পাইন্দু সড়ক প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ
বান্দরবানের রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের চান্দা হেডম্যান পাড়া এলাকায় ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রায় ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৬০০ মিটার এইচবিবি সড়ক প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম,দুর্নীতি ও নিম্নমানের কাজের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি,সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে প্রকৌশলগত মানদণ্ড উপেক্ষা করে দায়সারাভাবে কাজ করা হচ্ছে,যা জনগণের করের টাকার অপচয়ের সামিল।
শনিবার (৬ জুন) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়ক নির্মাণ কাজ চলমান থাকলেও প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের মান নিয়ন্ত্রণের ছাপ নেই। রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ইট সলিং ভেঙে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে,প্রকৌশল নকশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বালু ব্যবহার না করে অত্যন্ত অল্প পরিমাণ বালু দিয়ে ইট বসানো হচ্ছে। কোথাও কোথাও বালুর স্তর এক ইঞ্চিরও কম এবং রাস্তার অর্ধেক অংশে বালু ব্যবহারই করা হয়নি এবং এল ড্রেনের কাজ ও নিম্নমানের করা হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
এলাকাবাসীর আশঙ্কা- বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগেই সড়কটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। অথচ এই সড়কটি গ্রামের হাজারো মানুষের চলাচলের প্রধান মাধ্যম। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,নির্মাণকাজ চলাকালে কোনো প্রকৌশলী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার উপস্থিতি দেখা যায়নি। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিজেদের ইচ্ছামতো কাজ পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রকল্পের স্বচ্ছতা,জবাবদিহিতা এবং সরকারি তদারকি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা মংক্যচিং মার্মা বলেন, রাস্তার কাজ দেখে মনে হচ্ছে না এটি দীর্ঘদিন টিকবে। পাহাড়ি কাদামাটির ওপর প্রয়োজনীয় বালু ছাড়া ইট বসানো হয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণের কারণে জনগণের অর্থ অপচয় হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরেক বাসিন্দা মংসিংনু মার্মা বলেন, সরকার উন্নয়নের জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সঠিক তদারকি না থাকলে সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষ কখনোই পাবে না।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মংচউ মার্মা অভিযোগ করে বলেন,কাজের সময় কোনো প্রকৌশলীকে দেখা যায়নি। রাস্তার প্রস্থও অনেক কম করা হয়েছে। এছাড়া অন্তত দুটি কালভার্ট না হলে বর্ষা মৌসুমে এই রাস্তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
চান্দা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা শৈহ্লাচিং মার্মা বলেন, এটি আমাদের এলাকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। অথচ নিম্নমানের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসনের কেউ এসব দেখছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ক্রয়সাংচিং মার্মা বলেন, কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই রাস্তার একটি অংশ ভেঙে যায়। আমার দোকানের সামনে হওয়ায় নিজ খরচে প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় করে সেটি মেরামত করতে হয়েছে। সরকারি প্রকল্পে এমন অনিয়ম মেনে নেওয়া যায় না। আমরা দ্রুত তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই।
এ বিষয়ে পার্বত্য জেলা পরিষদের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান বলেন,আমি এখনো সরেজমিনে পরিদর্শনে যাইনি। কাল পরশু গিয়ে কাজের মান যাচাই করব। কোনো ত্রুটি বা অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের দিয়ে তা পুনরায় করানো হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী কেন এখনো পরিদর্শনে যাননি? এমন অবহেলা কি অনিয়মকে উৎসাহিত করছে না?
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার মংক্যচিং মার্মার বক্তব্য নেওয়ার জন্য একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পাইন্দু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উহ্লামং মার্মা বলেন,দীর্ঘদিন পর এলাকার মানুষ এই সড়কটি পেয়েছে। কিন্তু পরিমাণ অনুযায়ী বালু দেওয়া হয়নি এবং ইট বসানোর কাজেও অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। প্রকৌশলীর উপস্থিতি ছাড়া কাজ হওয়ায় সড়কটি কতদিন টিকবে তা নিয়ে আমি নিজেও শঙ্কিত।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ,কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে যদি নিম্নমানের কাজ ও দায়িত্বহীন চলতেই থাকে,তাহলে সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।
তারা অবিলম্বে কর্তৃপক্ষকের প্রকল্পের গুণগত মান যাচাই, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিতকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।









