তীব্র তারল্য সংকটে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি তহবিল চাইলো ইসলামী ব্যাংক
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২০ পূর্বাহ্ন

তীব্র তারল্য সংকটে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি তহবিল চাইলো ইসলামী ব্যাংক

তীব্র তারল্য সংকটে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি তহবিল চাইলো ইসলামী ব্যাংক
ছবি সংগৃহীত।

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে আবারও অস্থিরতা ও গভীর তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। ব্যাংকটির শীর্ষ নেতৃত্বে আকস্মিক পরিবর্তন এবং নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগকে কেন্দ্র করে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকের আমানতে। মাত্র সাত কার্যদিবসেই ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন আতঙ্কিত গ্রাহকরা।

আমানত প্রত্যাহারের কারণে ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি ও তারল্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) যেখানে উদ্বৃত্ত থাকার কথা, সেখানে তা নেমে এসেছে আশঙ্কাজনক স্তরে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা ব্যাংকটির চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও মারাত্মক ঘাটতির মুখে পড়ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। এই তীব্র সংকট থেকে রক্ষা পেতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার জরুরি বিশেষ তহবিল বা তারল্য সহায়তা চেয়েছে ব্যাংকটি।

ব্যাংকিং সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, খুরশীদ আলমের নিয়োগের আগে ইসলামী ব্যাংকের ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি উদ্বৃত্ত ছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী ব্যাংকটির সিআরআর লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে টানা গণ-উত্তোলনের ফলে তা বর্তমানে কমে মাত্র ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

সিআরআর-এর এই ভয়াবহ ঘাটতির পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে থাকা ব্যাংকটির দৈনিক চলতি হিসাবের ব্যালেন্সও এখন ঘাটতির (নেগেটিভ) দিকে এগোচ্ছে। ব্যাংকের দৈনন্দিন লেনদেন ও গ্রাহকদের চাহিদামত টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এই তীব্র সংকট থেকে বাঁচতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তার আবেদন করা হয়েছে।

কেন এই অস্থিরতা?

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম জুবায়দুর রহমান আকস্মিক পদত্যাগ করেন এবং একই দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার এবং গ্রাহকদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে শীর্ষ পদে বসানোর ফলে ব্যাংকের চলমান সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। আন্দোলনকারীরা ইতোমধ্যেই চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিতে অর্থমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
তবে পরিচালনা পর্ষদের একটি অংশ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাংশের মতে, খুরশীদ আলমের দীর্ঘ ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা এই সংকট কাটাতে সাহায্য করতে পারে।

আমানত প্রত্যাহারের চাপ

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংকের মতো বিশাল আমানত ভিত্তির ব্যাংকের জন্য ৪-৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন তাৎক্ষণিকভাবে অস্তিত্বের সংকট তৈরি করবে না। তবে মূল উদ্বেগের জায়গাটি হলো গ্রাহকদের আস্থাহীনতার বার্তাটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমানত প্রত্যাহারের এই প্রবণতা যদি আরও কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকে এবং মোট উত্তোলনের পরিমাণ ১০ থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তখন গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদে পরিবর্তন বা বড় ধরনের নীতিগত হস্তক্ষেপ ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না। তবে আমানত তোলার এই হিড়িক কতটা বাড়লে চেয়ারম্যান পরিবর্তনের মতো সিদ্ধান্ত আসবে, তা নির্ভর করছে নীতিনির্ধারকদের ওপর।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি সার্বিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকের দেউলিয়া হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। গ্রাহকদের আতঙ্কিত হয়ে টাকা না তোলার পরামর্শ দিয়েছে আর্থিক খাতের এই নিয়ন্ত্রণ সংস্থা।

ইসলামী ব্যাংকের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে নগদ অর্থ তুলে নিচ্ছেন, নাকি অন্য কোনো ব্যাংকে তা স্থানান্তর করছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

​গ্রাহকদের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক বর্তমানে এমন কোনো দেউলিয়া বা সংকটাপন্ন অবস্থায় নেই যে গ্রাহকদের চাহিদামতো টাকা ফেরত দিতে পারবে না। এর আগে ২০২৪ সালের আগস্টেও ব্যাংকটি একই ধরনের চাপের মুখে পড়েছিল এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োচিত সহায়তায় তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। এবারও পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রয়োজনীয় তারল্য সহায়তা দেবে।

তবে সাধারণ গ্রাহক ও ব্যাংকিং সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, অবিলম্বে গ্রাহকদের আস্থা ফেরানোর মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কেবল ধার করা তহবিল দিয়ে দেশের বৃহত্তম এই শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের সংকট স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়।

এদিকে সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর খবরে কান দিয়ে ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ব্যাংকটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মুহাম্মদ আলতাফ হোসেন।

তিনি জানান, ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত এবং ব্যাংকে কোনো তারল্য সংকট নেই। গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় এবং বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংক) সবসময় পাশে থাকার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সম্প্রতি বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের জেরে গ্রাহকদের একটি অংশের মধ্যে টাকা তোলার বাড়তি প্রবণতা ও উদ্বেগ দেখা দেওয়ায় ভিডিও বার্তায় ব্যাংকটির শীর্ষ এই কর্মকর্তা গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেন।




সোনার গহনার দাম আরও কমলো

সোনার গহনার দাম আরও কমলো
ছবি সংগৃহীত।

দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে ২ হাজার ১৫৮ টাকা। এতে ভ্যাটসহ ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা।

স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার দাম কমায় এই দাম কমানো হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে এই দাম কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।

মঙ্গলবার বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠকে করে এই দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এর আগে গতকাল ১৩ জুলাই ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হয় ২ হাজার ২১৬ টাকা। অর্থাৎ দুই দিনে ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমলো ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা।

এখন ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ৯৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা।

এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা।

এর আগে গত ১৩ জুলাই সকাল ১০টা থেকে ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ২১৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ১০০ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১১ হাজার ৯৯৩ টাকা।

এছাড়া ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৮২ হাজার ৭৫ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৭৪ টাকা। আজ সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই দামেই সোনার গহনা বিক্রি হয়েছে।

সোনার গহনার মতো রুপার গহনার দামও ভ্যাটসহ নির্ধারণ করা হয়েছে। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ হাজার ৬০৭ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ৪ হাজার ৩৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ৩ হাজার ৭৯১ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার গহনার দাম ২ হাজার ৮৫৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।




জিডিপি অনুপাতে সংকুচিত হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার: দুই বছর ধরে বন্ধ আইপিও

জিডিপি অনুপাতে সংকুচিত হচ্ছে দেশের পুঁজিবাজার: দুই বছর ধরে বন্ধ আইপিও
ছবি সংগৃহীত।

টানা দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও (IPO) অনুমোদন বন্ধ থাকায় দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে পুঁজিবাজারের আকার আরও সংকুচিত হয়েছে। সদ্য সমাপ্ত ২০Flag-২৬ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) 'মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি' অনুপাত দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে, যা একটি উদীয়মান অর্থনীতির জন্য চরম উদ্বেগজনক।

অর্থনীতির তুলনায় কেন পিছিয়ে পুঁজিবাজার?

একটি দেশের অর্থনীতির গভীরতা ও শক্তি পরিমাপের অন্যতম প্রধান সূচক হলো জিডিপির তুলনায় পুঁজিবাজারের বাজার মূলধনের অনুপাত। বিশ্বের উন্নত ও বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে এই অনুপাত সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ বা তারও বেশি হয়ে থাকে। এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই অনুপাত ১২৫ থেকে ১৩৭ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে। অথচ বাংলাদেশে এই হার মাত্র ১১ শতাংশের ঘরে স্থবির হয়ে আছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের জিডিপি প্রতিবছর যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, পুঁজিবাজার সেই গতি ধরে রাখতে পারছে না। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য ব্যাংক খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পুঁজিবাজার থেকে বেসরকারি খাতে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন শিল্পায়নে সাধারণ মানুষের অংশীদারত্ব কমছে, অন্যদিকে অর্থনীতি ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়ায় আর্থিক খাতে ঝুঁকি বাড়ছে।

বাজার মূলধন বাড়লেও কাটেনি সংকট

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ডিএসইর সার্বিক বাজার মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৩০ জুন শেষে ডিএসইতে সরকারি বন্ডসহ সব সিকিউরিটিজের বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮,৬৯২ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬ লাখ ৬২,২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে বাজার মূলধন ৩৬,৪২১ কোটি টাকা বেড়েছে।

সরকারি বন্ড বাদে অন্য সাধারণ সিকিউরিটিজের বাজার মূলধনও ৩৫,৮৭৭ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬৫,৪৮৩ কোটি টাকায়। তবে এই অংক কেবল কাগজের সূচক বৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ছিল; নতুন কোনো ভালো মানের বহুজাতিক বা সরকারি ও বেসরকারি বড় কোম্পানি বাজারে না আসায় জিডিপির প্রবৃদ্ধির তুলনায় এই অগ্রগতি ফিকে হয়ে গেছে।

আইপিওহীন দুই বছর ও সুশাসনের ঘাটতি

পুঁজিবাজার মূলত গড়ে ওঠে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের জোগান দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। অথচ দেশে সক্রিয় লক্ষাধিক কোম্পানির মধ্যে চারশ কোম্পানিও এখন পর্যন্ত বাজারে তালিকাভুক্ত হতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে টেকনো ড্রাগস লিমিটেড আইপিওর মাধ্যমে ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহের পর বাজার সম্পূর্ণ আইপিওহীন হয়ে পড়ে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরের আমলেও পুঁজিবাজার থেকে বেসরকারি খাতের অর্থ সংগ্রহের চিত্র ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। এই দীর্ঘ সময়ে মাত্র ১৪৭টি কোম্পানি ১০,৭১৪ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে ২৫টি আর্থিক ও বিমা খাতের কোম্পানি আইপিও বাধ্যবাধকতার কারণে ১,৫৮৩ কোটি টাকা নিলেও উৎপাদনশীল শিল্প খাতে এই বাজারকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যায় বলেন, "বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পাওয়া খন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) আইপিও নীতিমালাসহ বিভিন্ন সংস্কার কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকায় নতুন কোম্পানি আনার বিষয়টি প্রত্যাশা অনুযায়ী গুরুত্ব পায়নি। নতুন আইপিও ছাড়া কার্যকর পুঁজিবাজার কোনোভাবেই কল্পনা করা যায় না।"

সূচক ও লেনদেনে কৃত্রিম স্বস্তি

আইপিওর খরা থাকলেও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ চার মাসে, বিশেষ করে ফেব্রুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর বাজারের লেনদেন ও সূচকে গতি দেখা গেছে। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ শতাংশ বেড়ে ৫,৭৬৩ পয়েন্টে এবং ভালো কোম্পানির সূচক ডিএস-৩০ প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে ২,১৭৮ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।

লেনদেনের ক্ষেত্রেও বড় লাফ দেখা গেছে। বিদায়ী অর্থবছরে মোট ১ লাখ ৭২,৬৮৯ কোটি টাকার সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ৫৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন ৭৯ শতাংশ বেড়ে ২৮,৭৯৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং প্রবাসী ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের লেনদেন ১ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ৪,৯৪৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

'জেড' শ্রেণীর আধিপত্য ও বাজার দুর্বলতা

বাহ্যিক এই জোয়ারের আড়ালে বাজারের ভেতরের ভঙ্গুর রূপটি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই উথান দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ এটি মূলত কিছু দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ১২৫টিই ‘জেড’ শ্রেণীভুক্ত, যার মধ্যে ৬২টি কোম্পানির উৎপাদন কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. আল-আমিন বলেন, "বাজারে বিনিয়োগযোগ্য ভালো শেয়ারের তীব্র সংকট রয়েছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা খাতের সিংহভাগ কোম্পানির আর্থিক অবস্থা শোচনীয়। বাজারের গভীরতা বাড়াতে হলে জরুরি ভিত্তিতে নতুন ও টেকসই কোম্পানি আনতে হবে।"

ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) সভাপতি সাইফুল ইসলামও একই মত পোষণ করে বলেন, "বিদ্যমান পরিস্থিতি উত্তরণে নতুন ও মৌল ভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানি বাজারে আনার জন্য সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে সুদূরপ্রসারী ও বিশেষ ছাড়ের যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে।"

সংস্কার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি অবশ্য দাবি করছে যে তারা বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী করতে কাজ করে যাচ্ছে। বিএসইসির মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আবুল কালাম বলেন, “ভালো কোম্পানি বাজারে আকর্ষিত করতে আইপিও বিধিমালায় আন্তর্জাতিক সিকিউরিটিজ ভ্যালুয়েশন স্ট্যান্ডার্ডস (ISVS) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা প্রক্রিয়াটিকে আরও স্বচ্ছ করবে। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য আড়াই শতাংশ কর ছাড়ের যে নতুন সুবিধা যুক্ত হয়েছে, তা ভালো মানের ইস্যুকারী কোম্পানিগুলোকে উৎসাহিত করবে। আশা করা যাচ্ছে, আগামীতে পুঁজিবাজার দেশের জিডিপির সাথে তাল মিলিয়ে প্রকৃত অর্থেই বড় হয়ে উঠবে।”




বাড়ল সোনা ও রুপার দাম

বাড়ল সোনা ও রুপার দাম
ছবি সংগৃহীত।

তেজাবি সোনা (পিওর গোল্ড) ও তেজাবি রুপার (পিওর সিলভার) মূল্য বেড়ে যাওয়ায় দেশের বাজারে নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)। নতুন এ মূল্য শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল ১০টা থেকে কার্যকর হয়েছে।

শুক্রবার (৩ জুলাই) বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীনের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়।

এতে বলা হয়, তেজাবি স্বর্ণ ও রুপার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিংয়ের এক সভা সকাল ৯টায় অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সর্বসম্মতিক্রমে শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে ভ্যাটসহ স্বর্ণ ও রুপার অলংকারের নতুন বিক্রয়মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

নতুন মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি গ্রাম ২২ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) স্বর্ণালংকারের বিক্রয়মূল্য ১৯ হাজার ৫৯৫ টাকা, ২১ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) স্বর্ণালংকারের বিক্রয়মূল্য ১৮ হাজার ৭১৫ টাকা, ১৮ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) স্বর্ণালংকারের বিক্রয়মূল্য ১৬ হাজার ৭০ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি গ্রাম স্বর্ণালংকারের বিক্রয়মূল্য ১৩ হাজার ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ভ্যাটসহ প্রতি গ্রাম ২২ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) রুপার অলংকারের বিক্রয়মূল্য ৪২০ টাকা, ২১ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) রুপার অলংকারের বিক্রয়মূল্য ৪০০ টাকা, ১৮ ক্যারেট ক্যাডমিয়াম (হলমার্ককৃত) রুপার অলংকারের বিক্রয়মূল্য ৩৪৫ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতি গ্রাম রুপার অলংকারের বিক্রয়মূল্য ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজুস জানিয়েছে, অলংকারের ডিজাইন অনুযায়ী মজুরি প্রযোজ্য হবে। এছাড়া স্বর্ণ ও রুপার অলংকারের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না। সুনির্দিষ্ট ভ্যাট, মজুরি ও পাথরের মূল্য বাদ দিয়ে অলংকার এক্সচেঞ্জ ও পারচেজের ক্ষেত্রে বাজুসের পূর্বের নিয়ম বহাল থাকবে।

বাজুস আরও জানিয়েছে, পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এ বিক্রয়মূল্য কার্যকর থাকবে।