মিনিট পরেই ইনজুরি নিয়ে মাঠ ছাড়লে বড় ধাক্কা খায় আর্জেন্টিনা, তার বদলে নামেন ওতামেন্দি।
দ্বিতীয়ার্ধে স্কালোনির ছক ও ওতামেন্দির প্রতিরোধ:
দ্বিতীয়ার্ধে স্কালোনি দলে পরিবর্তন এনে পারেদেসকে নামালেও শুরুতেই তিনি রদ্রিকে ধাক্কা দিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন। ৫৫ মিনিটে ওতামেন্দির শেষ মুহূর্তের দারুণ ট্যাকল নিশ্চিত গোলের হাত থেকে বাঁচায় আর্জেন্টিনাকে। ৬২ মিনিটে স্পেন পেদ্রি ও ফেরান তোরেসকে মাঠে নামালে আক্রমণের ধার আরও বাড়ে। ইয়ামালের বাঁ পায়ের চমৎকার ক্রস থেকে তোরেসের নিচু হেড লুফে নেন মার্টিনেজ। ১৯৬৬ সালে রেকর্ড নথিভুক্ত করার পর থেকে প্রথম দল হিসেবে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ ফাইনালে পুরো ৯০ মিনিটে লক্ষ্যে কোনো শট রাখতে না পারার অবাঞ্ছিত রেকর্ড গড়ে। এমি মার্টিনেজ একে একে স্পেনের ১০টি শট রুখে দিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। তবে ইনজুরি টাইমের ৩ মিনিটে কুবার্সিকে বেপরোয়া ট্যাকল করে চেলসি তারকা এনজো ফার্নান্দেজ দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়লে ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা। রেফারির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করায় হলুদ কার্ড দেখতে হয় কোচ লিওনেল স্কালোনিকেও।
অতিরিক্ত সময়ে তোরেসের সেই ‘সোনার হরিণ’ গোল:
১০ জনের আর্জেন্টিনাকে পেয়ে অতিরিক্ত সময়ে চেপে ধরে স্পেন। ৯৬ মিনিটে ওতামেন্দির চ্যালেঞ্জ প্রতিহত করে মেরিনোর শট মার্টিনেজ ব্লক করলে ফিরতি বলে নিকো উইলিয়ামস জালে জড়ালেও ভিএআরে ওতামেন্দির ওপর ফাউলের কারণে গোলটি বাতিল হয়। তবে ১০৬ মিনিটে আর শেষ রক্ষা হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্থের মাত্র ২৭ সেকেন্ডে পেদ্রো পোরোর ক্রসে নিকো উইলিয়ামসের সহায়তায় স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেস আলতো ছোঁয়ায় বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে দেন। ২০১৪ সালে জার্মানির গোৎসের পর তোরেসই প্রথম বদলি খেলোয়াড় হিসেবে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করলেন।










