ফটিকছড়িতে বন উজাড়: সর্তা বনের ‘নতুন রাজা’ মহসিন!

চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন সংরক্ষিত সর্তা বনবিটে কয়েক বছর ধরে চলেছে ব্যাপক বন উজাড়। সামাজিক বনায়নের সেগুন ও গামারি গাছ থেকে শুরু করে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা কয়েক দশকের পুরোনো গাছও কেটে ফেলা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বন বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মো. মহসিন নামের এক ইটভাটা মালিকের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্র এসব গাছ কেটে কোটি টাকার কাঠ পাচার করেছে। গত কয়েক বছরে সর্তা বনবিটের অন্তত ২০ একরের বেশি এলাকায় সেগুন বাগান উজাড় করা হয়েছে। কাটা গাছগুলোর মধ্যে সামাজিক বনায়নের পাশাপাশি ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী বিভিন্ন প্রজাতির পুরোনো গাছও রয়েছে।
সম্প্রতি পূর্ব খিরাম ও আশপাশের এলাকায় নতুন করে গাছ কাটার ঘটনা সামনে এসেছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বনভূমির বিভিন্ন স্থানে গাছ কাটার পর পড়ে থাকা গুঁড়ি, ডালপালা ও খালি জায়গার চিহ্ন এখনো স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে ট্রাক ও ট্রাক্টরে করে কাঠ পরিবহন করা হলেও কার্যকর কোনো বাধার মুখে পড়তে হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “বছরের পর বছর ধরে গাছ কাটা হয়েছে। দিনের বেলায়ও ট্রাকে করে কাঠ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। বন বিভাগের লোকজন সব জানতেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখিনি।”
সর্তা বনবিট কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মো. মহসিন বনাঞ্চলের গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত একটি চক্রের অন্যতম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছেন। এ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে বন আইনে দায়ের করা দুটি মামলা বর্তমানে বন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে ওসমান আলীর নামও বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট অভিযোগ ও মামলার পক্ষে কোনো নথিপত্র বা প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায়নি।
আইনে বলা আছে, সংরক্ষিত বনে অনুমতি ছাড়া গাছ কাটা, বনভূমি দখল, আগুন লাগানো, কাঠ প্রস্তুত, শিকার কিংবা বনজ সম্পদের ক্ষতিসাধন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, দুই হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিধান রয়েছে। বন (সংশোধন) আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ অ-জামিনযোগ্য।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, পূর্ব খিরাম এলাকার সুলতাননগর, তালুকদারের ঘোনা, প্যাঁচপেইচ্ছা ও বালুখালী এলাকায় সবচেয়ে বেশি গাছ কাটা হয়েছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে রোপণ করা সামাজিক বনায়নের গাছও রক্ষা পায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কাটা গাছের একটি বড় অংশ স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. শাহজাহানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। পাশাপাশি নানুপুর গামরীতলা এলাকার ‘পিবিএম’ ইটভাটাসহ বিভিন্ন ইটভাটায় এসব কাঠ ও ডালপালা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইটভাটা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সর্তা বনবিট কার্যালয় থেকে মাত্র ২০০–৩০০ গজ দূরে দীর্ঘদিন ধরে গাছ কাটার মতো ঘটনা কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়েছে, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া, সামাজিক বনায়নের একটি বাগান কাটার অনুমতি বা সহযোগিতার বিনিময়ে বিট কর্মকর্তাকে পাঁচ লাখ টাকা দেওয়ার অভিযোগও এলাকায় প্রচলিত রয়েছে। তবে অভিযোগটির পক্ষে কোনো লিখিত নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সর্তা বনবিটের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। বিষয়গুলো তদন্তাধীন এবং আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।”
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো. মহসিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। গত বৃহস্পতিবার থেকে রোববার পর্যন্ত একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপেও পাঠানো বার্তার কোনো উত্তর মেলেনি।
সর্তা বনবিট কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম বলেন, “সংরক্ষিত বনাঞ্চলে গাছ কাটার যেসব অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলো তদন্ত করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চলমান রয়েছে।”
হাটহাজারী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও দায়ীদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে। তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ফটিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাঈদ মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, “সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংসের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বন বিভাগ-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, সর্তা বনবিট থেকে কাটা গাছের বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা হতে পারে। তবে বনভূমির প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি এবং কাটা গাছের সঠিক পরিমাণ নির্ধারণে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।








