মানবসৃষ্ট দুর্যোগে ডুবছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম: সাঙ্গু-ডলু ও শাখা খালগুলো এখন মরণফাঁদ

শুধু অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল নয়, বরং নদী-খাল দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাটের মতো মানবসৃষ্ট নানা কারণে স্থায়ী বন্যার মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রাম। সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ ও বাঁশখালীর বিস্তীর্ণ জনপদে এক সপ্তাহ ধরে বুকসমান পানি জমে থাকায় কয়েক লাখ মানুষ এখন পানিবন্দী। বিপর্যয় ঠেকাতে সাঙ্গু ও ডলু নদীসহ অভ্যন্তরীণ শাখা খালগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে অবিলম্বে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
অস্তিত্বহীন হাঙ্গর খাল: উধাও পানি নিষ্কাশনের পথ
বান্দরবানের পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হাঙ্গর খাল একসময় লোহাগাড়ার জঙ্গল পদুয়া, ফরিয়াদিকুল এবং সাতকানিয়ার ছদাহা ও কেঁওচিয়ার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ডলু খালের সঙ্গে মিলিত হতো। এই বিপুল জলরাশি সাঙ্গু নদী হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম থাকলেও এখন তা রুদ্ধ। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাঙ্গর খালের শেষ অংশ সাতকানিয়ার ছদাহা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এসে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। পলি জমে এবং অবৈধ দখলে খালটি এখন একটি সংকীর্ণ নালায় পরিণত হয়েছে।
ছদাহা ইউনিয়ন পরিষদের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মুজিবুর রহমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে বলেন,
“খালের শেষের অন্তত তিন কিলোমিটার অংশ এখন আর খালের মতো নেই। পলি জমে ও ভরাট হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। উজানে একাধিক স্লুইসগেট রয়েছে। শুকনো মৌসুমে একেবারে পানি থাকে না। আবার বর্ষায় পাহাড়ি ঢল নামলেও নিচের অংশে পানি চলাচলের মতো অবস্থা নেই। ফলে পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। দ্রুত খাল খনন না করলে প্রতিবছরই এই দুর্ভোগ চলবে।”
মৃতপ্রায় গড়াল ও ডলু: নৌকার বদলে এখন ফসলি জমি
একই চিত্র দেখা গেছে সাতকানিয়ার কেঁওচিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া গড়াল খালে। একসময় এই খাল দিয়ে কেরানিহাট থেকে নতুন খাল পর্যন্ত অনায়াসে মালবাহী নৌকা চলাচল করত।
তাসনীম ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা ও স্থানীয় বাসিন্দা এনামুল হক বলেন,
“২০ বছর আগেও এই খালে নৌকা চলত। কেরানিহাট থেকে নতুন খাল পর্যন্ত একটি প্রশস্ত খাল ছিল। এখন তার অস্তিত্বই নেই। অনেকেই শুধু চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনকে দায়ী করছেন। কিন্তু বাস্তবে সেটিই একমাত্র কারণ নয়। নদী-খাল ভরাট হয়েছে, বড় বড় দিঘি ও পুকুর ভরাট হয়েছে, কৃষিজমি ভরাট করে বসতি গড়ে উঠেছে। ফলে পানি যাওয়ার স্বাভাবিক পথগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।”
লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদী ডলু খালের তলদেশও বিগত কয়েক দশকে ড্রেজিং না করায় সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে গেছে। শুষ্ক মৌসুমে এই নদীর বুকে রীতিমতো চাষাবাদ চলে। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য পাহাড়ি ঢল নামলেই নদীটি সেই জলপ্রবাহ ধারণ করতে পারে না।
২০২৩-এর পুনরাবৃত্তি: এবার ভাসল বাঁশখালীও
২০২৩ সালের আগস্ট মাসে সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ায় স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। সে সময় স্থানীয় বাসিন্দারা এর জন্য নবনির্মিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইনকে এককভাবে দায়ী করেছিলেন। রেললাইনের সুউচ্চ বাঁধের কারণে পানি আটকা পড়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। তবে এবারের বন্যায় পার্শ্ববর্তী উপকূলীয় উপজেলা বাঁশখালীও রেকর্ড পরিমাণ প্লাবিত হয়েছে। যেহেতু বাঁশখালী দিয়ে কোনো রেললাইন যায়নি, তাই পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশবিদরা এই বন্যার নেপথ্যে অন্য গভীর সংকটের দিকে নির্দেশ করছেন।
তদন্তে দেখা গেছে, মৎস্য ঘেরের মালিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা পাহাড়ি মিঠাপানি ঘেরে প্রবেশ ঠেকাতে অনেক স্থানে স্লুইসগেট ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশন পথ কৃত্রিমভাবে বন্ধ করে রেখেছেন। ফলে উজান থেকে নেমে আসা ঢলের পানি প্রাকৃতিকভাবে সাগরে নামার কোনো পথ পাচ্ছে না।
পাহাড় কাটা ও সাগরের জোয়ারের দ্বিমুখী সংকট
দক্ষিণ চট্টগ্রামের এই মানবিক বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ পার্বত্য জেলাগুলোতে নির্বিচারে পাহাড় কাটা। পাহাড় কাটার ফলে বর্ষার বৃষ্টির পানির সঙ্গে আলগা বালু ও কাদা মাটি ধুয়ে নিচে নেমে আসে। এই বালু সরাসরি সাঙ্গু ও ডলু নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীর গভীরতা ও ধারণক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বঙ্গোপসাগরের জোয়ারের প্রভাব। অমাবস্যা ও পূর্ণিমার সময় সাগরের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকায় সাঙ্গু নদী দিয়ে বন্যার পানি দ্রুত সাগরে নামতে পারছে না। ফলে বৃষ্টির পানি এবং পাহাড়ি ঢল চারদিক থেকে এসে নিম্নাঞ্চলের বাড়িঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ দিনের পর দিন ডুবিয়ে রাখছে।
সাতকানিয়ার পশ্চিম ঢেমশা গ্রামের ভুক্তভোগী বাসিন্দা মো. আবদুল কাদের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,
“ছোটবেলা থেকে বন্যা দেখছি। আগে দুই-তিন দিনের মধ্যে পানি নেমে যেত। এবার এক সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল, এখনো ঘরে পানি। মনে হচ্ছে পানি বের হওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আমাদের রান্নাঘর অচল, টিউবওয়েল ডুবে থাকায় খাওয়ার পানির তীব্র সংকট চলছে।”
বিশেষজ্ঞদের মত: কী বলছেন পরিবেশবিজ্ঞানীরা?
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপকে এই দুর্যোগের মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো. বরকত আলী পুরো পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলেন,
“বাংলাদেশের অন্যান্য জায়গা থেকে চট্টগ্রাম একটু ভিন্ন। এখানে যেমন জোয়ার-ভাটার প্রভাব আছে, তেমন মানুষের কার্যক্রমের কিছু প্রভাব আছে। এবছর চট্টগ্রাম বন্যা হওয়ার অন্যতম কারণ রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি। এর সঙ্গে জোয়ারের পানি যোগ হয়েছে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। দ্বিতীয়ত, নদী, নালা, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়া। পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন করার কারণে পানির প্রবাহের জায়গাগুলো সংকুচিত বা বন্ধ হয়ে গেছে।”
রেললাইনের প্রভাব সম্পর্কে তিনি আরও যোগ করেন,
“চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের রেললাইনও এই বন্যার অন্যতম কারণ। এর জন্য আমাদের অনেক ভুগতে হবে। বান্দরবান বা পাহাড়ি বিশাল এলাকার বৃষ্টির পানি বের হতে পারবে না। এজন্য বিভিন্ন ব্রিজ বাড়ানো ও ছোট ব্রিজ বড় করতে হবে। চতুর্থত, বিভিন্ন ঘের, অপরিকল্পিত ভবন, পাহাড় কেটে ধস নেমে বিভিন্ন চ্যানেল বন্ধ বা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার ফলে বন্যা হয়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এক মাস কোনো বৃষ্টি হচ্ছে না। আবার এক মাস প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। ফলে বন্যা দেখা দিচ্ছে।”
সরকারি দপ্তরের আশ্বাস ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো স্বীকার করেছে যে, পানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ত্রুটি এবং অবহেলা ছিল। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) চট্টগ্রামের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজমানুর রহমান বলেন,
“প্রবাহ কমে যাওয়ায় অনেক খাল এরইমধ্যে ভরাট হয়ে গেছে। আমরা কিছু খাল খননের কাজ করেছি। সামনে আরও একটি প্রকল্প আসছে। ওই প্রকল্পের আওতায় সব শাখা খাল চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে খনন করা হবে। এতে খালগুলো আবার প্রাণ ফিরে পাবে এবং বর্ষা ও পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে।”
অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনার কথা জানিয়ে চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ বলেন,
“বিলীন হয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটি বড় খাল পুনরায় খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচির আওতায় প্রথম ধাপে এই খালসহ আরও কয়েকটি খাল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনও কিছু খাল খনন করছে। এসব খাল খনন করা হলে বর্ষার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বন্যার প্রভাব অনেকটাই কমে আসবে বলে আমি মনে করি।”
দক্ষিণ চট্টগ্রামকে স্থায়ী জলমগ্নতা থেকে বাঁচাতে হলে শুধু জোড়াতালির খনন নয়, বরং সাঙ্গু ও ডলু নদীর নিয়মিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং, রেল ও সড়ক অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত ও প্রশস্ত কালভার্ট নির্মাণ এবং মৎস্য ঘেরের নামে প্রাকৃতিক প্রবাহ রোধকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখনই জরুরি।






