চট্টগ্রাম, শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১

[bangla_day]

বিষয় :

প্রকাশ :  ২০২১-১০-১০ ১১:২৫:০২

মাতৃ বন্দনায় 

রূপম চক্রবর্ত্তী:
জগৎ জুড়িয়া এক জাতি আছে, সে জাতির নাম মানুষ জাতি” কবির এই কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করলে কোনো মানুষের পক্ষে খারাপ হওয়া সম্ভব নয়।  সহমর্মিতা মানুষকে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখায়। দৃষ্টিভঙ্গি উদার করে। মানুষকে ঐক্যে বিশ্বাস করতে শেখায়। নিজের মতের প্রতি যেমন বিশ্বাস জোরালো করে তেমনি অন্যের মতের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যাবে না- এই বোধও তৈরি করার শিক্ষা আমাদের নিতে হবে।  মানুষে মানুষে  সম্প্রীতির কারণেই বহু সম্প্রদায় থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন জাতি শাক্তিশালী জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শিশু ও নারীর বিরুদ্ধে হিংস্র থাবা মেলে ধেয়ে আসা অসুর বিনাশ করেই সার্থক হোক দুর্গোৎসব। নারীর উপর নির্যাতনকারী অসুর-রূপ অপশক্তির বিরুদ্ধে জয়ী হোক শুভশক্তি। সকল বাঙালি নারীর মধ্যে জেগে উঠুক অসুর-বিনাসিনীর শক্তি। এই অসুর শক্তি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার জন্য পূজার তাত্ত্বিক কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের গতানুগতিকতার ব্যত্যয় ঘটিয়ে উৎসব জীবনকে রসালো, আনন্দঘন এবং প্রাণবন্ত করে তোলে।
চিন্ময়ী মা আমাদের সকল মায়ার বন্ধন থেকে মুক্তি প্রদান করেন। আজকে চারদিকে যদি থাকাই তাহলে দেখব আমরা প্রতিনিয়ত মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছি। মায়ামুগ্ধ জীব ভাবে পৃথিবীতে সে চিরদিন জীবিত থাকবে। যা ভোগ করতে ইচ্ছা করে তিনি সেটাই ভোগ করতে চেষ্টা করেন। মায়া শক্তির কারণে জীব ভাবে আমিই কর্তা। পাপ কর্মপরায়ণ বিবেকশূন্য মানুষ প্রতিনিয়ত মায়া দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন।  মানুষের মধস্থিত আসুরিক শক্তিকে বিনাশ করে মুক্তি পথের সন্ধান দেন মা জগৎজননী। আমাদের মতো ব্যক্তিদের মায়ার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া খুবই দুরহ ব্যাপার। মায়ার কাজ হচ্ছে যারা ধর্মবিমুখ তাদেরকে প্রতিনিয়ত আবদ্ধ করা। শ্রী চৈতন্য চরিত্রামৃতে বলা হচ্ছে,
” কৃষ্ণ ভুলি সেই জীব অনাদি বহির্ম্মুখ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুখ।।
কভু স্বর্গে উঠায় কভু নরকে ডুবায়।
দন্ড্যজনে রাজা যেন নদীতে চুবায়।।
মাতৃপূজায় আমাদের প্রার্থনা থাকবে আমরা যেন ধর্মপথে অথবা ইষ্টপথে পরিচালিত হতে পারি। কেননা মানব জীবনে অর্থের প্রাচুর্যতা থাকতে পারে কিন্তু সে অর্থ যদি সঠিকভাবে বন্টিত না হয় তাহলে সুন্দর জীবন গঠন করা যাবেনা। ধর্মীয় অনুশাসনবাদ মানুষের চোখ খুলে দেয়। আমরা যারা দুর্গা পূজা করি, সরস্বতী পূজা করি তাদের খেয়াল রাখতে হবে পূজোর ভিতরের রহস্যগুলো নিজের জীবনে অধিষ্ঠিত করতে পারি। যেমন ধরুন পূজা করতে বসলাম কিন্তু দেখা গেল ভক্তি করে মায়ের শ্রীচরণে অঞ্জলি দিলামনা। তাহলে ভাবুন আমরা কি সঠিকভাবে পূজা করেছি। সমাজে কিছু কিছু লোক পাওয়া যাবে যারা আত্মপ্রচারের জন্য অথবা আত্মপ্রতিষ্ঠা করার জন্য পূজা করছেন। সেই পূজোগুলিতে রাজসিকতা আর তামসিকতায় পূর্ণ।
যেখানে প্রেমহীন নির্দয় শূন্য মরুভূমিতে অশুভ অহংকারী শক্তির প্রেত নৃত্য চলছে, সম্পদ মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হচ্ছে, মানুষের প্রচেষ্টা প্রেমার্দ্র দুঃখ মোচনীয় প্রক্রিয়ায় বিনিযুক্ত হচ্ছেনা সেখানে ছড়িয়ে দিতে হবে মায়ের গুণকীর্তন। মায়ের আগমনী বার্তা আমাদের শুভ শক্তি জাগরণের প্রেরণা যোগায়। সুর অসুরের সংগ্রাম চিরকাল দেখা যায়। দেবতা ঐশ্বরিক শক্তিতে শক্তিতে শক্তিমান। কিন্তু দেবতাগণ বিস্মৃত ছিলেন। তাই তাদের উপর পরীক্ষার নিমিত্তে দুর্গতি নেমে আসে। দেবতাগণ অসুরের নিকট পরাজিত হয়ে রাজ্যহারা হন। স্বর্গভ্রষ্ট হয়ে দেবতারা যখন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন তখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে তারা সুর শক্তির আগমনের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন। দেবতাদের কাছ থেকে আমরা মহামিলনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। সামাজিক ঐক্য স্থাপনের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি। ঐক্য স্থাপনের জন্য প্রয়োজন সকল শুভ শক্তির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নতুবা অশুভ শক্তির পাদুর্ভাব ঘটবে।
মাতৃভাবনা জাগ্রত করার অনুপম শিক্ষা পেয়ে থেকে কালী পূজা এবং দুর্গাপূজার  মাধ্যমে। শ্রীরামকৃষ্ণদেব তাই বলেছেন, তোমরা যাকে ব্রহ্ম বল আমি তাকে মা বলি, মা অতি মধুর নাম। প্রতিটি ঘরে ঘরে মাতৃজাতি সম্মান লাভ করুক। মাতৃ আরাধনা তখনই স্বার্থক হয়ে উঠবে, যখন ঘরে ঘরে দূর্গার মত মেয়েদের প্রকাশ ঘটবে। বছর বছর ঢাক-ঢোল বাজিয়ে মাতৃ আরাধনা করেও কেন আমাদের দূর্গতি দূর হচ্ছেনা তা এখন ভেবে দেখতে হবে। পূজার মর্ম কথা আমাদের জানতে হবে।
 শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্র  বললেন,
‘পূঁজা পার্বন তুই যতই করিস,
ফুল, তুলসী, গঙ্গা জলে
অনুশীলনী কৌশল ছাড়া,
ফল পাবে না কোন কালে।’
তাই,  পূজা কেবল মাত্র পুস্প বিল্বপত্রের এবং ঢাক-ঢোলের পূজা নয়। এ পূজা মানবতার এক বিরাট মিলন উৎসব। ঈশ্বর এক, অদ্বিতীয় ও নিরাকার। বিভিন্ন দেব-দেবীও এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বরের বিচিত্র শক্তির প্রকাশ মাত্র। ভক্ত ঈশ্বরের প্রতীক। মূর্তিতে তার হৃদয়ের অর্ঘ্য দেবতার পাদপদ্মে নিবেদন করে করুণা লাভের চেষ্টাই পূজা বা উপাসনা। তাই পূজারী আরাধ্য দেবতার মৃন্ময়ী মূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা করে চিন্ময়ী জ্ঞানে অর্চনা করেন। ভক্তের হৃদয়ের অকৃত্রিম শ্রদ্ধাভক্তিতে মৃন্ময়ী মূর্তি তার মানসলোকে চিন্ময়ী হয়ে ওঠে।
প্রতি শরৎকালে বাঙালী সনাতন সম্প্রদায়ের বাড়িতে বাড়িতে উৎসবের আমেজ। কারণ মা দুর্গা কৈলাস থেকে মর্ত্যকুলে নেমে আসেন। মায়ের আগমনে মন্ডপে মন্ডপে মাংগলিক আওয়াজে মুখরিত। কেউ ফুল তোলার কাজে ব্যস্থ , কেউ মায়ের   পজ়ার জন্য দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে এদিক সেদিক ছুটোছুটি করতে ব্যস্থ। ছোট শিশুরা এক মন্ডপ থেকে আরেক মন্ডপে ছুটে চলার জন্য মায়ের কাছে আবদারের বার্তা নিয়ে ছুটে আসে। সনাতন ধর্মের যারা অনুসারী তারা একে অপরের সাথে মহামিলনের এক অপুর্ব প্রচেষ্টায় রত থাকে কারণ মা আসেন মিলনের বার্তা নিয়ে। পূজার আয়োজক থাকেন হিন্দু সম্প্রদায়। কিন্ত সাজসজ্জা , সাউন্ড , লাইটিং এর কাজে নিয়োজিত থাকে অন্য সম্প্রদায়। সবাইকে নিয়ে কাজ করার এক শিক্ষা মাতৃপূজা পেয়ে থাকি। এই পূজা সুর শক্তিকে জাগ্রত করার শিক্ষা দিয়ে থাকে। সুর মানে শুভ শক্তি আর অসুর মানে অশুভ শক্তি বুঝি।
সুর অসুরের সংঘাত আমরা প্রতিনিয়ত পরিলক্ষিত করছি। এই সংঘাত আমরা দেখি মাতৃ পূজার কাঠামো বিন্যাসে। দেবতারা শুদ্ধ শক্তিতে শক্তিমান ছিল। কিন্তু তারা তা ভুলে গিয়েছিল। যার কারণে তাঁদের উপর পরীক্ষা নেমে আসে। দেবতাগণ অসুর কর্তৃক পরাজিত হয়ে রাজ্য হারা হন। রাজ্যচ্যুত দেবতাগণের সম্মিলিত প্রার্থনার ফল হিসেবে মা দুর্গার শুভাগমন।সর্বমঙ্গলা মা দুর্গার কাছে জগতকে যিনি উগ্রভাবে কামনা করতেন তার প্রতীক মহিষাসুর পরাজিত হন। মহিষাসুর নারীরূপী মহাশক্তি দেবীকে ভোগ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
উক্ত ভোগেচ্ছা অসুরের পরাজয়ের আরেকটি কারণ। আমরা ও বাস্তব জীবনে যদি শুভ শক্তির মিলন ঘটাতে পারি তাহলে সকল অশুভ অহংকারী শক্তি আমাদের পদানত হবে। সকলকে নিয়েই সমাজে থাকতে হয়।   দেবী কাঠামোতে আমরা দেখতে পাই মা দুর্গার সাথে জ্ঞানদাত্রী সরস্বতী , ধনদাত্রী লক্ষী , দেবসেনা কার্তিক , সিদ্ধিদাতা গণেশ , মঙ্গলময় শিব ও কৃষি আর শিল্পেরর প্রতীক কলা বৌ।শক্তিময়ী মা মঙ্গলময় শিবকে মাথায় ধারণ করার শিক্ষাটি আমাদের জন্য এক অনুপম বার্তা প্রদান করেছে। অনেকে সময় আমরা অর্থ বিত্তের মধ্যে খুব বেশি দিনাতিপাত করি । আমরা ভুলে যাই মানুষের মঙ্গল কামনার পবিত্র শিক্ষাটি। আমরা অনেক শক্তিশালী হতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে আমাদের দেহগত শক্তি আর আর আর্থিক শক্তি একদিন শেষ হইয়ে যাবে। তাই আমাদের উচিত শক্তিকে মংগলের কাজে নিয়োজিত করা।
মাতৃপূজা নারী জাতিকে সম্মান জানানোর শিক্ষা প্রদান করে। একদিকে ভোগবাদী কিছু মানুষের অতি বাড়াবাড়ির কারণে সভ্রম হারাচ্ছে নারী জাতির বিশাল অংশ। অন্যদিকে উগ্রবাদী কিছু মানুষের কাছে পরাজিত হচ্ছে আমাদের মানবতা। মানবতার মহাশক্তিকে জাগ্রত করে দুর্গত মানুষের দুর্গতি নাশ করার মানসে প্রতিবছর মহাসমারোহে আমরা মাতৃ পূজার আয়োজন করি।
মা দুর্গা হছেন দৈত্য , বিঘ্ন , রোগ পাপ , ভয় ও শত্রু নাশিনী। দেবী দুর্গা শুধু মুর্তিতে অথবা মন্দিরে নন। তিনি সর্বত্র বিরাজিতা। মায়ের পূজার উপকরণের দিকে থাকালেও   সম্মিলিত সমাজ সৃষ্টির আরেকটি শিক্ষা আমরা পেয়ে থাকি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে ঐক্য , সম্প্রীতির বন্ধনে সমৃদ্ধ হওয়ার মানসে আমরা মায়ের পূজা করি সেই ঐক্য আমরা কতটুকু ধরে রাখতে পারছি। বিভিন্ন জায়গায় চলছে ধর্মের নামে অধর্ম , পূজার নামে ব্যবসায় , ত্যাগের বহিরাবরণে চলছে বিলাস সামগ্রীর আধিক্য। অনেক টাকা খরচ করে মায়ের পূজা করছি মায়ের কৃপা লাভ করার জন্য। কিন্তু মায়ের কৃপা পাওয়ার আরেকটি বড় উপকরণ ঘরের মাকে সঠিকভাবে শ্রদ্ধা করছি কিনা সেদিকেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। পূজার সার্থকতা আরো বেশি করে আমাদের সামনে আসবে যদি আমরা মাতৃজাতির উপর সঠিক সম্মাননা জানাতে পারি।

আরো সংবাদ

%d bloggers like this: