জমাবন্দির দুই নথিতে জমির মালিকানা ও সীমানায় অমিল, নদীর চরে বীজ বপন করছেন ১১ নারী।
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় একটি বৌদ্ধবিহারের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে ৩৫৩ নম্বর কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই মারমার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, তাঁদের পৈতৃক ও ভোগদখলীয় জমির সীমানার সঙ্গে হেডম্যানের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত জমাবন্দির তথ্যের মিল নেই। এর পরও বিহারের নাম সামনে এনে সাঙ্গু নদীর চরে জমিটি দখলে নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্থানীয় ১১ নারীকে দিয়ে বীজ বপনের কাজও শুরু করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
অন্যদিকে হেডম্যান শৈচিং থুই মারমার দাবি, বিরোধপূর্ণ নদীর চরটি সরকারি খাসজমি। পাড়াবাসীর সম্মতিতে বিহারের নামে জায়গাটি দখলে নেওয়া হয়েছে। তবে জমিটির প্রকৃত মালিকানা ও সীমানা নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, জমিটি তাঁদের প্রয়াত মংসিংগ্য মারমার মালিকানাধীন ছিল। তাঁর ছেলে ওয়ারিশদার পিপলু মারমা বলেন, বাবার মৃত্যুর পরপরই জমিটি নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। তাঁর অভিযোগ, জীবদ্দশায় তাঁর বাবা বিভিন্ন স্থানে জমি দান করলেও বিরোধপূর্ণ এই জমি বিহারের নামে দান করেননি। বাবার মৃত্যুর প্রায় দুই মাসের মধ্যে হেডম্যান জমিটি দখলের উদ্যোগ নেন।
প্রতিবেদকের হাতে আসা দুটি জমাবন্দি-সংক্রান্ত নথিতে জমির পরিমাণ, মালিকের নাম ও চৌহদ্দির বিবরণে ভিন্নতা দেখা যায়।
একটি নথিতে ৩৫৩ নম্বর কোলাদি মৌজার ২৭ নম্বর হোল্ডিংয়ে তৃতীয় শ্রেণির পাঁচ একর পাহাড়ি জমির উল্লেখ রয়েছে। সেখানে মালিক হিসেবে মংসিংগ্য মারমার নাম রয়েছে। নথির চৌহদ্দিতে উত্তরে শীল পাহাড়, দক্ষিণে দাব্রো ক্ষ্যং ঝিরি, পূর্বে পাহাড় এবং পশ্চিমে শঙ্খ নদীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্য নথিতে একই মৌজার তৃতীয় শ্রেণির এক একর পাহাড়ি জমির মালিক হিসেবে আগাওয়াইং ছা ভিক্ষুর নাম উল্লেখ রয়েছে। এ নথির চৌহদ্দিতে উত্তরে পলিকা ঝিরি, দক্ষিণে পাহাড়, পূর্বে প্রুথোয়াই অং এবং পশ্চিমে পাহাড়ের কথা বলা হয়েছে।
দুটি নথির জমির পরিমাণ, মালিকের নাম ও চৌহদ্দির বিবরণে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সাঙ্গু নদীর চরে থাকা বিরোধপূর্ণ জমিটির সঙ্গে বিহারের নামে দেখানো নথির সীমানার মিল নেই। তাঁদের অভিযোগ, এসব অসংগতি উপেক্ষা করে বিহারের নাম ব্যবহার করে জমিটি দখলের চেষ্টা চলছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, সাঙ্গু নদীর চরে বিরোধপূর্ণ জমিতে কয়েকজন নারী বীজ বপন করছেন। স্থানীয় ১১ নারী দলবদ্ধভাবে সেখানে কৃষিকাজে অংশ নেন। তবে তাঁদের অনেকেই জমিটির প্রকৃত মালিকানা সম্পর্কে জানেন না বলে জানান।
কৃষিকাজে অংশ নেওয়া সিংনুপ্রু বলেন, “জায়গাটি কার, তা আমরা জানি না। রাতে বিহার থেকে মাইকে বলা হয়, ভোরে জমিতে বীজ বপন করতে হবে। তাই ভিক্ষুর কথায় বীজ বপন করতে এসেছি। মূল ঘটনা কী, তা আমরা কিছুই জানি না।”
পলিকা বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রিয় ভিক্ষু বলেন, “জমিতে চাষাবাদ বা বীজ লাগানোর কোনো নির্দেশনা আমি দিইনি। এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। তবে দখল না করে পাড়াবাসী জমির মালিকের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানে যেতে পারত। এত বড় ঘটনা না ঘтаলেও হেডম্যান পারতেন।”
বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জমাবন্দির নথিতে পলিকা পাড়া বৌদ্ধবিহারের নামের পরিবর্তে আগাওয়াইং ছা ভিক্ষুর নাম উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে। এ বিষয়ে বিহার পরিচালনা কমিটি, হেডম্যান ও পাড়াবাসীর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পলিকা পাড়া বৌদ্ধবিহারের সভাপতি উবামং মারমা বলেন, “আমি আগে বিহার পরিচালনা কমিটিতে ছিলাম না। জায়গাটি দখলের জন্য হেডম্যান আমাকে দুই দিনের জন্য সভাপতি বানান। আমাকে বাদী করে হেডম্যান নিজেই অভিযোগ দাখিল করেন। স্বাক্ষর দিতে বলায় দিয়েছি। আমি অশিক্ষিত, কাগজে কী লেখা আছে, তা পড়তে জানি না।”
পলিকা পাড়া গ্রামের প্রধান দুংখি অং মারমা বলেন, “হেডম্যান নিজেই লিখে আমাকে একটি কাগজ দিয়েছেন। সভাপতি না থাকায় তাঁর পক্ষে স্বাক্ষর করেছি। জায়গাটি খাস নাকি ব্যক্তিমালিকানাধীন, তা হেডম্যান বলতে পারবেন।”
ভুক্তভোগী পিপলু মারমা অভিযোগ করে বলেন, “আমার বাবা জীবিত থাকাকালে বিভিন্ন জায়গায় জমি দান করেছেন। কিন্তু এই জমির চৌহদ্দি আলাদা। দখলের পক্ষে যে কাগজ দেখানো হচ্ছে, সেটির চৌহদ্দিও আলাদা। বাবা জীবিত থাকতে কেউ এ জমির মালিকানা দাবি করেননি। তাঁর মৃত্যুর দুই মাসের মধ্যেই হেডম্যান নিজে দখলের উদ্যোগ নিয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “কখনো বলা হচ্ছে এটি অন্যের জমি, কখনো খাসজমি, আবার কখনো বিহারের জমি। এভাবে ভিন্ন ভিন্ন দাবি তুলে আমার জমি দখল করা হয়েছে। এমনকি বর্গাচাষিকেও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। পাড়াবাসী ও বিহারের নাম ব্যবহার করে জমিটি দখলে নেওয়া হয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।”
অভিযোগ অস্বীকার করে ৩৫৩ নম্বর কোলাদি মৌজার হেডম্যান শৈচিং থুই মারমা বলেন, “তাঁদের জমির চৌহদ্দি আলাদা, ভিক্ষুর জমির চৌহদ্দিও আলাদা। কিন্তু সাঙ্গু নদীর যে চর জেগেছে, সেটি খাসজমি। এ কারণে পাড়াবাসীর সম্মতিতে বিহারের নামে জায়গাটি দখলে নেওয়া হয়েছে। পরে সেখানে বিহারের জন্য জায়গা রেখে ভাড়া দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, কারও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করা হয়নি। জমিটির সীমানা নদী পর্যন্ত হওয়ায় নদীর জেগে ওঠা চরকে খাসজমি হিসেবে বিবেচনা করে পাড়াবাসীর সম্মতিতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য মংমিন মারমা বলেন, “জায়গাটি কারও চৌহদ্দির ভেতরে পড়ে না বলে তিনি চিহ্নিত করেছেন।”
জমি দখলের অভিযোগের বিষয়ে রুমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমজাদ হোসেন বলেন, “পাঁচ একর জমি দখল নিয়ে পান্তলা পাড়ার একজন শিক্ষক কোলাদি মৌজার হেডম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে অনুযায়ী এগোচ্ছি।”
জমিটির প্রকৃত মালিকানা, নদীর চরটির আইনগত অবস্থান, জমাবন্দির দুই নথির সীমানাগত পার্থক্য এবং বিহারের নামে জমি ব্যবহারের বৈধতা—সবকিছুই এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট ভূমি প্রশাসন সরেজমিনে জমি পরিমাপ, নথি যাচাই ও উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করবে। এতে প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের পাশাপাশি বিরোধেরও আইনানুগ নিষ্পত্তি হবে।