ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কেন আলোচনায় ৩ হাজার কোটি ডলার
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬, ০৭:২২ পূর্বাহ্ন

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কেন আলোচনায় ৩ হাজার কোটি ডলার

ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কেন আলোচনায় ৩ হাজার কোটি ডলার
ছবি সংগৃহীত।

আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা স্মারক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে, তার অংশ হিসেবে ইরানের জন্য ৩০০ বিলিয়ন (৩০ হাজার কোটি) মার্কিন ডলারের একটি বিশাল বিনিয়োগ তহবিল গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক বাজার ওলটপালট করে দেওয়া এই যুদ্ধাবসানের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

রবিবার উভয় পক্ষ এই চুক্তিতে ডিজিটালভাবে স্বাক্ষর করার পর, সোমবার মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সিবিএস নিউজকে জানান, এই আর্থিক সুযোগ চুক্তির শর্ত পালনে ইরানের কার্যকারিতার ওপর নির্ভর করবে।


ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির তীব্র সমালোচনা করে দাবি করতেন যে, ওই চুক্তি তেহরানকে বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়েছিল। ফলে এই রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়টি নিয়ে জনসাধারণের ধারণা নিয়ন্ত্রণে ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দিচ্ছে বলে যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা ভুয়া খবর।


অন্যদিকে ভ্যান্স স্পষ্ট করেছেন যে, এই অর্থ ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কোনও সরাসরি অর্থপ্রদান নয়।

সিবিএস মর্নিং অনুষ্ঠানে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, মানুষ যখন বলছে যে শত শত কোটি ডলারের সম্পদ অবমুক্ত করা হবে, তখন তা সত্যি নয়। সত্যটা হলো, ইরান যদি এই চুক্তিতে করা তাদের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করে, তবে তাদের ভবিষ্যৎ আরও অনেক ভালো ও সমৃদ্ধ হবে।


কী এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ তহবিল?

ভ্যান্সের মতে, এই চুক্তিটি মূলত ইরানের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলছে, দেখো, তোমরা যদি তোমাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে রাজি থাকো এবং পারমাণবিক কর্মসূচিতে প্রকৃত পরিদর্শনের অনুমতি দাও, তবে আমরা তোমাদের বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বাগত জানাব।

ভ্যান্স জানান, এই তহবিলটি যুক্তরাষ্ট্রের কোষাগার থেকে যাবে না, বরং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জোট এর অর্থায়ন করবে, যদি ইরান তাদের শর্ত পূরণ করে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, এই তহবিল কোনও দেশের সরকার দেবে না, বরং ইরানে বিনিয়োগ করতে উদগ্রীব বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির সমন্বয়ে এটি গঠিত হবে। মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো মুহানাদ সেলুম বলেন, এই কাঠামোটি ওয়াশিংটনের জন্য একটি ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি। তিনি বলেন, ইরান যদি নিজেকে সংশোধন করে, তবে এই শান্তির কৃতিত্ব পাবে ট্রাম্প প্রশাসন; আর যদি তারা তা না করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ক্ষতি নেই, কারণ সব ঝুঁকি বহন করবে উপসাগরীয় দেশগুলো।

ইরানের অবমুক্ত তহবিল নিয়ে ধোঁয়াশা

বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুমের মতে, মূলত ইরানের অবরুদ্ধ করা অর্থ সরাসরি ছেড়ে দেওয়ার নেতিবাচক রাজনৈতিক প্রচার এড়াতেই এই বিনিয়োগ তহবিলের ধারণাটি সাজানো হয়েছে। ইরানের অবরুদ্ধ সম্পদের সঠিক পরিমাণ স্পষ্ট না হলেও, ইরানি সরকারি প্রতিবেদন ও বিশেষজ্ঞদের মতে এর পরিমাণ ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এবং পরবর্তীতে পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের দেওয়া বছরের পর বছর নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এর ফলে তেহরান বিদেশে থাকা তাদের নিজস্ব সম্পদ, যেমন তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহারের অধিকার হারিয়েছে। ২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের আমলে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তির পর ইরান কিছু নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেলেও, ২০১৮ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প সেই চুক্তিটি বাতিল করে দেন।

গত রবিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম মেহর নিউজ এজেন্সি দাবি করেছিল যে, ১৪ দফার খসড়া সমঝোতা স্মারকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে এই বিষয়ে সিবিএস নিউজের প্রশ্নের জবাবে ভ্যান্স বলেন, ইরানিদের সঙ্গে আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, তার কোনও অনুলিপিতে এই ২৪ বিলিয়ন ডলারের সংখ্যার কোনও অস্তিত্বই নেই।

তিনি আরও বলেন, আমরা বলেছি যে আমরা সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়ে কথা বলতে রাজি, তবে আরও বড় বিষয় হলো তাদের অর্থনীতির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া, যদি তারা পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি দেয়।

অনুমান করা হচ্ছে এই যুদ্ধে ইরানের প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং দেশের মানুষ ১৯৪২ সালের পর সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ধুঁকছে। এই পরিস্থিতিতে এই বিনিয়োগ তহবিল দেশটির জন্য একটি বড় লাইফলাইন হতে পারে। তবে মুহানাদ সেলুমের মতে, এটি ইরানের জন্য এক ধরনের ‘মর্যাদার সংকট’ তৈরি করবে। কারণ, তেহরান এটিকে কোনও সার্বভৌম আর্থিক স্বস্তি হিসেবে দেখবে না, বরং দেখবে তাদের ওপর শর্তযুক্ত অর্থ হিসেবে।

চুক্তি সইয়ের পর যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং তাদের কাছে থাকা ৪৪০ কেজিরও বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ দূর করা। বর্তমান চুক্তিটি চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদকে আরও ৬০ দিন বাড়িয়ে দেবে, যে সময়ের মধ্যে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ধ্বংস বা সরিয়ে ফেলার মতো বিষয়ে দুই পক্ষ পরবর্তী আলোচনা করবে।

ভ্যান্স দাবি করেছেন যে তেহরান তাদের মজুত সমর্পণ করতে, নিয়মিত পরিদর্শনের মুখোমুখি হতে এবং পারমাণবিক অস্ত্র কেনা বা তৈরি করা থেকে বিরত থাকতে সম্মত হয়েছে। তবে সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি এখনও প্রকাশ করা হয়নি।

একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও বিতর্ক রয়ে গেছে। ট্রাম্প গত রবিবার ‘তেল প্রবাহিত হতে দিন’ বলে প্রণালি খোলার ইঙ্গিত দিলেও, সিএনবিসি-র সঙ্গে আলাপকালে ভ্যান্স স্বীকার করেছেন যে এই নৌপথের সব জটিলতা এখনও কাটেনি। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা হলো এই প্রণালিটি দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক-মুক্ত উপায়ে খোলা থাকবে এবং এই প্রযুক্তিগত আলোচনাগুলোর মাধ্যমেই আমরা বিষয়টি চূড়ান্ত করব।

পাশাপাশি, লেবাননে ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসনও এই শান্তি প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ফাটল ধরাতে পারে। কারণ ইরান শুরু থেকেই জোর দিয়ে আসছে যে যেকোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে তাদের মিত্র দেশ লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে ইসরায়েল এখন পর্যন্ত এমন কোনও শর্ত প্রত্যাখ্যান করে আসছে যা হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তাদের হাত বেঁধে দেয়। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ শুক্রবার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তেহরানের সঙ্গে কোনও চুক্তি হোক বা না হোক, লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

চুক্তি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, এই সমঝোতা স্মারক ইরানের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা বয়ে আনবে, তবে তেহরান তাদের সব প্রয়োজনের জন্য কেবল এই সুবিধার ওপরই নির্ভর করবে না। প্রেস টিভি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী সোমবার আরাঘচি বলেন, ‘আমাদের সামনে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, চুক্তি অমান্য এবং চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার অতীত ইতিহাস রয়েছে।’ তিনি জানান, আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে।

ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনও এই বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি। তবে ট্রাম্পের জন্মদিনের দিনে এই চুক্তির ঘোষণা আসায় কিছু ইরানি পর্যবেক্ষক তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন। এই যুদ্ধের শুরুতে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে রক্ষণশীল সাংবাদিক পারিসা নাসর এক্স-এ লিখেছেন,  ‘শহীদ নেতার হত্যাকারীকে জন্মদিনের উপহার দেওয়াও কি এই চুক্তির কোনও অলিখিত শর্ত ছিল?’

অবশ্য ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এই চুক্তির অনুমোদন দিয়েছে যাতে ইরানি জাতির অধিকারের প্রতি আমেরিকার প্রকৃত প্রতিশ্রুতির বিষয়টি বাস্তবে পরীক্ষা করা যায়।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার ফ্রান্সে জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে হওয়া এই চুক্তিটিকে ‘ন্যায্য’ ও ‘ভালো’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে কঠোর ভাষায় তিনি মনে করিয়ে দেন, এই চুক্তির অধীনে ইরান কোনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না এবং তা করলে তাদের উড়িয়ে দেওয়া হবে।

সম্মেলনে উপস্থিত কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি বলেন, এই ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি এই অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি, এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। তবে আমরা যদি এই গতি ধরে রাখতে পারি, তবে আমি বিশ্বাস করি আমরা এই অঞ্চলে দারুণ কিছু অর্জন করতে পারব।’

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানালেও চুক্তির সব শর্ত জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন। সিনেটর গ্রেগরি মিকস বলেন, যেকোনো চূড়ান্ত চুক্তি অবশ্যই স্থায়ী, প্রয়োগযোগ্য ও স্বচ্ছ হতে হবে, এটি যেন কেবল কোনও অস্পষ্ট ঘোষণা বা রাজনৈতিক চাল না হয়।

রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম রবিবার চুক্তি নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশের পাশাপাশি কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমার মনে হচ্ছে এই চুক্তি নিয়ে ইরানের দৃষ্টিভঙ্গি মার্কিন দলের দাবির চেয়ে আলাদা।

মিডল ইস্ট কাউন্সিলের বিশ্লেষক মুহানাদ সেলুম বলেন, দুই পক্ষের এই ভিন্ন ভিন্ন সুর এটাই প্রমাণ করে যে তারা আসলে একে অপরের সঙ্গে প্রকৃত অর্থে কোনও কথা বলছে না। তিনি বলেন, তারা মূলত নিজেদের দেশের ভেতরের জনগণকে শান্ত করতে একে অপরের ওপর দিয়ে কথা বলছে। কারণ দুই পক্ষকেই নিজ দেশে এটিকে এমন একটি ‘বিজয়’ হিসেবে বিক্রি করতে হচ্ছে, যা তারা সততার সঙ্গে করতে পারছে না।

সূত্র: আল-জাজিরা




ভারতের জেন-জিও কি সরকার উৎখাতের পথে

ভারতের জেন-জিও কি সরকার উৎখাতের পথে
ছবি সংগৃহীত।

চার বছরে দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের সরকারকে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে উৎখাত করেছে তরুণ সমাজ জেন-জি। ২০২২ সালে কলম্বো, ২০২৪ সালে ঢাকা এবং ২০২৫ সালে কাঠমান্ডু; এই ধারাবাহিকতায় এবার উত্তপ্ত ভারতের রাজধানী দিল্লি। একটি গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার অনিয়মের দায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি নামে পরিচিত একটি ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন গত এক সপ্তাহে হাজার হাজার মানুষকে রাজপথে টেনে এনেছে। এ ধরনের বিক্ষোভকে কেবল ‘তরুণদের আন্দোলন’ বলে চালিয়ে দেওয়া যায় না। দক্ষিণ এশিয়ায় সরকার পতনের পেছনে মূলত চারটি প্রধান পরিস্থিতি কাজ করেছে। বর্তমান ভারতের বাস্তবতায় যার তিনটি ইতোমধ্যেই বিদ্যমান-

১. শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বিচ্ছিন্নতা

প্রথম শর্ত হলো উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের বিস্তার। ভারতে প্রতি বছর ৫০ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও কাজের সুযোগ পান মাত্র ২৮ লাখ। ২০ থেকে ২৯ বছর বয়সী বেকার ভারতীয়দের মধ্যে গ্র্যাজুয়েটদের হার ২০১৭ সালের ৪৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ৬৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টি গত মে মাসের নিট-ইউজি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে, যা ২২.৭ লাখ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলেছিল। গত পাঁচ বছরে ভারতের ১৬টি রাজ্যে ৪৮টি প্রশ্নফাঁসের ঘটনা ঘটেছে, যার প্রভাব পড়েছে প্রায় দেড় কোটি চাকরিপ্রার্থীর ওপর। ২০২৪ সালে প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে আইন পাস হলেও ২০২৬ সালেও একই ঘটনা ঘটেছে। একটি সাধারণ পরিবারের জন্য এই পরীক্ষাগুলোই পেশাগত জীবনে প্রবেশের একমাত্র মই, কিন্তু সেই প্রশ্নপত্র বারবার আগেই কারো কাছে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে।

২. বৈষম্যের দৃশ্যমানতা

দ্বিতীয় শর্ত হলো বৈষম্য যা এখন খালি চোখে ও মোবাইলের স্ক্রিনে স্পষ্ট। একজন তরুণ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হওয়ার খবর পড়ছে, তখনই স্ক্রিনের পরের স্ক্রলে দেখতে পায় কোনও রাজনীতিকের ছেলের স্কি ট্রিপের ছবি কিংবা কোনও শিল্পপতির মেয়ের মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ঘোষণা। নেপালের বিক্ষোভকারীরা এদের ‘নেপো কিডস’ বা স্বজনপ্রীতির সন্তান বলে ডাকত, যা শুধু একটি বিদ্রূপ নয়; বরং বৈষম্যের পরিমাপ।

৩. প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থাহীনতা

তৃতীয় শর্ত হলো প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাওয়া। যখন অভিযোগ কোনও কাজে আসে না, আদালতে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হয়, প্রতিনিধিরা ভোটারদের উপেক্ষা করে এবং নির্বাচন কিছুই পরিবর্তন করে না, তখন রাজপথই হয়ে দাঁড়ায় একমাত্র উপায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ককরোচ জনতা পার্টির অ্যাকাউন্ট পাঁচ দিনের মধ্যে ব্লক করা হয়েছে। দিল্লিতে তাদের অবস্থান ধর্মঘট অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং সোমবার সংসদে তাদের পদযাত্রার অনুমতি দেওয়া হয়নি। নির্দেশ অমান্য করে পদযাত্রা করা হলে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয় এবং পুলিশের লাঠিচার্জে বহু অংশগ্রহণকারী আহত হন।

৪. ক্ষোভ ও অপমান:

চতুর্থ শর্ত হলো রাষ্ট্র তার ব্যর্থতার পর যখন মানুষকে অপমান করে। নেপাল ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার পাঁচ দিনের মধ্যে সরকার হারায়। বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান শুরু হয়েছিল চাকরির কোটা নিয়ে আদালতের এক রায় এবং অপমানজনক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। ভারতের আন্দোলন শুরু হয়েছে একটি নির্দিষ্ট অপমানজনক শব্দ থেকে।

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যেখানে নেতারা ছোট কোনও বিষয়ে ছাড় দিতে পারতেন, কিন্তু তারা রাজপথ খালি করার পথ বেছে নিয়েছিলেন। ফলে ছোট দাবিগুলো আর যথেষ্ট থাকেনি এবং শেষ পর্যন্ত তা পুরো সরকার পতনের দাবিতে পরিণত হয়েছিল। সোমবার দিল্লিতেও আন্দোলনটি আর কেবল শিক্ষামন্ত্রী প্রধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি।

সূত্র: স্ক্রল.ইন




সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির অনুমোদন দিলেন ট্রাম্প

সৌদি আরবের সঙ্গে পরমাণু চুক্তির অনুমোদন দিলেন ট্রাম্প
ছবি সংগৃহীত।

সৌদি আরবের সঙ্গে একটি ‘ঐতিহাসিক’ পরমাণু চুক্তির অনুমোদন দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।

অনুমোদিত চুক্তির শর্ত অনুসারে, সৌদি আরব বেসামরিক খাতে পরমাণু শক্তির ব্যবহার করতে পারবে এবং আগামী ৩০ বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে পরমাণু শক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রযুক্তি ও উপকরণ সরবরাহ করবে, পরামর্শ সহায়তা দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সৌদি আরব প্রদান করবে কয়েক হাজার কোটি ডলার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন পরেই চুক্তির খসড়া যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্ট কংগ্রেসে উত্থাপন করা হবে এবং কংগ্রেসের দুই কক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং সিনেটে পাস হলে সেটি কার্যকর করা হবে। কংগ্রেসে চুক্তির খসড়ার সঙ্গে ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’ নামের একটি নথিও পাঠানো হবে। সেই নথিটি বিদেশি রাষ্ট্রেগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু সহযোগিতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

এই চুক্তিটি কার্যকর হলে স্বাভাবিকভাবেই সৌদির পরমাণু শক্তি এবং বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচিতে বিনিয়োগের দুয়ার মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য উন্মুক্ত হবে।

ট্রাম্পের অনুমোদিত চুক্তিতে ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ নীতি অন্তর্ভুক্ত নেই। সৌদি আরব যদি চায়— তাহলে এই চুক্তির মধ্যে থেকেই পরমাণু বিশুদ্ধকরণ এবং খরচ হওয়া পরমাণু জ্বালানির পুণঃপ্রক্রিয়াকরণ কার্যক্রম চালু রাখতে পারবে।

এছাড়া এ চুক্তিতে ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ নীতিও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ‘অতিরিক্ত প্রটোকল’ হলো এমন একটি নীতি— যার আওতায় জাতিসংঘের পরমাণু প্রকল্প পর্যবেক্ষণ বিষয়ক অঙ্গসংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক অ্যানার্জি অথরিটি (আইএইএ) যে কোনো সময়ে যে কোনো দেশের পরমাণু প্রকল্পের কর্মসূচি পরিদর্শন করতে পারবে। যে কোনো দেশের বেসামরিক পরমাণু প্রকল্প চুক্তিতে অতিরিক্ত বা অ্যাডিশনাল প্রটোকলের অন্তর্ভুক্তি প্রায় অপরিহার্য।

কিন্তু ট্রাম্পের অনুমোদিত চুক্তির খসড়ায় বলা হয়েছে, এই প্রকল্পের সুরক্ষা ব্যবস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিকভাবে নির্ধারণ করা হবে।

অর্থাৎ কংগ্রেসে এই চুক্তির খসড়া পাশ হলে ইউরেনিয়াম ক্রয় ও সমৃদ্ধ করার পথে সৌদির কোনো বাধা থাকবে না। বিশেষজ্ঞরা ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে কঠোর সুরক্ষা ব্যবস্থা আরোপ করা না হলে এই চুক্তি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুলে দিতে পারে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এর আগে একাধিকবার বলেছেন যে, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করলে সৌদি আরবও নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করবে।

পরমাণু বোমা তৈরির দু’টি প্রধান ধাপ হলো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ এবং প্লুটোনিয়াম পুণঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ। বেসামরিক পারমাণবিক চুল্লি পরিচালনাকারী বেশিরভাগ দেশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদনের পরিবর্তে কঠোর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের অধীনে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি করে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া অভ্যন্তরীণভাবে সমৃদ্ধকরণের অনুমতি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।

সূত্র : ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল, রয়টার্স, ইন্ডিয়া টুডে




বিক্ষোভে উত্তাল ভারত, দিল্লি অভিমুখে শত শত কৃষক

বিক্ষোভে উত্তাল ভারত, দিল্লি অভিমুখে শত শত কৃষক
ছবি সংগৃহীত।

প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে মহাসমাবেশে অংশ নিতে দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করেছেন ভারতের শত শত কৃষক। পাঞ্জাব থেকে যাত্রা করা এসব কৃষককে হরিয়ানায় প্রবেশের পথে শম্ভু সীমান্তে আটকে দিয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে ব্যারিকেড দেওয়ার এ ঘটনা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির ‘দিল্লি চলো-২’ আন্দোলনের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সে সময় কৃষকদের রাজধানীতে প্রবেশ ঠেকাতে কংক্রিটের ব্লক, লোহার পেরেক এবং কয়েক স্তরের ব্যারিকেড দিয়ে সীমান্তটিকে দুর্গে পরিণত করা হয়েছিল।
এনডিটিভি জানিয়েছে, যাতায়াতের সুযোগ না পেয়ে কৃষকেরা শম্ভু সীমান্তে সমাবেশ করেন। এ সময় তারা দিল্লিতে সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার দমনের জন্য হরিয়ানা ও পাঞ্জাব উভয় সরকারকেই অভিযুক্ত করেন।

বিকেইউ শহীদ ভগৎ সিংয়ের নেতা তেজভীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরে ব্যারিকেড তৈরি করেছে। পাঞ্জাব সরকার এই পদক্ষেপ প্রতিহত না করে ‘নীরব দর্শকের’ ভূমিকা পালন করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঞ্জাবের কনভয়গুলো থামিয়ে দেওয়া হলেও আম্বালা, কুরুক্ষেত্র ও পার্শ্ববর্তী জেলাসহ হরিয়ানার কৃষকেরা দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।

‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশে কেন্দ্রের কাছে প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলের দাবি জানাতে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের কৃষক সংগঠনগুলো একত্রিত হয়েছে।

কিষাণ মজদুর সংগ্রাম কমিটি (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের বলেন, শম্ভু সীমান্তে থামার আগে কেএমএসসি, কিষাণ মজদুর মোর্চা (পাঞ্জাব অধ্যায়), আজাদ কিষাণ মোর্চা এবং বিকেইউ একতা সংগ্রামের বহরগুলো রাজধানী অভিমুখে রওনা দেয়।

পান্ধের বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তিটি একটি প্রচলিত বাণিজ্য চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি। এটি কৃষি, দুগ্ধ, শিল্প, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, বিনিয়োগ, সরকারি ক্রয়, মেধাস্বত্ব অধিকার এবং সেবা খাতের মতো বিষয়ে আলোচনার পথ খুলে দিতে পারে।

কৃষক নেতারা বলছেন, পূর্ববর্তী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, ইথানল, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য, পোলট্রি ও মৎস্যপণ্যের মতো খাতে কম শুল্ক এবং বিধিনিষেধ শিথিলের মাধ্যমে ভারতের কৃষি ও দুগ্ধবাজারে আরও গভীর প্রবেশাধিকারের জন্য ধারাবাহিকভাবে আহ্বান জানানো হয়েছে।

তারা বলছেন, ভর্তুকিপ্রাপ্ত মার্কিন কৃষি ও দুগ্ধজাত পণ্যের জন্য ভারতের বাজার উন্মুক্ত করে দিলে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ভারতীয় কৃষক প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। তারা আলোচনাকে ঘিরে স্বচ্ছতার অভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং অভিযোগ করেছেন, প্রস্তাবিত চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

সংগঠনগুলো বলেছে, ভারতের শুধু দুগ্ধ খাতই প্রায় ৮ কোটি গ্রামীণ পরিবারের জীবিকার উৎস। এ খাতে যেকোনো বিরূপ প্রভাব সমগ্র গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে। এতে দুগ্ধ উৎপাদনকারী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

দেশ বাঁচাও মোর্চা প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তিসংক্রান্ত সব নথি অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে।