আলীকদমে পাহাড় কেটে অবৈধ ইটভাটা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম

বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পাহাড় কেটে, বনজ গাছ পুড়িয়ে এবং শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে লাগিয়ে অবৈধভাবে ইটভাটা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ি বনাঞ্চলে এসব পরিবেশবিধ্বংসী কার্যক্রম চলছে।
উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সরকারের কোনো অনুমোদন ছাড়াই গহিন পাহাড়ি এলাকায় এসব ইটভাটা গড়ে তোলা হয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আলীকদম-থানচি সড়কের পাশে উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে কয়েকটি ইটভাটা। সেখানে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সী অন্তত ৯ থেকে ১০ জন শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত থাকতে দেখা গেছে। কেউ কাঁচা ইট তৈরি করছে, কেউ ইট বহন করছে, আবার কেউ চুল্লির কাজে ব্যস্ত।
ভাটার পাশে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ বনজ গাছ মজুত রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব গাছ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হচ্ছে।
ইটভাটায় কাজ করা ১২ বছরের শিশু মোহাম্মদ হৃদয় জানায়, তার বাড়ি নোয়াখালীর আমিন বাজার এলাকায়। সাত মাস আগেও সে স্কুলে পড়ত। এখন অভাবের সংসারে হাল ধরতে ইটভাটায় কাজ করছে। হৃদয় বলে, "আগে স্কুলে যেতাম। এখন এই কাজই করতে হয়।"
আরেক শিশুশ্রমিক দেলোয়ার হোসেন জানায়, সেও কয়েক বছর আগে স্কুল ছেড়ে ইটভাটায় কাজ শুরু করে। তার ভাষায়, "পড়াশোনা করতে ইচ্ছা করে, কিন্তু পরিবারের ভরণপোষণ চালানো সম্ভব হচ্ছে না; এখন কাজ ছাড়া উপায় নেই।"
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, “ইউবিএম” নামে একটি ইটভাটা পরিচালনা করছেন আলীকদম উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। আর “এফবিএম” ভাটাটি পরিচালনা করছেন রাঙ্গুনিয়ার আওয়ামী লীগ নেতা শওকত তালুকদার।
বর্তমানে মালিকরা আত্মগোপনে থাকায় ম্যানেজারদের মাধ্যমে ভাটাগুলো পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইউবিএম ভাটার ম্যানেজার মোহাম্মদ হোসেন বলেন, "মালিকের নির্দেশনা অনুযায়ী ভাটা পরিচালনা করছি। ভাটাটি বৈধ নাকি অবৈধ, সেটি মালিক জানেন।"
এফবিএম ভাটার ম্যানেজার মো. খালেদও একই ধরনের বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, "সবকিছু মালিকের নেতৃত্বে চলে।"
তবে আত্মগোপনে থাকা ইটভাটা মালিকদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। একাধিকবার কল করলেও তাঁদের ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক নূর হাসান সজীব বলেন, "বান্দরবানের পাহাড়ি এলাকায় থাকা সব ইটভাটাই অবৈধ। পাহাড় কাটা, বনজ গাছ পোড়ানো এবং শিশুশ্রম—সবই আইন লঙ্ঘনের শামিল।" তিনি জানান, এর আগেও কয়েকবার এসব অবৈধ ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। আবারও খুব শিগগিরই অবৈধ ইটভাটা ও শিশুশ্রম বন্ধে অভিযান চালানো হবে।
লামা বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "ইটভাটাগুলোতে যে কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলো প্রাকৃতিক বনের গাছ হলেও তা বন বিভাগের নিয়ন্ত্রিত এলাকার নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খাসজমি থেকে গাছ কেটে এসব কাঠ সংগ্রহ করা হয়েছে। অবৈধভাবে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগে এর আগেও একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করেছে বন বিভাগ।"
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুরুর আলম বলেন, "এসব ইটভাটার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। আগেও অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে—এই তথ্য আগে জানা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"









