কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুলে ৪৬ লাখ টাকার হিসাব গরমিলের অভিযোগ: তদন্ত কমিটি গঠন

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ঐতিহ্যবাহী কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় অর্ধকোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম, হিসাবের গরমিল, সরকারি প্রকল্পের অর্থের যথাযথ হিসাব না দেওয়া এবং প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তদন্তে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে উপজেলা প্রশাসন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গত ১১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই পত্রে অভিযোগের বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ এনে স্থানীয় নাগরিক মো. নিজাম উদ্দিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে লিখিত আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অভিযোগের বিষয়গুলো সরেজমিনে যাচাই করে প্রতিবেদন দেওয়ার লক্ষ্যে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
অভিযোগের অন্যতম গুরুতর বিষয় হলো, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়ের হিসাব পর্যালোচনায় প্রায় ৪৬ লাখ টাকার ঘাটতি বা হিসাবের গরমিল পাওয়া গেছে। ‘মাহামুদ সবুজ অ্যান্ড কোম্পানি’ নামের একটি বেসরকারি নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান (অডিট ফার্ম) প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয়, ব্যাংক লেনদেন, সরকারি অর্থ ও বিল-ভাউচারসহ বিভিন্ন আর্থিক নথি পর্যালোচনা করে এ-সংক্রান্ত তথ্য তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরে।
নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ফি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি রয়েছে। এ অর্থের বিষয়ে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ও প্রয়োজনীয় হিসাব-নিকাশ উপস্থাপনের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এছাড়া ‘ঋণ বিতরণ’ নামে একটি খাতে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকা ব্যয় দেখানো হলেও ওই অর্থ কাদের দেওয়া হয়েছে, কী উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে কিংবা এর পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র কোথায়—সে বিষয়ে যথাযথ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অডিট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিক্রি করা সামগ্রীর অর্থও হিসাবের বাইরে রাখার অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের পুরোনো পরীক্ষার খাতা, বাতিল কাগজ ও অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ প্রতিষ্ঠানের আয় হিসেবে যথাযথভাবে জমা ও হিসাবভুক্ত করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অডিট প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিল-ভাউচারে প্রয়োজনীয় নম্বর, অনুমোদিত স্বাক্ষর এবং ব্যয়ের সমর্থনে যথাযথ কাগজপত্রের ঘাটতি রয়েছে। এমনকি একজন জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) শিক্ষকের স্বাক্ষরযুক্ত সাদা কাগজ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের অভিযোগও উঠে এসেছে।
সরকারি প্রকল্পের ৫ লাখ টাকার হিসাব কোথায়?
তদন্তের জন্য গঠিত কমিটির সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে পিবিজিএসআই (PBGSI) প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা।
অভিযোগ ও অডিট প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে অগ্রণী ব্যাংকের সীতাকুণ্ড শাখা থেকে সরকারি ওই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকা একক স্বাক্ষরে উত্তোলন করা হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও ওই অর্থ কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে, তার যথাযথ বিল-ভাউচার কিংবা বিস্তারিত হিসাব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ ও হিসাব দেওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিষয়টি তদন্ত কমিটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু আর্থিক বিষয় নয়, প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও অডিট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
প্রায় ২০ বছর ধরে সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকার বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশাসনিক পদ শূন্য রেখে কীভাবে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস আদেশ অনুযায়ী, অভিযোগ তদন্তে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটিতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কর্ণনা রহমানকে আহ্বায়ক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গোলাম রহমান চৌধুরী, সীতাকুণ্ড বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. দিনাজুল আলম, কাপ্তেন শামসুল হুদা উচ্চবিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক মোবারক আলী এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসমত আরা বেগমকে সদস্যসচিব করা হয়েছে।
অফিস আদেশে বলা হয়েছে, কমিটি প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে সদস্য কো-অপ্ট করতে পারবে। একই সঙ্গে অভিযোগে উল্লিখিত বিষয়গুলো সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটিকে অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, তাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এসব অভিযোগ তোলা হয়েছে এবং অডিট করা হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানের অর্থ সরাসরি লেনদেন করেন না বলেও দাবি করেন।
এর আগে তিনি বলেন, “আমাকে ফাঁসানোর উদ্দেশ্যে এই অডিট করা হয়েছে। আমি প্রতিষ্ঠানের কোনো অর্থ সরাসরি লেনদেন করি না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।”
সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি মো. ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন, অভিযোগের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ফলে এখন অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা ৪৬ লাখ টাকার হিসাবের গরমিল, ১ লাখ ৮৯ হাজার ৫৬৩ টাকার কথিত ঋণ বিতরণ, বিক্রি করা পুরোনো সামগ্রীর অর্থ, নিয়মবহির্ভূত বিল-ভাউচার এবং পিবিজিএসআই প্রকল্পের ৫ লাখ টাকাসহ অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে কুমিরা আবাসিক বালিকা স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে এমন অভিযোগ ওঠায় অভিভাবক ও স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তাদের দাবি, অডিট প্রতিবেদনের তথ্য এবং লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে গঠিত তদন্ত কমিটি যেন কোনো ধরনের প্রভাব বা চাপের বাইরে থেকে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে সরেজমিন তদন্ত করে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থসহ প্রতিষ্ঠানের সব আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাই করে অনিয়মের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
অভিযোগের সত্যতা তদন্তাধীন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পরই জানা যাবে, অডিট প্রতিবেদনে উঠে আসা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর কতটা বাস্তব এবং এর জন্য কারা দায়ী।











