বান্দরবানের আলীকদমে ‘প্রেন্নয় শিক্ষালয়’ আবাসিক হোস্টেলের উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। ২০২৫ সালে হোস্টেলের টয়লেট নির্মাণ এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও পোশাকের জন্য দুটি প্রকল্পে মোট ৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ ও মালামাল বিতরণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা। তাদের দাবি, টয়লেট নির্মাণের জন্য বরাদ্দের টাকা খরচ দেখানো হলেও দীর্ঘদিন সেখানে ব্যবহারযোগ্য কোনো টয়লেট ছিল না। অভিযোগের পর এখন সেখানে নির্মাণসামগ্রী এনে কাজ শুরুর তৎপরতা দেখা গেছে।
অভিযোগটি করা হয়েছে ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং স্রোর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০২৫ সালে প্রেন্নয় শিক্ষালয়ের আবাসিক হোস্টেলের টয়লেট নির্মাণে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু সরেজমিনে দীর্ঘদিন পর্যন্ত কোনো টয়লেট নির্মাণ না হওয়ায় প্রায় ১৪৪ জন শিক্ষার্থীকে খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতে হয়েছে। অভিযোগ দাখিলের পর রাস্তার পাশে টয়লেট নির্মাণের কিছু সামগ্রী এনে রাখা এবং পরে মিস্ত্রি পাঠানোর ঘটনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
হোস্টালের শিক্ষার্থী রাওকাউ ম্রো বলেন, “আমাদের থাকার জায়গায় প্রয়োজনীয় বাথরুমের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক সময় বাইরে যেতে হয়। এতে আমাদের নানা সমস্যায় পড়তে হয়। টয়লেটের জন্য বরাদ্দের কথা শুনেছি, কিন্তু এতদিনেও ভালোভাবে ব্যবহার করার মতো টয়লেট পাইনি।”
হোস্টালের শিক্ষক লেংরাও ম্রো বলেন, “প্রায় ১৪৪ জন শিক্ষার্থীর জন্য দীর্ঘদিনেও প্রয়োজনীয় স্যানিটেশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। একটি আবাসিক হোস্টেলে এত শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও ব্যবহারযোগ্য বাথরুম না থাকায় শিক্ষার্থীদের খোলা জায়গায় মলত্যাগ করতে হয়েছে। টয়লেট নির্মাণের জন্য আগে বরাদ্দ হয়ে থাকলে সেই অর্থে কেন কাজ হয়নি এবং অভিযোগের কেন নির্মাণকাজ শুরু হলো, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।”
শুধু টয়লেট নয়, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপকরণ ও স্কুল ইউনিফর্মের জন্যও ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের দাবি, চেয়ারম্যান নিজেই ঠিকাদারি ধাঁচে কাজটি পরিচালনা করেন। কিন্তু বরাদ্দের বিপরীতে আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকার মতো ব্যাগ, পোশাকসহ কিছু সামগ্রী দেওয়া হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বাকি অর্থের ব্যবহার নিয়েই মূল প্রশ্ন।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য কামপুক ম্রো বলেন, হোস্টালকে ঘিরে থাকা প্রকল্পগুলোর প্রতিটিতে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ ছিল বলে তিনি জানেন। এর মধ্যে হোস্টেলের একটি কাজ হলেও টয়লেট নির্মাণ হয়নি। শিক্ষা উপকরণ ও পোশাকের ক্ষেত্রে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার ব্যাগ, স্কুল ড্রেস ও কিছু জুতা দেওয়া হয়েছিল। কিছু জুতার মাপ ঠিক না হওয়ায় পরে সেগুলো ফেরত নেওয়া হলেও আর বিতরণ করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
প্রেন্নয় শিক্ষালয়ের পরিচালক ওতাংকিউ মারমা বলেন, প্রকল্পগুলোর বিষয়ে তিনি অবগত। চেয়ারম্যানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেও একপর্যায়ে তাদের মধ্যে মতবিরোধ হয়। তার ভাষ্য, চেয়ারম্যান ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে “আমার নামে মামলা দেবেন” এমন কথাও বলেছেন।
স্থানীয় ইয়াংরিং কারবারির অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ নিয়ে চেয়ারম্যানের সঙ্গে তিনি একাধিকবার কথা বলেছেন। ইয়াংরিং কারবারিপাড়ায় একটি ধর্মীয় খিয়াংঘর নির্মাণের বিষয়েও চেয়ারম্যান তাকে আগে কাজ করতে বলেন এবং বিল তুলে টাকা দেওয়ার আশ্বাস দেন। কারবারির দাবি, সেই আশ্বাসে তিনি নিজের আমবাগান বন্ধক রেখে কাজটি করেন। কিন্তু প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পাওনা টাকা পাননি। এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রকল্পের নথি, বিল-ভাউচার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রেন্নয় শিক্ষালয়ের আবাসিক হোস্টেল ভবন থাকলেও এর মেঝের কাজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবহারযোগ্য স্যানিটেশন ব্যবস্থা চোখে পড়েনি। অন্যদিকে অভিযোগ দাখিলের পর টয়লেট নির্মাণের কিছু সামগ্রী আনা হয়েছে এবং নির্মাণকাজের জন্য মিস্ত্রি পাঠানো হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। ফলে বরাদ্দের অর্থ আগে কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং এখন নতুন করে নির্মাণকাজের অর্থের উৎস কী, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, চেয়ারম্যানের মেয়াদে আগের বিভিন্ন প্রকল্পের তালিকাতেও বাস্তবে অস্তিত্বহীন প্রকল্প দেখানোর ঘটনা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের অনুমোদনপত্র, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কাগজপত্র, বিল-ভাউচার, অর্থ ছাড়ের নথি, পরিমাপ বই, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বিল এবং প্রকল্পস্থল সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং স্রো বলেন, “আমি কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি করিনি। আপনারা সরেজমিনে গিয়ে দেখে আসতে পারেন। একটি পক্ষ দীর্ঘদিন ধরে আমার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে, তারাই এই অভিযোগ তুলেছে। আমিও আমার তহবিল থেকে সেখানে টাকা দিয়ে কাজ সম্পন্ন করেছি।”
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, “অভিযোগটি পেয়েছি। বিষয়টি তদন্ত করার ব্যবস্থা নিচ্ছি। তদন্তে প্রকল্পের বরাদ্দ ও কাজের বাস্তব অবস্থা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
এদিকে অভিযোগকারীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের কাগজপত্রের সঙ্গে সরেজমিন বাস্তবতা মিলিয়ে দেখা জরুরি। বিশেষ করে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দের টয়লেট প্রকল্পে কাজ না হয়ে থাকলে অর্থ কোথায় ব্যয় হয়েছে এবং অভিযোগের পর শুরু হওয়া নির্মাণকাজের অর্থের উৎস কী—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসতে পারে।