ফটিকছড়ির আজিমপুর স্কুলের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হলেন মাওলানা আজিজুল করিম
শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ১২:১০ পূর্বাহ্ন

ফটিকছড়ির আজিমপুর স্কুলের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হলেন মাওলানা আজিজুল করিম

ফটিকছড়ির আজিমপুর স্কুলের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হলেন মাওলানা আজিজুল করিম
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির আজিমপুর আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মনোনীত হয়েছেন মাওলানা মোহাম্মদ আজিজুল করিম। তিনি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য অধ্যক্ষ আল্লামা ছালেহ আহমদ আল-মাদানীর ছেলে।

১২ আগস্ট (বুধবার) চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মো. আবুল কালামের সই করা এক প্রজ্ঞাপনে ছয় মাসের জন্য এ অ্যাডহক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনাসহ প্রয়োজনীয় দায়িত্ব পালন করবে এ অ্যাডহক কমিটি। কমিটিতে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মনোনীত শিক্ষক প্রতিনিধি হিসেবে শিশির রঞ্জন সাহা এবং অভিভাবক প্রতিনিধি হিসেবে মো. ইব্রাহিম দায়িত্ব পেয়েছেন। পদাধিকারবলে কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্বাস উদ্দিন দায়িত্ব পালন করবেন।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মাওলানা মোহাম্মদ আজিজুল করিম অধ্যক্ষ আল্লামা ছালেহ আহমদ আল-মাদানী (রহ.) ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তা ছাড়া তিনি কাদেরীয়া মুনিরীয়া আস-ছালেহ ইসলামী একাডেমির সভাপতি এবং সুন্দরপুর ইউনিয়নের কয়েকটি সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের দায়িত্বে রয়েছেন।

মাওলানা মোহাম্মদ আজিজুল করিম বলেন, "বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ আরও উন্নত করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুন্দর ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাই আমার প্রধান লক্ষ্য। এ দায়িত্ব পালনে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা চাই। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করতে চাই।"

নতুন অ্যাডহক কমিটি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব পালন করবে।




ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি

ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি
ছবি সংগৃহীত।

ফটিকছড়ি উত্তর উপজেলার সদর দপ্তর পরিবর্তনের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম চললেও চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।

বুধবার (১২ আগস্ট) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে এ প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, গত ৩১ জুলাই অনুষ্ঠিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২১তম সভায় ফটিকছড়ি উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টি ইউনিয়নের সমন্বয়ে ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ নামে নতুন উপজেলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নতুন উপজেলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বাগানবাজার, দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর, হারুয়ালছড়ি ও সুয়াবিল।

তাছাড়া প্রজ্ঞাপনে নবগঠিত ‘ফটিকছড়ি উত্তর’ উপজেলার সদর দপ্তর স্থাপন করা হবে ভূজপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম ভূজপুর মৌজায়। নতুন উপজেলার সীমানা ও সংশ্লিষ্ট মৌজার জে.এল. নম্বরও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।

উপজেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮-এর ৩(২) ধারার ক্ষমতাবলে সরকার এ ঘোষণা দিয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আদেশটি জনস্বার্থে জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের দাবি ও আলোচনার পর ফটিকছড়ি উপজেলার উত্তরাঞ্চলের ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে পৃথক উপজেলা গঠনের প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।




কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুলে ৪৬ লাখ টাকার হিসাব গরমিলের অভিযোগ: তদন্ত কমিটি গঠন

কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুলে ৪৬ লাখ টাকার হিসাব গরমিলের অভিযোগ: তদন্ত কমিটি গঠন
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় অর্ধকোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, হিসাবের গরমিল, সরকারি প্রকল্পের অর্থের যথাযথ হিসাব না দেওয়া এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গত ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই পত্রে অভিযোগের বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে স্থানীয় নাগরিক মো. নিজাম উদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের বিষয়গুলো সরেজমিনে যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

অভিযোগের অন্যতম গুরুতর বিষয় হলো, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় প্রায় ৪৬ লাখ টাকার ঘাটতি বা হিসাবের গরমিল পাওয়া গেছে। ‘মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান (অডিট ফার্ম) প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, সরকারি অর্থ ও বিল-ভাউচারসহ বিভিন্ন আর্থিক নথি পর্যালোচনা করে এ-সংক্রান্ত তথ্য তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। এ অর্থের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ উপস্থাপনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এছাড়া ‘ঋণ বিতরণ’ নামে একটি খাতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও ওই অর্থ কাদের দেওয়া হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে কিংবা এর পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র কোথায়—সে বিষয়ে যথাযথ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিক্রি করা সামগ্রীর অর্থও হিসাবের বাইরে রাখার অভিযোগ

প্রতিষ্ঠানের পুরোনো পরীক্ষার খাতা, বাতিল কাগজ ও অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের আয় হিসেবে যথাযথভাবে জমা ও হিসাবভুক্ত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিল-ভাউচারে প্রয়োজনীয় নম্বর, অনুমোদিত স্বাক্ষর এবং ব্যয়ের সমর্থনে যথাযথ কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি একজন জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) শিক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা কাগজ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের অভিযোগও উঠে এসেছে।

সরকারি প্রকল্পের ৫ লাখ টাকার হিসাব কোথায়?

তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে পিবিজিএসআই (PBGSI) প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা।

অভিযোগ ও অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অগ্রণী ব্যাংকের সীতাকুণ্ড শাখা থেকে সরকারি ওই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা একক স্বাক্ষরে উত্তোলন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, তার যথাযথ বিল-ভাউচার কিংবা বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ ও হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত কমিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শুধু আর্থিক বিষয় নয়, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

প্রায় ২০ বছর ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক পদ শূন্য রেখে কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, অভিযোগ তদন্তে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কর্ণনা রহমানকে আহ্বায়ক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী, সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. দিনাজুল আলম, কাপ্তেন শামসুল হুদা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোবারক আলী এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমত আরা বেগমকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।

অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটিকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এদিকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং অডিট করা হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরাসরি লেনদেন করেন না বলেও দাবি করেন।

এর আগে তিনি বলেন, “আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই অডিট করা হয়েছে। আমি প্রতিষ্ঠানের কোনো অর্থ সরাসরি লেনদেন করি না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।”

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে এখন অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা ৪৬ লাখ টাকার হিসাবের গরমিল, ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকার কথিত ঋণ বিতরণ, বিক্রি করা পুরোনো সামগ্রীর অর্থ, নিয়মবহির্ভূত বিল-ভাউচার এবং পিবিজিএসআই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকাসহ অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এদিকে কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠায় অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তাদের দাবি, অডিট প্রতিবেদনের তথ্য এবং লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে গঠিত তদন্ত কমিটি যেন কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সরেজমিন তদন্ত করে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

অভিযোগের সত্যতা তদন্তাধীন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই জানা যাবে, অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর কতটা বাস্তব এবং এর জন্য কারা দায়ী।




হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এক মাসের ছুটি নিয়ে স্টোরকিপারের দুই মাসেও মেলেনি দেখা, যুক্ত ধর্মীয় সংগঠনে; মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ঝুঁকি

হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স: এক মাসের ছুটি নিয়ে স্টোরকিপারের দুই মাসেও মেলেনি দেখা, যুক্ত ধর্মীয় সংগঠনে; মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধে ঝুঁকি
ছবি সংগৃহীত।

হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টোরকিপার দুর্জয় দেওয়ানজী চিকিৎসার জন্য এক মাসের ছুটি নিয়ে বিদেশে গেলেও দুই মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নিজ কর্মস্থলে ফেরেননি। এমনকি গত ৯ আগস্ট গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হাটহাজারীতে আগমন করলেও তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসার নামে বিদেশের মাটিতে পাড়ি জমানোর তথ্যও পাওয়া গেছে তার বিরুদ্ধে। মূলত চিকিৎসা নয়, একটি ধর্মীয় সংগঠনের কার্যক্রমে অংশ নিতে প্রায়ই দেশের বাইরে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসার অজুহাতে ছুটি দেখিয়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে হাটহাজারীতে কর্মরত অবস্থায় ঊর্ধ্বতনদের বিশেষ আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস করেন না কেউ।

জানা গেছে, জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এক মাসের ছুটিতে বহির্বাংলাদেশে গমন করেন দুর্জয়। তবে ছুটির মেয়াদ শেষ হলেও তিনি এখনো কর্মস্থলে ফেরেননি। নিয়ম অনুযায়ী ছুটির পূর্বে কাউকে যথাযথ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার কথা থাকলেও তা-ও ঠিকভাবে অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, দুর্জয় চলতি বছরের শুরু থেকেই কর্মস্থলে অনিয়মিত। জানুয়ারি থেকে প্রায় চার মাস অনুপস্থিত ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে জুনে পুনরায় বহির্বাংলাদেশে গমন করেন। চিকিৎসার জন্য ছুটির কারণ উল্লেখ করলেও তিনি নিজে নাকি পরিবারের কোনো সদস্য অসুস্থ—তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। স্টোরকিপারের দায়িত্বে থাকা অফিস সহকারী শৈবাল সেন তার অসুস্থতার কথা জানালেও, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তাপস কান্তি মজুমদার জানান যে তার বাবা অসুস্থ। মূল সত্য জানতে ছুটির আবেদনের কাগজপত্র ও পাসপোর্টের কপি দেখতে চাইলে প্রতিবেদককে এসব না চাওয়ার অনুরোধ করেন ওই কর্মকর্তা। ফলে ধোঁয়াশা রয়েই গেল।

এদিকে জানা গেছে, একজন সরকারি কর্মচারী কর্মরত থাকা অবস্থায় 'বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯' এবং সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী কোনো রাজনৈতিক বা নির্দিষ্ট সংগঠনে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিধিমালার ২৫(১) উপবিধি অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারী কোনো রাজনৈতিক দলের বা তার অঙ্গসংগঠনের সদস্য হতে পারবেন না। কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী, দেশে বা বিদেশে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বা অর্থায়ন করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া সরকারি চাকরিজীবীরা এমন কোনো সামাজিক বা ধর্মীয় সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হতে পারবেন না, যা সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ায় অথবা জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার পরিপন্থী হিসেবে বিবেচিত হয়।

সরকারি চাকরির প্রধান শর্ত হলো প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও জনশৃঙ্খলা বজায় রাখা। তাই কর্মক্ষেত্রে বা ব্যক্তিগত জীবনে এমন কোনো সংগঠনের পরিচয় বহন করা যাবে না যা এই নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নীতিমালা লঙ্ঘন করলে 'সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮' অনুযায়ী বিভাগীয় মামলা, চাকরিচ্যুতি বা অন্যান্য শাস্তি হতে পারে।

এমন আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দুর্জয় দেওয়ানজীর বিরুদ্ধে একটি ধর্মীয় সংগঠনের সাথে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালেও বিদেশে গমনপূর্বক ওই সংগঠনের কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি। সংগঠনের কার্যক্রমের একাধিক ছবি ও সনদ এর প্রমাণ বহন করে। তার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থলে ব্যক্তিগত গাড়ি বা অন্যান্য বাহন ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার গাড়িতেই তিনি যাতায়াত করেন।

এদিকে তার অনুপস্থিতিতে স্টোরের ওষুধ বিতরণ ও ওষুধের মেয়াদ পরীক্ষা করা নিয়ে চিকিৎসকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, স্টোরকিপারের ওষুধের মেয়াদ পরীক্ষা করার জন্য একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দিতে ঊর্ধ্বতনদের অবগত করা হলেও তারা তা কর্ণপাত করেননি। ফলে প্রশাসনিক অনিয়ম প্রকাশ্যে আসছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মেয়াদোত্তীর্ণের কারণে ওষুধসংকটের আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, একজন স্টোরকিপারের ছুটি ও ওষুধের যাবতীয় বিষয়ে আবাসিক মেডিকেল অফিসারের অবগত থাকার কথা থাকলেও তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার ড. সোহানিয়া আক্তার বিল্লাহ বলেন, দুর্জয় কখন ছুটিতে গেছেন এবং কেন গেছেন সে সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. তাপস কান্তি মজুমদার মুঠোফোনে স্টোরকিপারের এক মাসের ছুটি এবং পরবর্তীতে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মাধ্যমে সাত দিন করে মোট ১৪ দিন ছুটির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি স্বীকার করলেও, এর দুদিন পর নিজ কার্যালয়ে ছুটির মেয়াদ এখনো আছে বলে প্রতিবেদককে জানান। তবে তাকে দ্রুত কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার জন্য চিঠি ইস্যু করা হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। মুঠোফোনে প্রদত্ত বক্তব্যের সাথে কার্যালয়ের বক্তব্যের অমিলের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এবং স্টোর তদারকিতে মেডিকেল অফিসার নিয়োগ না দেওয়ার প্রশ্নে নিশ্চুপ ছিলেন ওই কর্মকর্তা।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী ছুটির সত্যতা স্বীকার করলেও মূলত ছুটির মেয়াদ কতদিন তা জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে বিভাগীয় পরিচালক ডা. ফজলে রাব্বি জানান, তিনি এ বিষয়ে খোঁজ নেবেন।