টেন্ডার সিন্ডিকেটের ‘গডফাদার’ আমানুর: দুই দশক ধরে সদর দখলে উপসহকারী প্রকৌশলী

২০১৪ সালের ১ জুলাই বান্দরবান সদর উপজেলা পরিষদে উপসহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন আমানুর রহমান। যোগদানের পর থেকে আজ পর্যন্ত একই পদে, একই চেয়ারে বহাল রয়েছেন তিনি। এর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও জেলা পরিষদেও উপসহকারী প্রকৌশলী পদে দায়িত্ব পালন করেন। সব মিলিয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে বান্দরবান জেলা সদরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন এই কর্মকর্তা।
সরকারি চাকরিবিধি অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী একই স্টেশনে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান না। সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে থাকার নিয়ম নেই। কিন্তু বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং দুই দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুরো সময়জুড়েই রহস্যজনকভাবে বদলি এড়িয়ে গেছেন আমানুর রহমান। প্রশাসনিক মহলে এখন প্রশ্ন উঠেছে—কোন শক্তির বলয়ে থেকে বছরের পর বছর তিনি জেলা সদর আঁকড়ে রেখেছেন?
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দীর্ঘদিন একই স্থানে দায়িত্ব পালন করায় স্থানীয় ঠিকাদার ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে গড়ে উঠেছে তাঁর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডির বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ই-জিপি (e-GP) টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, গোপন তথ্য ফাঁস এবং পছন্দের ঠিকাদারদের সুবিধা পাইয়ে দিতে নেপথ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ঠিকাদার জানান, শাহজাহান মিয়া (মিয়া কন্ট্রাক্টর), মোহাম্মদ আলী, আজিজুর রহমানসহ একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ই-জিপি টেন্ডার জমা দেওয়া থেকে শুরু করে দরপত্রসংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি সহযোগিতাও তিনি দিতেন বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
এলজিইডির একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সরকারি কর্মচারী হয়েও নিজের দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ ই-জিপি তথ্য বাইরে পাচার এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের অনলাইনে টেন্ডার ফরম পূরণে সহযোগিতার বিষয়টি অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাই জানেন। কিন্তু প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পাচ্ছেন না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন একই স্থানে থাকায় অফিসের ভেতরে-বাইরে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছেন আমানুর রহমান। অনেক ঠিকাদার দাবি করেন, তাঁর ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমানুর রহমান স্বীকার করেন যে তিনি প্রায় ২০ বছর ধরে জেলা সদরে কর্মরত আছেন। তবে কখনও তাঁকে কোনো দুর্গম উপজেলায় বদলি করা হয়নি।
সচেতন মহলের প্রশ্ন—যেখানে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত বদলি হতে হয়, সেখানে একজন কর্মকর্তা কীভাবে দুই দশক ধরে একই জেলায় বহাল থাকেন? বদলি নীতিমালা কি শুধুই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ? নাকি প্রভাবশালীদের জন্য রয়েছে ভিন্ন নিয়ম?
দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে অবস্থান, ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে সখ্য এবং টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ নিয়ে এখন জোর আলোচনা চলছে পুরো বান্দরবানে। বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা।









