কক্সবাজার সৈকতে ৫০ ফুটের প্লাস্টিক দানব, তৈরি ৫ টন বর্জ্যে

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে আছে ৫০ ফুট উচ্চতার এক দানব। হাতে উপড়ে ফেলা নারকেলগাছ, শরীরজুড়ে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক বর্জ্য। দূর থেকে দেখলে মনে হবে, সমুদ্রের গভীর থেকে উঠে এসেছে কোনো ভয়ংকর প্রাণী। তবে এটি কোনো কল্পকাহিনির দানব নয়; মানুষের অসচেতনতা ও প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহতার প্রতীক।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে স্থাপন করা ব্যতিক্রমী এই ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে সমুদ্র থেকে সংগ্রহ করা পাঁচ মেট্রিক টন প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে। ইনানী, টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিন সৈকত থেকে সংগ্রহ করা এসব প্লাস্টিক দিয়ে ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিল্পীরা। এটি তৈরি করতে তাঁদের সময় লেগেছে ২০ দিন।
সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সিগাল পয়েন্ট এলাকায় ভাস্কর্যটির প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় এ উদ্যোগ নিয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার এ এন এম সাজেদুর রহমান।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্লাস্টিক ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্য দানবের মতো ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে এসে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতলসহ নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলে যান অনেক পর্যটক। এসব বর্জ্য পরিবেশ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা প্রতীকীভাবে তুলে ধরছে এই ভাস্কর্য। শিল্পকর্মটি দেখতে সৈকতে ভিড় করছেন পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ফরিদপুর থেকে আসা শিক্ষক দম্পতি মামুন ও লায়লা বলেন, বেড়াতে আসা অনেক মানুষ প্লাস্টিকসহ নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করছেন। প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলা এবং পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে সচেতন হতে হবে।
আরেক পর্যটক সাদিয়া বলেন, প্লাস্টিক দূষণ রোধে ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগও জরুরি। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন, সচেতনতামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ প্রয়োজন।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবক মুহাম্মদ মুবারক সাংবাদিকদের বলেন, ৫০ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্য তৈরিতে পাঁচ টন প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্লাস্টিক দূষণ কীভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘গাছ উপড়ে ফেলার প্রতীকী দৃশ্যের মাধ্যমে আমরা দেখাতে চেয়েছি, এই দূষণ কীভাবে আমাদের পরিবেশ ও অক্সিজেনের উৎসকে হুমকির মুখে ফেলছে। প্লাস্টিক দূষণের কারণে নীরবে যে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটছে, তা অনেক সময় আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। সেই অদৃশ্য বিপর্যয়কেই দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেছি এই ভাস্কর্যের মাধ্যমে।’
মুহাম্মদ মুবারক আরও বলেন, দায়িত্বশীল পর্যটন ও পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে একটি চলচ্চিত্র তৈরি করেছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। এ বছর কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, বাংলাদেশের মতো দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনর্ব্যবহারের সক্ষমতা সীমিত। তাই এ দূষণ রোধে জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, ২০২২ সাল থেকে কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিনে প্লাস্টিকবিষয়ক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাচ্ছে বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন। প্লাস্টিক বর্জ্যের বিনিময়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে চাল-ডাল দেওয়ার পাশাপাশি সংগৃহীত প্লাস্টিকের একটি অংশ পুনর্ব্যবহার ও ভাস্কর্য নির্মাণে কাজে লাগানো হয়।
মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন জানান, প্রতিবছর ভিন্ন ভিন্ন প্রতীকী ভাস্কর্যের মাধ্যমে মানুষের ফেলে দেওয়া প্লাস্টিক কীভাবে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে, তা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা তৈরি করাও এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আগামী ছয় মাস ভাস্কর্যটির প্রদর্শনী চলবে।
সৈকতে দাঁড়িয়ে থাকা প্লাস্টিকের এই দানব শুধু একটি শিল্পকর্ম নয়; এটি মানুষের অসচেতনতার কারণে সৃষ্ট দূষণের ভয়াবহ পরিণতির প্রতীক। প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কমানো, নির্দিষ্ট স্থানে বর্জ্য ফেলা এবং পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়ার বার্তাই দিচ্ছে ব্যতিক্রমী এই ভাস্কর্য।










