নাইক্ষ্যংছড়ির সোনাইছড়ি ও ঘুমধুমে ইয়াবা কারবারিরা কৌশলী, প্রতিরোধে বিজিবি তৎপর

নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তজুড়ে বসেছে ইয়াবার হাট। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) তৎপর হলেও পাচারকারীরা নিত্যনতুন কৌশলে তাদের পাচার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ধ্বংস হচ্ছে দেশ, নষ্ট হচ্ছে যুবসমাজ। গত কয়েক দিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্যমতে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলাটি মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের অন্যতম ভূ-সীমান্তবর্তী এলাকা। এই উপজেলার পাশেই রয়েছে দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজার। দেশি-বিদেশি পর্যটক ও দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিয়মিত এই রুটে যাতায়াত করেন। অতীতে প্রভাবশালী অনেকের গাড়িবহরে ইয়াবা পাচার করার গুঞ্জন রয়েছে। বর্তমানেও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় এই ইয়াবা কারবার চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এমনই এক ঘটনা ঘটেছে গত বুধবার (১৩ মে)। ওই দিন এক মোটরসাইকেল চালকের বাড়ি থেকে ১ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় সীমান্তের রামু থানায় ৪ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৪ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির ওপর নজরদারি রাখা হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রামু থানার গর্জনিয়া পুলিশ ফাঁড়িতে কর্মরত এসআই মোহাম্মদ জুয়েল। তিনি বলেন, "সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ (শূন্য সহনশীলতা) নীতি ঘোষণা করেছে। এই বিষয়ে কারও ছাড় নেই।"
এদিকে যে ৪ জনের নামে মামলা হয়েছে, তারা সবাই ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। এমনকি তাদের কয়েকজন সম্প্রতি সরকারি দলের নেতাদের ফুলের তোড়া দিয়ে বরণও করে নেন। তাদেরই একজন সোহেল, যার বাড়ি থেকে ১ লাখ ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করেছে পুলিশ।
অপরদিকে, নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার দোছড়িতে সম্প্রতি একটি সভায় ১১ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. ফয়েজুল কবির বলেছেন, তিনি মাদক ও চোরাচালান বন্ধ করতে প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এই অপকর্মে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের নিয়ন্ত্রণের কারণেই মূলত মাদক কারবারিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোজাম্মেল হক বলেন, "বর্তমান সরকার চাঁদাবাজ, মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। এই নির্দেশ পালনে নাইক্ষ্যংছড়ি থানা-পুলিশ অত্যন্ত তৎপর।"
এদিকে নাইক্ষ্যংছড়ি দক্ষিণ সীমান্তে দায়িত্বরত ৩৪ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. খাইরুল আলম বলেন, "আমরা মাদক কারবারি ও চোরাচালানিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে রয়েছি। এই কারণেই কোটি কোটি টাকার মাদক জব্দ করা সম্ভব হচ্ছে।" এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবারও বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ একজনকে আটক করেছে ৩৪ বিজিবির জোয়ানরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সীমান্তের ১০টি চোরাচালান পয়েন্টের ওপারে এবং এপারে রুদ্ধদ্বারভাবে বসে ইয়াবা ট্যাবলেট বেচা-কেনার হাট। কারবারিদের পাহাড়ায় ওপারে দিনের বেলা এবং এপারে রাতের আঁধারে সক্রিয় থাকে সিন্ডিকেট। এসব মাদক পাচারকারী যুবকদের হাতে থাকে মরণাস্ত্র। কোথাও বাধাগ্রস্ত হলেই তারা অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধাবোধ করে না।
সীমান্তবর্তী রামু কচ্ছপিয়া ইউনিয়ন বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, তার এলাকায় প্রতি রাতে গুলির শব্দ শুনতে পাওয়া যায়।
অপরদিকে সোনাইছড়ি ইউনিয়নের বাসিন্দা আবদুর রহমান, উচাচিং মার্মা ও কমল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, বর্তমানে সোনাইছড়িতে গভীর রাতে মাদকের হাট বসে। মিয়ানমার থেকে ইয়াবা, বিদেশি মদ ও অন্যান্য চোরাই পণ্য মূলত ৪টি পয়েন্ট দিয়ে এপারে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক সচেতন ব্যক্তি জানান, সোনাইছড়ি সীমান্তে মাদক পাচারের সাথে জড়িত গডফাদারদের মধ্যে জেজে মার্মা ও লাটুচি মার্মা অন্যতম। এ ছাড়া ঘুমধুমে আরও ৩০ জন, কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে ৪৭ জন এবং গর্জনিয়ায় ৩৪ জন সক্রিয় কারবারি রয়েছে। আর তাদের সহায়তাকারী ও বহনকারী শ্রমিক রয়েছে কয়েক হাজার।
(চলবে... আসছে দ্বিতীয় পর্ব)









