ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি : মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩৯ অপরাহ্ন

ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি : মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত

ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানি : মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত
ছবি সংগৃহীত।

ইউরোপের বাজারে পোশাক রপ্তানিতে মন্দা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) ইইউর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কিছুটা কমলেও, বছরের মাঝামাঝি সময়ে এসে ক্রয়াদেশ ও আমদানির গতি পুনরায় বাড়তে শুরু করেছে।

বিশ্ববাজারের এই ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু লক্ষণ দেখাচ্ছে, যদিও গত বছরের সার্বিক প্রান্তিকের তুলনায় তা এখনো কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে।

পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইউরোস্ট্যাট’-এর তথ্যের ভিত্তিতে ‘বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস’ (বিএভি) সংকলিত প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইইউর মোট পোশাক আমদানির মূল্য ছিল ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরো, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৮৩ শতাংশ কম। আমদানির মোট পরিমাণ ছিল ৩০৬ কোটি ৭৫ লাখ ৭০ হাজার কেজি (২.৫৭ শতাংশ হ্রাস)। একই সময়ে প্রতি কেজি পোশাকের গড় আমদানি মূল্য ১.২৯ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৬৫ ইউরোতে।

বিএভির হিসাব অনুযায়ী, মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত চার মাসে আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ বছরের শুরুতে তৈরি হওয়া নেতিবাচক প্রবণতা ধীরে ধীরে কমেছে এবং মাঝামাঝি সময়ে বাজারে কিছুটা পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

এই পতনের পেছনে আগের বছরের তুলনামূলক উচ্চ আমদানির ভিত্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০২৫ সালে ইইউর পোশাক আমদানি ২ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছেছিল। একই বছরে ইইউর অর্থনীতি বেড়েছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের মুখে চীন ইউরোপের বাজারে বেশি পণ্য পাঠায়। ২০২৫ সালে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ১১ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়েছিল। ফলে ২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপীয় খুচরা বিক্রেতাদের হাতে আগের বছরের তুলনায় বেশি মজুত ছিল।


বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতনের প্রধান কারণ রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়া নয়, বরং পোশাকের একক মূল্য হ্রাস। অর্থাৎ আগের তুলনায় কম দামে পোশাক রপ্তানি করায় মোট রপ্তানি আয় বেশি কমেছে। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে


এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের সঙ্গে সম্পর্কিত জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ইউরোপের অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করে। ২০২৬ সালে ইইউতে মূল্যস্ফীতি ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ভোক্তাদের আস্থা ৪০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং আগে থেকে জমে থাকা পণ্যের মজুতের কারণে খুচরা বিক্রেতারা নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দেন। এর প্রভাব পড়ে জানুয়ারির আমদানিতে, যা এক মাসেই আগের বছরের তুলনায় ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ কমে যায়।

তবে বছরের মাঝামাঝি সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। বছরের শুরুর দিকে ক্রয়াদেশ কমানোর পর খুচরা বিক্রেতারা মজুত পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন। জুন-আগস্ট সময়ে শরৎ ও শীত মৌসুমের পোশাক ইউরোপে পৌঁছানোর বিষয়টিও আমদানি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। বসন্তে খুচরা বিক্রিও তুলনামূলক ভালো ছিল। মে মাসে ইইউর খুচরা বিক্রির পরিমাণ আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল। এতে নতুন করে ক্রয়াদেশ দেওয়ার প্রবণতা জোরদার হয়। বছরের শুরুতে পিছিয়ে যাওয়া কিছু চালানও পরবর্তী সময়ে ইউরোপে পৌঁছায়।

বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১১.৬৭ শতাংশ

ইইউর বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিও বছরের শুরুতে বড় ধাক্কা খেয়েছিল। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ে রপ্তানি কমেছিল ১৯ শতাংশ। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আগস্ট পর্যন্ত বছরওয়ারি হিসাবে রপ্তানির পতন ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

 

ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ, যার রপ্তানির মূল্য ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ১৯৭১ কোটি ইউরো হয়েছে। ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে চীনের অংশও ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে


২০২৬ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির মূল্য ছিল ১১৯৩ কোটি ইউরো। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৩৫০ কোটি ইউরো। অর্থাৎ এক বছরে রপ্তানি আয় কমেছে ১৫৭ কোটি ইউরো।

এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইইউতে পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কমে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি হয়েছে। অন্যদিকে প্রতি কেজি পোশাকের গড় রপ্তানিমূল্য কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরোতে।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের পতনের প্রধান কারণ রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়া নয়, বরং পোশাকের একক মূল্য হ্রাস। অর্থাৎ আগের তুলনায় কম দামে পোশাক রপ্তানি করায় মোট রপ্তানি আয় বেশি কমেছে। একই সময়ে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

চীনের দখলদারিত্ব বাড়ছে ইউরোপের বাজারে

ইইউর প্রধান পোশাক সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে চীনই একমাত্র দেশ, যার রপ্তানির মূল্য ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে চীনের পোশাক রপ্তানি ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়ে ১৯৭১ কোটি ইউরো হয়েছে। ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে চীনের অংশও ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

ভিয়েতনামের রপ্তানি আয় বেড়েছে ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ, যার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি ইউরো। দেশটির রপ্তানিতে প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১০ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে।

অন্যদিকে পাকিস্তান পোশাক রপ্তানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়াতে পারলেও প্রতি কেজির গড় রপ্তানিমূল্য ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ কমিয়েছে। দেশটির প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮৮ ইউরো, যা প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

এ ছাড়া তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার ইইউতে পোশাক রপ্তানির মূল্য প্রতিটি দেশের ক্ষেত্রে প্রায় ১১ শতাংশ কমেছে। ফলে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতায় দেশভেদে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। চীন বাজারের অংশ বাড়াচ্ছে, ভিয়েতনাম তুলনামূলক বেশি দামে পণ্য রপ্তানি করছে, আর বাংলাদেশকে রপ্তানি আয় ও বাজার হিস্যা, দুই ক্ষেত্রেই চাপ মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

২০২৭ সালে পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা, তবে ঝুঁকিও রয়েছে

ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে ইইউর মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৭ সালে তা বেড়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করা হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নামতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য জ্বালানির দাম স্থিতিশীল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

 

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত চলতি বছরে ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থেকে আনুমানিক ০ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট কমিয়ে দিয়েছে। তেলের ট্যাংকারে হামলার ঘটনা সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। এতে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন ও বিমা ব্যয় উঁচু পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। জ্বালানির দাম বেশি থাকলে ২০২৭ সালে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ব্যাহত হতে পারে বলে সতর্ক করেছে ইউরোপীয় কমিশন।

এ ছাড়া ইউরোপের ভোক্তা ব্যয় ও খুচরা বিক্রিও পোশাক আমদানির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় প্রায় দেড় হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই দিন পোশাকের দোকানগুলোর আয় গড়ে ১৪ শতাংশ কমে যায়। বছরের শেষভাগের কেনাকাটার মৌসুমের ঠিক আগে এ ঘটনা খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।

বড়দিনকেন্দ্রিক কেনাকাটা প্রত্যাশার চেয়ে দুর্বল হলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে ইউরোপীয় ক্রেতারা নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন। তেমনটি হলে বাংলাদেশের রপ্তানি পুনরুদ্ধারও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

নতুন বাণিজ্যনীতিতে বাড়বে প্রতিযোগিতা

২০২৭ সালের জানুয়ারিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) বিধিমালা কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। একই সময়ে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এ দুটি নীতিগত পরিবর্তন ইউরোপের পোশাক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ভারত-ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হলে ভারতীয় রপ্তানিকারকদের জন্য ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি জিএসপি বিধিমালার পরিবর্তনও বাংলাদেশের বাজারসুবিধা ও প্রতিযোগিতার অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে আগামী দিনে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে মূল্য প্রতিযোগিতা, পণ্যের গুণগত মান এবং সরবরাহ সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসের তথ্য ইউরোপের পোশাক বাজারে ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। বছরের শুরুতে দুর্বল চাহিদা, উচ্চ মজুত ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি আমদানিতে চাপ তৈরি করেছে। পরবর্তী সময়ে ক্রয়াদেশ বাড়ার লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের রপ্তানি আয়, একক মূল্য ও বাজার হিস্যায় পতন উদ্বেগের কারণ। এরসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চীনের শক্তিশালী অবস্থান, সম্ভাব্য দুর্বল বড়দিনের বিক্রি এবং ২০২৭ সালের নতুন বাণিজ্যনীতির প্রভাব।




ভরিতে সোনার দাম কমলো ২১৫৮ টাকা

ভরিতে সোনার দাম কমলো ২১৫৮ টাকা
ছবি সংগৃহীত।

দেশের বাজারে সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে। সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার গহনার দাম কমানো হয়েছে ২ হাজার ১৫৮ টাকা। এতে ভ্যাটসহ ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা।

স্থানীয় বাজারে তেজাবী সোনার দাম কমায় এই দাম কমানো হয়েছে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে এই দাম কার্যকর হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস)।

শুক্রবার বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটি বৈঠকে করে এই দাম কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পরে কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

এর আগে গতকাল ২২ অক্টোবর ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হয় ১ হাজার ৬৯১ টাকা। তার আগে ১৩ অক্টোবর ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমানো হয় ৩ হাজার ২৬৬ টাকা। এতে তিন দফায় ভালো মানের এক ভরি সোনার গহনার দাম কমলো ৭ হাজার ১১৫ টাকা।

এখন, ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ২৪ হাজার ১৮২ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ২ হাজার ৯৯ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৪ হাজার ৯৩ টাকা।

এছাড়া, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৮০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৮৮৩ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৪৫৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার ২৩২ টাকা।

এর আগে, ২২ অক্টোবর সকাল ১০টা থেকে ভ্যাটসহ সবচেয়ে ভালো মানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৬৯১ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ২৬ হাজার ৩৪০ টাকা। ২১ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৫৭৫ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯২ টাকা।

এছাড়া, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ৩৪১ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৬৯১ টাকা। আর সনাতন পদ্ধতির প্রতি ভরি সোনার গহনার দাম ১ হাজার ১০৮ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৯০ টাকা। আজ সকাল ৯টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত এই দামেই সোনার গহনা বিক্রি হয়।

সোনার গহনার দাম কমানোর পাশাপাশি রুপার গহনার দামও কমানো হয়েছে। ভ্যাটসহ ২২ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ৩২৬ টাকা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৯ টাকা। এছাড়া ২১ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৩ হাজার ৬৭৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের এক ভরি রুপার গহনার দাম ১৭৫ টাকা কমিয়ে ৩ হাজার ১৪৯ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির এক ভরি রুপার গহনার দাম ১১৭ টাকা কমিয়ে ২ হাজার ৩৯১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।




সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট

সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকিতে বন্ধ বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট
ছবি সংগৃহীত।

জরুরি নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) ওয়েবসাইটটিতে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটি থেকে সম্ভাব্য সাইবার হামলার ঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘জরুরি নিরাপত্তা সমস্যার কারণে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত ও সমাধানে কাজ চলছে। ঝুঁকি পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সতর্কতা তৈরি হয়েছে। এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য হামলাকারীরা দূর থেকে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারে। এতে সার্ভারের ফাইল, ডেটাবেজ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি পিএইচপিভিত্তিক আরও কিছু ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে কোনো সাইবার হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা। বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন সেবা পরিচালনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহার করা হলেই সেটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে না। ব্যবহৃত সংস্করণ, নিরাপত্তা হালনাগাদ এবং সার্ভারের সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট সার্ভারে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ করা জরুরি। তাৎক্ষণিকভাবে ত্রুটি সংশোধন সম্ভব না হলে ফায়ারওয়াল ব্যবহার, অননুমোদিত সংযোগ সীমিত করা এবং প্রয়োজনে সার্ভার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য ও অনলাইন সেবা ব্যবহারে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে। তবে ওয়েবসাইটটি কখন পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানা যায়নি।




উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ, রিজার্ভে দ্বিগুণ চাপ

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ঋণ শোধের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ, রিজার্ভে দ্বিগুণ চাপ
ছবি সংগৃহীত।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি, মন্থর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের বাড়তি চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি নেমে আসতে পারে ৩.২ শতাংশে। বিপরীতে আগামী পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।

ফলে আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং রিজার্ভের পর্যাপ্ততা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক প্রতিবেদনে বলছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এ হার বাস্তবায়িত হলে ১৯৮৮-৮৯ অর্থবছরের পর দেশের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি হবে। একই প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস ১০. ৯ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৮ দশমিক ৭ শতাংশের চেয়ে বেশি।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩১.৫৮ বিলিয়ন ডলার।

রিজার্ভের এই অবস্থান তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি দিলেও আগামী বছরগুলোতে ঋণ পরিশোধের বাড়তি দায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি করতে পারে।

পাঁচ বছরে ঋণ পরিশোধ প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠছে বিদেশি ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) প্রতিবেদনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশকে প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে। এর মধ্যে মূল ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ১৮ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন ডলার এবং সুদ ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে ৪ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর প্রাক্কলন করা হয়েছিল। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা ৪ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এরপর ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস রয়েছে।

অবকাঠামো ও বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে নেওয়া বিদেশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হওয়ায় এই চাপ বাড়ছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা রেল সংযোগ, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা মেট্রোরেল এবং বিমানবন্দর সম্প্রসারণসহ বড় প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থায়ন নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্পের কিছু ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হওয়া বা শেষ হওয়ার পর্যায়ে থাকায় মূল ঋণ পরিশোধের দায় বাড়ছে বলে ইআরডির তথ্যের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঋণ পরিশোধের এই অঙ্ক শুধু সরকারি বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করে না; বিদেশি ঋণের অর্থ ডলারে পরিশোধ করতে হওয়ায় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তবে ঋণের কিস্তি কোন উৎস থেকে পরিশোধ হচ্ছে, সরকারি ও বেসরকারি খাতের দায় কতটা এবং একই সময়ে নতুন ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তা কত আসছে। এসব হিসাব বিবেচনায় না নিয়ে শুধু মোট ঋণ পরিশোধের অঙ্ক দিয়ে রিজার্ভের ওপর চাপের পূর্ণ চিত্র নির্ধারণ করা যায় না।

মূল্যস্ফীতি বাড়লে আমদানি ব্যয়েও চাপ

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যার মানে হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ জ্বালানি তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, সার, ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয়ও বাড়তে পারে। একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতেও বেশি ডলার প্রয়োজন হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়। আবার টাকার অবমূল্যায়ন হলে আমদানিকারকদের স্থানীয় মুদ্রায় ব্যয় আরও বেড়ে যায়।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বাড়লে শুধু আমদানি ব্যয়ই বাড়ে না; পরিবহন ও উৎপাদন খরচের মাধ্যমে তা অন্যান্য পণ্যের দামেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রিজার্ভের ওপর প্রকৃত চাপ নির্ধারণে আন্তর্জাতিক মূল্য পরিবর্তনের পাশাপাশি আমদানির পরিমাণ, সরবরাহকারীদের সঙ্গে চুক্তি, মূল্য পরিশোধের সময়সূচি এবং বিনিময় হারও বিবেচনা করতে হবে।

চাল, পেঁয়াজ, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো পণ্যের দেশীয় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে আমদানি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। বাজারদর নিয়ন্ত্রণে শুল্ক কমানো বা আমদানি সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি থাকলে এবং ডলারের বিনিময় হার প্রতিকূলে থাকলে আমদানিকারকের ব্যয় পুরোপুরি কমে না। প্রতিবেদন অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা ব্যবস্থাপনা, দুটি বিষয়ই নীতিনির্ধারকদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রবৃদ্ধি কমলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ঝুঁকি

আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। সংস্থাটি গত এপ্রিলে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৩ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। নতুন পূর্বাভাসে প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা কমে যাওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের গতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রবৃদ্ধি কমে গেলে রপ্তানি আয় বা বিদেশি বিনিয়োগ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। তবে উৎপাদন, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক চাহিদায় দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা দেখা দিলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর ঝুঁকি বাড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে চাহিদা দুর্বল হলে অথবা উৎপাদন ব্যয় বেড়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমলে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবাসী আয়ও বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাড়লে বৈদেশিক লেনদেনে স্বস্তি তৈরি হয়। তবে রেমিট্যান্সের প্রবাহ ধরে রাখতে বৈধ পথে অর্থ পাঠানো সহজ করা, বিনিময় হারে বাস্তবসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রণোদনা কমানো গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসার পরিবেশ, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের আস্থা এবং মুনাফা প্রত্যাবাসনের সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা থাকলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বিলম্বিত হতে পারে। ফলে রিজার্ভের স্থিতিশীলতার জন্য শুধু আমদানি কমানোর ওপর নির্ভর না করে রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বিনিয়োগ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

বৈদেশিক ঋণে আতঙ্ক

আগামী পাঁচ বছরে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের প্রাক্কলন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। তবে এই অঙ্ককে এককভাবে ঋণসংকট বা রিজার্ভ ফুরিয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইআরডির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৯-৩০ অর্থবছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধের পরিমাণ প্রায় ২৫ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন ডলার। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৯-৩০ অর্থবছরে বার্ষিক ঋণ পরিশোধের দায় ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উঠতে পারে।

ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়, ঋণের শর্ত, সুদের হার, মেয়াদ, নতুন ঋণপ্রবাহ এবং সরকারি রাজস্বের ওপর। দীর্ঘমেয়াদি ও সহজ শর্তের ঋণ এবং স্বল্পমেয়াদি বাণিজ্যিক ঋণের ঝুঁকি এক নয়। তাই নতুন ঋণ নেওয়ার আগে প্রকল্পের অর্থনৈতিক সুফল, ভবিষ্যৎ বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বিবেচনা করা জরুরি।

একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ দিয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে প্রত্যাশিত উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন সুবিধা ও অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। প্রকল্পের সুফল ও ঋণ পরিশোধের দায়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে ভবিষ্যৎ বাজেট ও বৈদেশিক লেনদেন ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়তে পারে বলছে আইএমএফ।

রিজার্ভের ওপর চাপ কতটা

বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ অক্টোবরের হিসাবে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলার। তবে আইএমএফের বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ ছিল ৩১ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ হিসাব পদ্ধতির পার্থক্যে দুই অঙ্কের মধ্যে প্রায় ৪ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবধান রয়েছে।

প্রবাসী আয় ও রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসা রিজার্ভের জন্য যেমন ইতিবাচক, তেমনি আমদানি ব্যয় ও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য ডলার বেরিয়ে যায়। ফলে রিজার্ভের স্থিতি নির্ভর করে বৈদেশিক মুদ্রা আসা ও বেরিয়ে যাওয়ার সামগ্রিক ভারসাম্যের ওপর। রেমিট্যান্স বাড়লেই যে রিজার্ভের ওপর সব ধরনের চাপ দূর হবে, তা নয়, একইভাবে ঋণ পরিশোধের অঙ্ক বাড়লেই রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে। এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

যে কারণে রিজার্ভের ওপর চাপ সামাল দিতে প্রথমেই বৈদেশিক মুদ্রার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে টেকসই ভারসাম্য তৈরি করা প্রয়োজন। এজন্য রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, প্রবাসী আয় বৈধ পথে আনা এবং বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে আইএমএফ প্রতিবেদনে।

দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। কোন বছরে কত ঋণের আসল ও সুদ পরিশোধ করতে হবে, কোন প্রকল্প থেকে কী ধরনের অর্থনৈতিক সুফল আসবে এবং নতুন ঋণ নেওয়ার ফলে ভবিষ্যৎ দায় কতটা বাড়বে। এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার। ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু তাৎক্ষণিক অর্থের প্রয়োজন নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সক্ষমতাও বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয়ত, আমদানি ব্যবস্থাপনায় অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের চাহিদা কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি, শিল্পের কাঁচামাল, কৃষি উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ সচল রাখতে হবে। নির্বিচারে আমদানি সংকোচন করলে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। তাই অগ্রাধিকার নির্ধারণে সতর্ক নীতি প্রয়োজন।

চতুর্থত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় জরুরি। বাজার তদারকি, সরবরাহব্যবস্থা উন্নয়ন, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ বাড়ানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা উন্নত করলে অর্থনীতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা জোরদারের ওপর জোর দিয়েছে আইএমএফ।

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জটি শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অঙ্ক ধরে রাখা নয়; বরং উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং প্রবৃদ্ধির দুর্বলতার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ভারসাম্য তৈরি করা। রিজার্ভের পর্যাপ্ততা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি ও কার্যকর সংস্কারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আইএমএফ বার্ষিক প্রতিবেদনে।