ভাঙা বেড়িবাঁধে কুতুবদিয়ার দীর্ঘশ্বাস: প্রতিটি জোয়ারে তলিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, স্থায়ী সমাধানের অপেক্ষায় কুতুবদিয়াবাসী

জোয়ারের পানি ঢোকার সময় ঘরের দরজা বন্ধ করেও লাভ হয় না। সাগরের লোনা পানি ভাঙা বেড়িবাঁধ পেরিয়ে মুহূর্তেই ঢুকে পড়ে বসতঘরে। খাট, আলমারি, রান্নাঘর, উঠান সবকিছু পানিতে তলিয়ে যায়। পানি নেমে গেলেও থেকে যায় লবণের আস্তরণ, নষ্ট হয় ফসল, পুকুরের মাছ ও নলকূপের পানি। এমন বাস্তবতাই এখন কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার হাজারো মানুষের নিত্যদিনের জীবন।
বিশেষ করে আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের পূর্ব তাবালেরচর, কাহারপাড়া ও রোমাইপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন। প্রতিটি জোয়ারের সময় আতঙ্কে থাকেন তারা। রাতের জোয়ারে ঘুম ভেঙে পানি ঠেকানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ঘর রক্ষা করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কুতুবদিয়া কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুতুবদিয়া রক্ষা বাঁধ ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে প্রায় ২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ বর্তমানে ঝুকিপূর্ণ রয়েছে। যা মেরামতের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
রবিবার সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও শিশুদের কোলে নিয়ে নিরাপদ স্থানে ছুটছেন মায়েরা, কোথাও বৃদ্ধরা কোমরপানি মাড়িয়ে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেক পরিবার উঁচু মাচায় চুলা বসিয়ে রান্না করছে। আবার কেউ কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়েছেন।
পূর্ব তাবালেরচর এলাকার মৃত বদি আলমের স্ত্রী ছমুদা বেগম (৬৫) জানান, রবিবার জোয়ারের পানিতে তাঁর বসতঘর ভেঙে গেছে। এখন সে অন্যের বাড়িতে বসবাস করছেন। তিনি দ্রুত বেড়িবাঁধ মেরামত করার দাবী জানান।
তাবালেরচর এলাকার বাসিন্দা আবু তৈয়ব জানান, জোয়ারের পানিতে বসতঘর ভেঙে যাচ্ছে। আাগামী পূর্ণিমার জোয়ারের আগে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে তাবালেরচর বায়তুশ শরফ কবরস্থান সমুদ্রে বিলিন হয়ে যাবে বলে তিনি আশংকা করেন।
আলী আকবর ডেইল ইউনিয়নের ইউপি সাহাব উদ্দিন, স্থানীয় বাসিন্দা কাউছার হোছাইন রিপন, বড়ঘোপ ইউনিয়নের রোমাই পাড়া এলাকার জিয়াবুল, শুক্কুর, আলী হোছাইন অভিযোগ করে বলেন, বছরের পর বছর ভাঙা বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার না হওয়ায় প্রতি বর্ষা ও পূর্ণিমার জোয়ারে একই দুর্ভোগের শিকার হতে হচ্ছে। তাদের মতে, সাময়িক মেরামত পরিস্থিতি সামাল দিলেও স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না।
আলী আকবর ডেইল ইউনিয়ন পরিষদের (ভারপ্রাপ্ত) চেয়ারম্যান আকতার কামাল সিকদার বলেন, "ভাঙা বেড়িবাঁধের কারণে ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে বারবার জানিয়েছি। দ্রুত সংস্কার না হলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।"
বাপাউবোর কুতুবদিয়া উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: আতিকুল ইসলাম জানান, কুতুবদিয়ায় ঝুকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন ভাবে ৫টি ঝুকিপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করা হয়েছে, শীগ্রই কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মিজানুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা আমরা একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে ভাঙা অংশ দ্রুত সংস্কারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কুতুবদিয়া-মহেশখালী আসনের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহাফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন,কুতুবদিয়াবাসীর নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও দ্রুত সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। কুতুবদিয়ায় ১০টি পয়েন্টে ঠিকাদারের মাধ্যমে বেড়িবাঁধ মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। নতুন করে ৫টি পয়েন্টে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করে দ্রুত কাজ শুরুর চেষ্টা চলছে বলে তিনি জানান।
দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ভাঙা বেড়িবাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হোক, যাতে নিরাপদে বসবাস করতে পারেন কুতুবদিয়ার হাজারো মানুষ এমন প্রত্যাশা দ্বীপবাসীর।







