নাইক্ষ্যংছড়িতে পেঁপেচাষিদের স্বপ্ন শেষ করে দিল বন্যা

মাত্র আর কয়েকদিন অপেক্ষা। এরপরই বাজারে উঠত পাকা পেঁপে। বিক্রির টাকা দিয়ে শোধ হতো ব্যাংকের ঋণ, পরিশোধ হতো ধারদেনা। সংসারে ফিরত স্বস্তি। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম আঘাতে সেই স্বপ্ন এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। টানা এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও ভয়াবহ বন্যায় চোখের সামনে ফলভর্তি প্রায় দুই শতাধিক পেঁপে গাছ পচে-গলে মাটিতে মিশে যেতে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের কৃষক মো. ছৈয়দ আলম। তাঁর মতো একই দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছেন উপজেলার শত শত কৃষক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা পেঁপেবাগান। মাঠজুড়ে এখন শুধু পচা গাছ, ঝরে পড়া ফল আর কৃষকের হাহাকার।
শনিবার (২৫ জুলাই) উপজেলার ঘুমধুম, বাইশারী, সদর ও দোছড়ি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এখনো পানি ও কাদায় ডুবে রয়েছে। কোথাও পেঁপে গাছ উপড়ে পড়ে আছে, কোথাও গাছের কাণ্ডে পচন ধরেছে, আবার কোথাও ফলসহ পুরো গাছ লালচে হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কলা, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স, শসাসহ বিভিন্ন মৌসুমি সবজির ক্ষেতও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ঋণ নিয়ে গড়া বাগান, এক টাকাও আয় হলো না
উত্তর কল্লিয়ামুরা গ্রামের কৃষক মো. ছৈয়দ আলম কয়েক মাস আগে কৃষি বিভাগের পরামর্শে কক্সবাজার থেকে উন্নত জাতের পেঁপের চারা এনে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন। ব্যাংক ঋণ ও ধারদেনার টাকায় জমি প্রস্তুত, চারা, সার, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরিসহ প্রায় দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেন তিনি। গাছে আশানুরূপ ফলনও এসেছিল। বড় বড় পেঁপে বাজারজাত করার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু টানা বর্ষণে সৃষ্ট বন্যার পানিতে তাঁর প্রায় দুই শতাধিক পেঁপে গাছ ফলসহ নষ্ট হয়ে যায়। কোথাও গাছ ভেঙে পড়ে, কোথাও পচে যায়, আবার কোথাও গাছের পাতা ও ডাল ঝরে পড়ে। ফলে একটি পেঁপেও বাজারে তুলতে পারেননি তিনি।
কৃষক ছৈয়দ আলম বলেন, “অনেক আশা নিয়ে ঋণ আর ধারদেনা করে পেঁপে চাষ করেছিলাম। ভাবছিলাম বিক্রির টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করব, সংসার ভালোভাবে চলবে। কিন্তু বন্যার পানিতে সব শেষ হয়ে গেছে। এক টাকারও পেঁপে বিক্রি করতে পারিনি। এখন কীভাবে ঋণ পরিশোধ করব, কীভাবে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেব জানি না। সরকার যদি আমাদের মতো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে না দাঁড়ায়, তাহলে বাঁচার আর কোনো পথ থাকবে না।”
প্রায় সাড়ে আট লাখ টাকার বিনিয়োগ, ফিরেছে মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার
ঘুমধুম ইউনিয়নের রেজু ফাত্রাঝিরি গ্রামের কৃষক মো. আবদুর রহিম চার কানি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে পেঁপে চাষে প্রায় ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। জমি প্রস্তুত, উন্নত জাতের চারা, সার, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিকের মজুরি ও পরিচর্যায় এই অর্থ ব্যয় করেন তিনি। কিন্তু ভয়াবহ বন্যায় তাঁর বাগান প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করতে পেরেছেন। বাকি পুরো বাগান নষ্ট হয়ে গেছে।
আবদুর রহিম বলেন, “ঋণ করে পেঁপেবাগান করেছিলাম। এবার ভালো লাভের আশা ছিল। কিন্তু বন্যা সব শেষ করে দিয়েছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব, সেটাই সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা। সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানাচ্ছি।”
লাখ লাখ টাকার ক্ষতি, নতুন করে চাষের পুঁজিও নেই
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের টানা বর্ষণ ও বন্যায় দীর্ঘ সময় ধরে কৃষিজমিতে পানি জমে থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেঁপেবাগান। পাশাপাশি কলা, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স, শসাসহ অন্যান্য সবজির ক্ষেতও নষ্ট হয়েছে। এতে লাখ লাখ টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
অনেক কৃষক জানান, ঋণ ও ধারদেনা করে চাষাবাদ করেছিলেন। এখন সেই পুঁজিও হারিয়ে নতুন করে মাঠে নামার মতো সামর্থ্য নেই। তাঁরা জরুরি ভিত্তিতে আর্থিক সহায়তা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ এবং পুনর্বাসন কর্মসূচি চালুর দাবি জানান। অন্যথায় অনেকেই কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ইনামুল হক বলেন, “প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় উপজেলার ৫০০ জন কৃষকের মধ্যে সাত ধরনের সবজির বীজ বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ভারী বর্ষণ ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”
নাইক্ষ্যংছড়ির কৃষকদের আশা, সরকার দ্রুত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করলে তাঁরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন। অন্যথায় এবারের বন্যা শুধু ফসলই নয়, বহু কৃষক পরিবারের জীবিকার ভিত্তিও ভেঙে দেবে। সীমান্ত জনপদের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।











