লোহাগাড়ায় প্রশ্নবিদ্ধ ইজারা, নদীতে বালু নেই, ফাইলে বালুমহাল
লোহাগাড়া উপজেলা-এর পুটিবিলা, আধুনগর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ডলু নদীর আধুনগরের একটি অংশে বালু ও পানির কোনো দৃশ্যমান অস্তিত্ব না থাকলেও ১৪৩৩ বাংলা ১লা বৈশাখ থেকে ‘ডলু বালুমহাল-৩’ নামে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ায় জনমনে তীব্র প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ওপর ডলু নদীর সেতু, তৎসংলগ্ন মসজিদ ও মাদ্রাসা থাকা সত্ত্বেও ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের লোহাগাড়ার আধুনগর এলাকায় ডলু নদীর ওপর একটি দীর্ঘ সেতু রয়েছে। তবে নদীর ওই অংশ প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সামান্য পানি জমে থাকলেও নদীর তলদেশে বালুর কোনো অস্তিত্ব নেই। বরং নদীটি এখন অনেকটাই খালের রূপ নিয়েছে। দুই তীরে ঘন সবুজ গাছপালা ও বসতবাড়ি থাকলেও স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নেই এবং বালু উত্তোলনের মতো কোনো উপাদানও নেই। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের পানি বিপদসীমা অতিক্রম করে খালপাড় ভেঙে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। এতে নিচু এলাকার মানুষ দীর্ঘসময় পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
এদিকে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী সেতু, কালভার্ট, ড্যাম, ব্যারেজ কিংবা সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা সংলগ্ন এলাকা এবং আবাসিক এলাকার নির্দিষ্ট দূরত্বের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আইন উপেক্ষা করেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের ডলু ব্রিজের পূর্ব পাশ থেকে উজানে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সোলতান আহমদ চৌধুরী বাদশা বলেন, সেতু, মসজিদ ও মাদ্রাসা সংলগ্ন খালে ইজারা দেওয়া মানে আইন লঙ্ঘন। অতীতে এমন ইজারা হয়নি। এটি মূলত খালসদৃশ একটি জলধারা, যা পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্ষাকালে শুধু পাহাড়ি ঢলের পানি আসে, জোয়ারের কোনো প্রভাব নেই।
অথচ বাসিন্দারা জানান, ৩০ বছরের অধিক সময় ধরে ডলু নদীতে বালু মাহাল ইজারা বন্ধ। এছাড়া বছরের অধিকাংশ সময়ই এ অংশে পানি থাকে না, বালুও জমে না। এমন পরিস্থিতিতে এখানে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তকে তারা অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলে মনে করছেন।
তাদের দাবি, অতীতে একই এলাকায় মসজিদ ও মাদ্রাসা থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ইজারা দেওয়া হয়নি। কিন্তু এবার হঠাৎ করেই ইজারার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা কোনো বিশেষ মহলের প্ররোচনায় হচ্ছে বলে সন্দেহ করছেন অনেকে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইজারার জন্য চিহ্নিত স্থান নিয়েও রয়েছে অস্পষ্টতা। সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের তহসিলদার ও উপজেলা ভূমি অফিসে পর্যন্ত সঠিকভাবে জায়গাটি শনাক্ত করতে পারেননি। এমনকি তারা সরেজমিনে না গিয়ে একটি প্রতিবেদন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও রিসিভ না করায় কার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে লোহাগাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাইফুল ইসলাম প্রথমে জানান, ওই স্থানে ইজারা দেওয়া হয়নি। তবে পরক্ষণেই তিনি বলেন, যেহেতু ইজারার সার্কুলেশন প্রকাশ হয়েছে, এখন ইজারার বাইরে তো কেউ কিছু করতে পারবে না।
প্রশাসনের এমন পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। একদিকে বাস্তবতা বিবেচনায় ইজারা না দেওয়ার ইঙ্গিত, অন্যদিকে প্রক্রিয়া চলমান রাখার অবস্থান। এতে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছে। বাস্তবতা যাচাই ছাড়া এ ধরনের ইজারা প্রদান শুধু প্রশাসনিক অনিয়মই নয়, বরং পরিবেশ ও জনস্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হতে পারে। তারা দ্রুত সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।






