জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের: ঘুষ না পেয়ে ৭০ বছরের নারীসহ পুরো পরিবারকে অপহরণ মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ

চাচা জাফর আলমের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ আছে নাছির উদ্দিনের পরিবারের। সেই বিরোধের মানসিক চাপ সইতে না পেরে তাঁর বাবা ছুরত আলম ইতোমধ্যে মারা গেছেন। কিন্তু জাফর আলমের শত্রুতা যেন শেষই হচ্ছে না। এবার তিনি ছুরত আলমের পুরো পরিবারকে সাজানো অপহরণ ও ৩২ লাখ টাকা চুরির মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। আর তাঁদের সহযোগী হয়ে মাঠে নেমেছেন কক্সবাজারের রামু থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আনোয়ার। এই এসআই আনোয়ার মামলা রুজু হওয়ার আগেই তদন্তের নামে নাছির উদ্দিনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হানা দিয়ে মালামাল তছনছ ও নগদ টাকা নিয়ে এসেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ হলো—তিনি ওই মামলার প্রধান আসামি আরিফ উল্লাহকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে এনে থানায় না নিয়ে দুটি বাড়িতে রেখে রাতভর অমানুষিক নির্যাতন করেছেন। ওই সময় মামলার বাদী জাফর আলমের নিকটাত্মীয় তারেকসহ তিনজনের হাতে আরিফ উল্লাহকে নির্যাতনের জন্য তুলে দেওয়া হয়।
এছাড়াও ৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবির পাশাপাশি অর্ধলক্ষাধিক নগদ টাকা ও একটি দামি মোবাইল ফোন জব্দতালিকায় না দেখিয়ে আত্মসাৎ করে ফেলেছেন এসআই মোহাম্মদ আনোয়ার।
যদিও যাকে ঘিরে অপহরণ ও টাকা চুরির মামলা সাজানো হয়েছে, সেই আনসারুল করিম নিশান তার ফেসবুক আইডিতে ভিডিও বার্তা দিয়ে বলেছে—তাকে কেউ অপহরণ করেনি, সে নিজের ইচ্ছায় ঘর ছেড়েছে।
রামুর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের তেচ্ছিপুল মুন্সীপাড়ার মৃত ছুরত আলমের ছেলে নাছির উদ্দিন এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে এমন সব অভিযোগ তুলেছেন। তিনি বলেন, "আমরা ইয়াবা ব্যবসায়ী চাচা ও তাঁর নিকটাত্মীয় সিন্ডিকেটের মিথ্যা মামলা এবং এসআই আনোয়ারের নিপীড়ন ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাইছি।"
তাঁর ভাষায়, "আমাদের সাথে একটি পারিবারিক জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাচা জাফর আলমের বিরোধ চলে আসছিল। সেই জমিটি জবরদখল করার জন্য চাতুরীর আশ্রয় নেন জাফর আলম। তিনি তাঁর ছেলে নিশানকে অপহরণ ও বাড়ির দরজা ভেঙে ৩২ লাখ টাকা চুরির অভিযোগ তুলে গত ১২ এপ্রিল আমার ভাই তৈয়ব উল্লাহ, মা তাহেরা বেগম, বোন রাবেয়া বসরী ও ভাই আরিফ উল্লাহকে আসামি করে রামু থানায় মামলা করেন। ওই মামলায় অভিযোগ তোলা হয়, আমার ভাই আরিফ উল্লাহ অস্ত্রের মুখে বাদী জাফর আলমের ছেলে আনছারুল করিম নিশানকে অপহরণ ও বাড়িতে ঢুকে তালা ভেঙে ৩২ লাখ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু যার বিরুদ্ধে অপহরণ ও টাকা চুরির অভিযোগ তোলা হয়েছে, আমার সেই ভাই আরিফ উল্লাহ কথিত ঘটনার এক সপ্তাহ আগে থেকেই এলাকার বাইরে ছিল।"
নাছির উদ্দিনের অভিযোগ, তাঁর চাচা জাফর আলম একজন পানদোকানি। তাঁর দৃশ্যমান অন্য কোনো ব্যবসা বা আয়ের উৎস নেই। কিন্তু তাঁর ঘরে ৩২ লাখ নগদ টাকা! তিনি প্রশ্ন তোলেন, "এটা কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য?"
নাছির আরও অভিযোগ করেন, চাচা জাফর আলম সাজানো মামলাটির এজাহার জমা দিয়েছেন ১২ এপ্রিল। ওই দিনই মামলাটি নথিভুক্ত করা হয় এবং তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। অথচ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রামু থানার এসআই মোহাম্মদ আনোয়ার কীভাবে ১০ এপ্রিল কোনো নোটিশ ছাড়াই তাঁর চট্টগ্রামের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাসায় তদন্তের নামে তল্লাশি ও জিনিসপত্র তছনছ করতে পারেন? ঘটনা কিন্তু তাই হয়েছে। যদিও মামলায় আসামি হিসেবে তাঁর নাম নেই।
ওই সময় এসআই মোহাম্মদ আনোয়ার তাঁর কাছ থেকে ৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। তল্লাশির সময় তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নগদ ২৪ হাজার টাকা নিয়ে যান তিনি, যা মামলার জব্দতালিকায় দেখানো হয়নি।
এছাড়াও আরিফ উল্লাহকে গ্রেপ্তারের সময় নগদ ৯ হাজার টাকা ও বিকাশ থেকে ১৮ হাজার টাকা এবং একটি স্যামসাং আল্ট্রা এস২৪ মোবাইল সেটও জব্দ করা হয়েছিল। কিন্তু মামলার জব্দতালিকায় সেসবও দেখানো হয়নি।
এ সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত রামু থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোহাম্মদ আনোয়ার। তিনি দাবি করেন, মামলার তদন্তের বাইরে সামান্যও বেশি কিছু করেননি।
তাঁর ভাষায়, "আমি ভালো কাজ করছি। তাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "ছয় লাখ টাকা ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। নিশানের নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির বিষয়ে চট্টগ্রামে গিয়ে নাছিরদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। সেখানে কোনো ধরনের টাকা-পয়সা চাওয়া হয়নি।"







