আইযুব বাচ্চু'র গান বিকৃত করে প্রকাশিত ট্রিবিউট এলবাম " উওরাধিকার" প্রত্যাহার এর দাবীতে Voice For AB
শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ন

আইযুব বাচ্চু'র গান বিকৃত করে প্রকাশিত ট্রিবিউট এলবাম " উওরাধিকার" প্রত্যাহার এর দাবীতে Voice For AB

আইযুব বাচ্চু'র গান বিকৃত করে প্রকাশিত ট্রিবিউট এলবাম " উওরাধিকার" প্রত্যাহার এর দাবীতে Voice For AB
ছবি সংগৃহীত।

কিংবদন্তী আইযুব বাচ্চু'র গান বিকৃত করে সাম্প্রতি প্রকাশিত ট্রিবিউট এলবাম  " উওরাধিকার" প্রত্যাহার এর দাবীতে, বুধবার চট্টগ্রাম নগরীর একটি অভিজাত রেষ্টুরেন্টে Voice For AB একটি আলোচনা সভার আয়োজন করে, উক্ত আলোচনা সভায় Voice For AB এর সকল সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন। আলোচনা সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় আগামী শুক্রবার বিকেল পাঁচটায় চট্টগ্রাম, প্রবর্তক মোড়, আইয়ুব বাচ্চু গিটার চত্বরে চট্টগ্রামের সকল ব্যান্ডের সদস্যগণ এবং গান পিপাসুরা সম্মিলিত হবেন।

বক্তব্যে তারা আর ও বলেন,আমাদের দেশের কিংবদন্তি রকস্টার আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টির মর্যাদা রক্ষা করতে, আমরা একত্রিত হয়েছি কোনো বিরোধিতা করতে নয়,আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়, তিনি আমাদের সংগীত ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। তাঁর গান, তাঁর সুর, তাঁর গিটার কোটি মানুষের আবেগ, ভালোবাসা এবং স্মৃতির অংশ। কোনো গুণী শিল্পীর গান নতুন প্রজন্ম গাইবে, কভার করবে-এটাই স্বাভাবিক এবং আমরা সেটিকে স্বাগত জানাই। কিন্তু কভার করার নামে যদি গানের মৌলিক সুর, আবেগ, সংগীতের মান এবং শিল্পের সৌন্দর্য নষ্ট হয়, তাহলে তা শুধু একটি গানকে নয়, একজন কিংবদন্তি শিল্পীর উত্তরাধিকারকেও অসম্মান করে। আমাদের দাবি খুব স্পষ্ট। আইয়ুব বাচ্চুর গান কভার করতে হলে সেই গানের সুর, মেলোডি, সংগীতের গুণগত মান এবং শিল্পমান যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। যারা এই গান পরিবেশন করবেন, তাদের সেই যোগ্যতা, প্রস্তুতি এবং উপযুক্ত চর্চা থাকতে হবে, যাতে গানটি সম্মানের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়।
যদি কোনো প্রকাশিত সংস্করণে এমন ত্রুটি থাকে যা গানকে বিকৃত করে এবং শ্রোতাদের কাছে শিল্পীর কাজকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে, তাহলে সেগুলো পর্যালোচনা করে সেই কাজগুলোকে সকল অনলাইন ও অফলাইন প্লাটফর্ম থেকে প্রত্যাহার করতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আমরা কাউকে ছোট করতে চাই না। আমরা শুধু চাই, কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর মতো একজন মহান শিল্পীর সৃষ্টি যেন সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে পরিবেশিত হয়। আজকের এই প্রতিবাদ কোনো নেতিবাচক আন্দোলন নয়। এটি একজন কিংবদন্তির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ। এটি বাংলাদেশের সংগীতের মান রক্ষার আহ্বান। আসুন, আমরা সবাই মিলে প্রতিজ্ঞা করি- বাংলা গানের ঐতিহ্য, আমাদের কিংবদন্তিদের সৃষ্টি এবং সংগীতের মর্যাদা রক্ষায় আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব।
আমরা বিশ্বাস করি, মরহুম আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানানো মানে শুধু তাঁর গান কভার করা নয়। একজন কিংবদন্তিকে সত্যিকারের অর্থে সম্মান জানাতে হলে তাঁর আদর্শ, তাঁর সংগীতচর্চা এবং তাঁর সৃষ্টিশীল চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
যদি বাচ্চু ভাইয়ের স্মরণসভা, গীটার প্রদর্শনী বা নিম্নমানের কভার তৈরি করার পেছনে অর্থ ও সময় ব্যয় করা হয়, তাহলে সেই একই অর্থ ও উদ্যোগ আরও মহৎ কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। আমরা চাই, কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর নামে একটি সংগীত ইনস্টিটিউট, মিউজিক একাডেমি বা স্কুল গড়ে উঠুক, যেখানে নতুন প্রজন্মের গিটারিস্ট, ড্রামার, কিবোর্ডিস্ট, কম্পোজার, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও কণ্ঠশিল্পীরা মানসম্মত প্রশিক্ষণ নিতে পারে। আজ যদি এমন একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ জনও প্রকৃত অর্থে দক্ষ মিউজিশিয়ান বের হয়ে আসে, সেটাই হবে আইয়ুব বাচ্চুর প্রতি সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি। কারণ একজন কিংবদন্তির প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর গানকে বিকৃত করা নয়; তাঁর স্বপ্ন, তাঁর সংগীতের দর্শন এবং তাঁর মানকে আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
তাই আমাদের আহ্বান, শুধু আবেগ নয়, স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হোক। এমন উদ্যোগ নেওয়া হোক, যা আগামী ২০, ৩০ বা ৫০ বছর পরেও বলবে- আইয়ুব বাচ্চু শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে দিয়ে গেছেন। আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি- আইয়ুব বাচ্চুর গানকে শুধু গেয়ে নয়, তাঁর সংগীত দর্শন ধারণ করে, নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে তাঁর উত্তরাধিকার রক্ষা করব। এটাই হবে তাঁর প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধা।




কবিতায়, স্মৃতিতে কবি নজরুলের চট্টগ্রাম

কবিতায়, স্মৃতিতে কবি নজরুলের চট্টগ্রাম
ছবি সংগৃহীত।

পাহাড়, সমুদ্র আর নদীর শহর চট্টগ্রাম শুধু ইতিহাসের নয়, এটি কবিতারও ভূখণ্ড। এই শহরের নীল আকাশ, সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের নিসর্গ আর মানুষের প্রাণস্পন্দন একদিন মুগ্ধ করেছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে। তাঁর পদধূলিতে চট্টগ্রামের মাটি পেয়েছিল অন্য এক মহিমা, আর সৃষ্টিতে চট্টগ্রাম পেয়েছিল অমর উপস্থিতি।

১৯২৬ সালের জুলাই মাসে প্রথম চট্টগ্রামে এসেছিলেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের নেতা কবির বন্ধু হাবিবুল্লাহ বাহারের দাওয়াত এবং কলেজের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। আন্দরকিল্লায় শাহী জামে মসজিদে এক সভায়ও যোগ দেন কবি নজরুল। অনুষ্ঠানে তাঁকে ‘কবি সম্রাট’ উপাধি দেওয়া হয়। পাঠ করা হয় একটি ঘোষণাপত্র- ‘এই সভা ঘোষণা করিতেছে যে, কবি নজরুল ইসলাম বাংলার মুসলমান সমাজের রত্নস্বরূপ’।

কলকাতা থেকে এসে কবি জেলা প্রশাসকের ডাকবাংলোতে ওঠেন। হাবিবুল্লাহ বাহার ও তাঁর বোন শামসুননাহার মাহমুদ কবিকে তাঁদের বাসায় নিয়ে যান। চট্টগ্রাম কলেজে কবির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যক্ষ কামাল উদ্দিন। এরপর সীতাকুণ্ডে ও জেএম সেন স্কুলে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ওই সময় কবি আন্দরকিল্লা জামে মসজিদ, মুসলিম হল, সীতাকুণ্ড পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় বেড়াতে গিয়েছিলেন।

প্রথমবার চট্টগ্রাম এসে খুব খুশি হয়েছিলেন কবি নজরুল। বেগম শামসুননাহারের কাছে তিনি চিঠি লিখেছিলেন—

“ফুল যদি কোথাও ফুটে, আলো যদি কোথাও হাসে, সেখানে আমার গান গাওয়ার শোভা পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম এবার চট্টলায়, তাই গেয়েছি গান। কবিকে খুশী করতে হলে দিতে হয় অমূল্য ফুলের সওগাত।”

১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে দ্বিতীয়বার চট্টগ্রামে এসেছিলেন কবি। ‘চট্টগ্রাম এডুকেশন সোসাইটি’ প্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত সভাপতি হিসেবে কবি ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণটি ছিল শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দিক থেকে অনগ্রসর মুসলিম সমাজকে উদ্দেশ্য করে। এছাড়া কাট্টলী চৌধুরী পরিবারে তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় মুসলিম লীগ নেতা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ও মৌলভী তমিজুর রহমানের উদ্যোগে। কাট্টলীর সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবিকে ‘তরুণ মুসলিম নেতা’ হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়।

বুলবুল সমিতির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবি নজরুলকে ‘বাংলার শেলি’ উপাধি দেওয়া হয়। পরে চট্টগ্রামবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে কবি বলেছিলেন—

“কোনোদিন তোমাদের ঋণ পরিশোধ করতে পারব এ ঔদ্ধত্য আমার নেই, সম্বলও নেই। আমি যাযাবর কবি-আমায় ঝুলি ভরে যে পাথেয় দিলে তোমরা, তাই যেন আমার ভাবী পথের সহায় হয়। বিনিময়ে আমি রেখে গেলাম তোমাদের সিন্ধুতে তোমাদের কর্ণফুলীতে আমার দুই বিন্দু অশ্রু। তোমাদের হাতের দানকে চোখের জলে ভিজিয়ে গেলাম।”

ওই সময় কবি পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, ফতেয়াবাদের আলম পরিবারে, সন্দ্বীপে মোজাফফর আহমদের বাড়ি ও শহরের তামাকুমণ্ডি লেনের হাবিবুল্লাহ বাহারের বাসভবন আজিজ মঞ্জিলে বেড়াতে গেছেন। শহরের নন্দনকানন ডিসি হিলে বসে কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা—‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’:

“বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশীথ জাগার সাথী!

ওগো বন্ধুরা, পান্ডুর হয়ে এল বিদায়ের রাতি!

আজ হ’তে হ’ল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি,

আজ হ’তে হ’ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি।”

কবি নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ডিসি হিল স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করে ‘চরণচিহ্ন’। ২০২৬ সালের ১১ মার্চ ডিসি হিলের পূর্বপ্রান্তে জাতীয় কবির স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ‘স্ক্রিপ্ট’-এর উদ্যোগে নির্মিত ‘বল বীর বল উন্নত মম শির’ শিরোনামে এমএস প্লাজমা কাচ দিয়ে কবির পোর্ট্রেট নির্মাণ করা হয়েছে।

১৯৩৩ সালে ৩য় বার চট্টগ্রাম আসেন কবি নজরুল ইসলাম। রাউজানে তরুণ কনফারেন্স ও শিক্ষা সম্মিলনীতে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে যোগদান করেন। এ সময় গরু-ছাগল জবাই করে মেজবান খাওয়ানো হয়। টিকিট কেটে কবিকে দর্শন করেছিলেন উৎসুক জনতা।

রাউজান জলিলনগর বাসস্ট্যান্ড হতে আধা কিলোমিটার দক্ষিণ দিকে হাজী বাড়ি। এই হাজী বাড়িতে ১৯৩৩ সালের ৫ ও ৬ মে এই দুই দিন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের জন্য হাজী বাড়ির উত্তর পাশে ধানি জমির মাঠে রায়মুকুট দীঘির পূর্বপাড়ে বিশাল প্যান্ডেল করা হয় বাঁশের খুঁটি ও ছনের ছাউনি দিয়ে। প্যান্ডেল তৈরিতে সময় লেগেছিল এক মাস। রাউজানবাসী কবি নজরুলকে ‘কাজী দা’ নামে ডাকতেন। ৫ মে সকালে নৌকায় করে হালদা নদী পার হয়ে রাউজানে এলে ঘোড়ার গাড়িতে চড়িয়ে কবিকে হাজী বাড়ি নিয়ে আসা হয়। কবি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন হারমোনিউম ও বাঁশি। পরনে ছিল সাদা পাঞ্জাবি, ধুতি, সাদা গান্ধী টুপি ও জুতা।

প্রথম দিন আলোচনা শেষে বিকেল ৪টার পর কবি তাঁর কবিতা আবৃত্তি করেন। এরপর গেয়েছেন ইসলামিক গান। দ্বিতীয় দিন প্রধান অতিথি হিসেবে ভাষণ দেওয়ার পর কবি হারমোনিউম বাজিয়ে গেয়েছিলেন—

“বাজল কিরে ভোরের সানাই/নিদমহলের আঁধার পুরে।

শুনছি আজান গগনতলে/অতীত রাতের মিনার চূড়ে।”

৭ মে গহিরাবাসী গহিরা স্কুলে তাঁকে তাৎক্ষণিক সংবর্ধনা দেয়। সেখানে ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’সহ বেশ কয়েকটি গান গেয়ে শোনান কবি। সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে হাজী বাড়ির সামনে স্থাপিত হয়েছে নজরুল স্মৃতিফলক।

১৯৭৩ সালে ৪র্থ বারের মতো ৭৫ বছর বয়সে এক দিনের জন্য কবি এসেছিলেন চট্টগ্রামে। তখন তিনি ছিলেন অসুস্থ, হারিয়েছেন বাক ও স্মৃতিশক্তি। পরদিন তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

কবি নজরুলের ‘সিন্ধু’, ‘বাংলার আজিজ’, ‘কর্ণফুলী’ কাব্যে এবং ‘সিন্ধু হিন্দোল’ কাব্যগ্রন্থের উৎসর্গপত্রে চট্টগ্রাম সফরের কথা উল্লেখ রয়েছে। চট্টগ্রামে এসে কবি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘সম্মানের গান’। সন্দ্বীপ নিয়ে লিখেছিলেন গীতিনাট্য ‘মধুমালা’। এছাড়া লিখেছেন—চক্রবাক, শীতের সিন্ধু, শিশু যাদুকর, সাত ভাই চম্পার বেশ কিছু কবিতা, ‘আমার সাম্পান যাত্রী লয়’, ‘ওরে মাঝি ভাই তুই কি দুঃখ পেয়ে কুল হারালি অকুল দরিয়ায়’, ‘তোমায় কুলে তুলে বন্ধু আমি নামলাম জলে’, ‘পর জনমে দেখা হবে প্রিয়া’ ইত্যাদি কবিতা ও গান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংগীত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শান্তা গুহ বলেন, “এই চট্টগ্রাম কবির স্মৃতিধন্য। চট্টগ্রামে নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র হবে বলে শুনেছি। এটা হলে চট্টগ্রামের মানুষের জন্য আনন্দের বিষয় হবে। এতে নতুন প্রজন্ম কবি নজরুল সম্পর্কে জানতে পারবে।”




নতুন আসা কার্গো জাহাজে কিছুটা স্বস্তি, কমবে কি গ্যাস সংকট?

নতুন আসা কার্গো জাহাজে কিছুটা স্বস্তি, কমবে কি গ্যাস সংকট?
ছবি সংগৃহীত।

অবশেষে কক্সবাজারের মহেশখালীতে পৌঁছেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) কার্গো জাহাজ। শনিবার (২২ আগস্ট) রাতে এটি এক্সিলারেট টার্মিনালে যুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে টানা তিন দিন বন্ধ থাকার পর শনিবার (২২ আগস্ট) বিকাল থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। এতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়তে শুরু করেছে। তবে গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কিছুদিন লাগবে বলে জানালেন সংশ্লিষ্টরা।

জ্বালানি বিভাগের অনুমোদনে এলএনজি আমদানি তদারক করে পেট্রোবাংলা। আমদানির দায়িত্বে রয়েছে পেট্রোবাংলার কোম্পানি রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। এলএনজি সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আজকে আসা কার্গো জাহাজ এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালে আনলোডিং হবে। বিকাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে এক্সিলারেট টার্মিনাল। বেলা ২টা থেকে ১০ কোটি ঘনফুট করে সরবরাহ শুরু করেছে এক্সিলারেট। রাত ৯টার পর থেকে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও সময় লাগবে।

আরপিজিসিএলের চট্টগ্রাম কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মুহাম্মদ নাছির উদ্দীন  এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‌‘এলএনজি নিয়ে আসা নতুন কার্গো জাহাজ এমএলএনজি টার্মিনালে দুপুরে বার্থিং করেছে। আশা করছি, আজ রাত ১০টা নাগাদ আনলোডিং শুরু হবে। ইতিমধ্যে আজ বেলা ২টা থেকে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ শুরু করেছে এক্সিলারেট টার্মিনাল।’

আরপিজিসিএল সূত্রে জানা যায়, শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘ফ্লেক্স কারেজেস’ নামে কার্গো জাহাজটি মহেশখালীর ভাসমান এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে ভিড়েছে। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে কেনা এলএনজিবাহী জাহাজটি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যামেরন পোর্ট থেকে।

এর আগে টানা ২৫ দিনের তীব্র গ্যাস সংকটের পর ১৫ আগস্ট সামিটের টার্মিনাল পুরোদমে এবং এক্সিলারেটের টার্মিনাল আংশিক চালু হলে গ্যাস সরবরাহ বাড়ে। তবে এলএনজির নতুন কার্গো জাহাজ সেখানে উপস্থিত না থাকায় এক্সিলারেটের টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমতে কমতে গত বুধবার বিকালে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। টার্মিনালটিতে এলএনজি সরবরাহকারী জাহাজ রবিবার পৌঁছানোর কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের একদিন আগেই জাহাজটি পৌঁছে যাওয়ায় শনিবার টার্মিনালটি চালু করা সম্ভব হয়েছে। সেইসঙ্গে জাহাজ আসার পর টার্মিনালে থাকা মজুত থেকে সরবরাহ শুরু করেছে তারা।

মহেশখালীতে আমদানি করা এলএনজি সরবরাহের দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির, অন্যটি দেশীয় কোম্পানি সামিটের। এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত মহেশখালী ফ্লোটিং এলএনজি টার্মিনাল বেলা ২টায় চালুর পর ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে ৫৭০ মিলিয়ন ঘনফুটসহ মোট ৬৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।

গত ২১ জুলাই অগ্নিদুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। ১৫ আগস্ট তারা পুরোদমে এলএনজি সরবরাহের জন্য তৈরি হয়। কিন্তু নতুন এলএনজি কার্গো না আসায় পুরোনো মজুত থেকে আংশিক সরবরাহ শুরু করে। এক্সিলারেট বন্ধের পর থেকেই সক্ষমতার বেশি সরবরাহ করে আসছে সামিট। মাঝে এলএনজি না থাকায় সামিট থেকেও সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে।

আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, দিনে গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সর্বোচ্চ ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ করা হতো ১০৫ কোটি ঘনফুট, বাকিটা দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন করা হয়। এক মাস ধরেই এলএনজি সরবরাহ হচ্ছে গড়ে সক্ষমতার অর্ধেকের মতো। আজ দুপুর ১২টায়ও এলএনজি সরবরাহ ছিল ৫৮ কোটি ঘনফুট। বিকালে এটি বেড়ে ৬৮ কোটি ঘনফুট হয়। এতে মোট গ্যাস সরবরাহ বেড়ে হয়েছে ২৩০ কোটি ঘনফুট। আজ রাতে এলএনজি বেড়ে ৭৫ কোটি ঘনফুট হলে মোট সরবরাহ হবে ২৩৭ কোটি ঘনফুট। আগামী কয়েক দিন একই হারে সরবরাহ করা হতে পারে। এতে গ্যাসের সংকট পুরোপুরি কাটবে না। আরও সময় লাগবে।
 




নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার ‘হানিট্র্যাপ’-এ পুলিশ-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী

নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার ‘হানিট্র্যাপ’-এ পুলিশ-রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী
ছবি সংগৃহীত।

চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের এক নেতা ও তার চক্রের ‘হানিট্র্যাপ’-এর শিকার হয়েছেন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী। তাদের হানিট্র্যাপে ফেলে ব্ল্যাকমেইল করার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থার অনুসন্ধান সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার ছদাহা ইউনিয়নের ছৈয়দাবাদ এলাকার বাসিন্দা জোবাইরুল হক জিয়ান (৩১) উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক শিক্ষা ও পাঠচক্রবিষয়ক সম্পাদক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুন্দরী নারীদের পরিচয় ও ছবি ব্যবহার করে ফাঁদ পাতেন। পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রলুব্ধ করে ব্যক্তিগত মুহূর্তের গোপন ভিডিও ধারণ করে সেগুলো ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করেন।

প্রায় এক দশক ধরে তিনি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের টার্গেট করে এই প্রতারণা চালিয়ে আসছেন।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, জিয়ানের প্রতারণার প্রাথমিক ধাপ হলো সুন্দরী নারীর ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা। এরপর টার্গেট করা ব্যক্তির কাছে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বার্তা আদান-প্রদান। সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে কথোপকথন হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে সরিয়ে নেন। সেখানে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে নারীকণ্ঠে কথা বলে এবং অডিও-ভিডিও কলের মাধ্যমে কৌশলে ব্যক্তিগত মুহূর্ত ধারণ করেন। পরিচয় গোপন রাখতে নিজেকে কখনো চট্টগ্রামের পরিচিত তরুণী বা মডেল, কখনো এক সন্তানের মা ও স্বামী পরিত্যক্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন।

‘হানিট্র্যাপ’-এ সাবেক সিএমপি কমিশনার

তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন পাহাড়তলী থানার ওসি (বর্তমানে ডিবিতে) বাবুল আজাদের মাধ্যমে চট্টগ্রামের মডেল সানজিদা ইসলাম সায়মার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় জিয়ানের। বাবুল আজাদ সানজিদাকে নিজের ‘শ্যালিকা’ পরিচয়ে তৎকালীন চট্রগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে জিয়ান সানজিদা ইসলাম সায়মার নামে একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট তৈরি করে কমিশনারকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। পরে মেসেঞ্জার থেকে শুরু করে অডিও ও ভিডিও কলে তাদের যোগাযোগ চলতে থাকে। সায়মার আড়ালে মূলত কাজ করছিলেন জিয়ান নিজেই।

তদন্তে হাসিব আজিজের সঙ্গে কথোপকথনে ব্যবহৃত তিনটি মোবাইল নম্বর ও চারটি ভিডিও পাওয়া গেছে। এর একটিতে দেখা যায়, সানজিদা ইসলাম সায়মার ফেসবুক লাইভ থেকে ১৫ সেকেন্ডের অংশ কেটে এনে ভিডিও কলে চালানো হয়েছিল। এতে বোঝা যায় অপর প্রান্তে প্রকৃত সানজিদা ছিলেন না। ২০২৫ সালের শুরু থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই ভার্চুয়াল যোগাযোগের চারটি ভিডিওর একটিতে সাবেক কমিশনারকে আপত্তিকর অবস্থায় এবং বাকি তিনটিতে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায়।

হাসিব আজিজ চারটি ভিডিওর মধ্যে তিনটি নিজের বলে স্বীকার করলেও একটি ভিডিও এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করেছেন। ‘হানিট্র্যাপে’ পড়ার বিষয়টি স্বীকার করে  তিনি জানান, পরিচয়টি ভুয়া জানার পরই তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে দেন এবং অ্যাকাউন্টটি ব্লক করে দেন। তবে ওই চক্র তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, হাসিব আজিজের ব্যক্তিগত ভিডিও দিয়ে ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে সিএমপির বিভিন্ন থানার পদায়ন ও বদলিতে প্রভাব ফেলতেন ছাত্রলীগের জিয়ান ও দুই ওসি—বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলাম। পদায়ন ও বদলির দেনদরবার চূড়ান্ত হওয়ার পর জিয়ানকে দিয়ে সাবেক কমিশনার হাসিব আজিজের কাছে ফোন করানো হতো এবং কাঙ্ক্ষিত অফিস আদেশ আদায় করা হতো। মূলত কোন থানায় কাকে ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হবে কিংবা কাকে সরিয়ে দেওয়া হবে, এসব প্রশাসনিক বিষয়ে পুরো প্রভাব বিস্তার করত এই চক্র। সিএমপির তৎকালীন কর্মকর্তারা বিষয়টি জেনেও গোপন ভিডিও প্রকাশের আশঙ্কায় প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পাননি।

সূত্র জানিয়েছে, হাসিব আজিজ চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে এপিবিএনে যোগ দিলে সরকারের একটি দায়িত্বশীল সংস্থা অনুসন্ধান শুরু করে। সেই অনুসন্ধানে জিয়ানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রমাণ, গোপন ভিডিও ও অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়।

তদন্তে জানা যায়, জাহেদুল ইসলামকে কর্ণফুলী থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করার বিষয়টি আগেই একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় জানানো হয়েছিল। পদায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর জিয়ান ও জাহেদুলের মধ্যে সম্পর্ক আরও গভীর হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ওসি জাহেদুল জিয়ানকে একটি আইফোন উপহার দেন এবং নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে বিভিন্ন স্থানে ঘুরতে নিয়ে যান। জিয়ানের ফেসবুক প্রোফাইলে ওসির গাড়িতে চড়ে কর্ণফুলী টানেল পার হওয়ার ছবি পাওয়া গেছে।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে পাঁচলাইশ থানার বর্তমান ওসি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘এরকম তো অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়। কে, কখন, কোথায় তা ব্যবহার করেছে বা আমার সঙ্গে ছিল কি না, আমি আসলে জানি না।’

আর পাহাড়তলী থানার সাবেক ওসি ও বর্তমান সিএমপির ডিবি কর্মকর্তা বাবুল আজাদ বলেন, ‘আমার বিষয়ে অভিযোগের প্রমাণ নিয়ে ভালো করে নিউজ করেন। তার (জিয়ান) সাথে আমার সখ্যতা থাকার বিষয়টা আপনারা প্রমাণ করেন। আর এটা নিয়ে যে মেয়েটা ভুক্তভোগী তার সাথে কথা বলেন। তাহলেই সত্য-মিথ্যা সব প্রমাণ হয়ে যাবে।

এদিকে, বর্তমান সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে জানান।  তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। সাবেক পুলিশ কমিশনারও এ ধরনের কোনো অভিযোগ লিখিত বা মৌখিকভাবে জানাননি। আপনার কাছে কোনো তথ্য থাকলে দিন, আমি ব্যবস্থা নেব।’

ফাঁদে ফেলতে ৫৪ অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক, জিয়ানের পক্ষে ফোন প্রতিমন্ত্রীর!

ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের প্রতারণার পরিধি কেবল একটি বা দুটি ভুয়া অ্যাকাউন্টে সীমাবদ্ধ ছিল না; তদন্তে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট ৫৪টি নারী পরিচয়ের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। জিয়ান ‘জান্নাতুল মনি’ নামের একটি পরিচয়কে নিজের বোন হিসেবে এবং ‘জান্নাতুল নাইমা’ নামে আরেকটি ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন।

তদন্তে উঠে এসেছে, এই ভুয়া নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে জিয়ান এমনকি বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন সংসদ সদস্য, ডজনখানেক রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করেছেন।

চট্টগ্রাম পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা  জানান, সম্প্রতি জিয়ানকে গ্রেপ্তার করতে সোর্স নিয়োগ করে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। তার বসতবাড়িতে নজরদারিও বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি জানতে পেরে জেলা পুলিশকে থামাতে বর্তমান একজন প্রতিমন্ত্রীকে দিয়ে ফোন করান জিয়ান।

সরকারি যে সংস্থা বিষয়টি তদন্ত করছে তারা সাবেক সিএমপি কমিশনারের হানিট্র্যাপে পড়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিলেও অন্যদের বিষয়ে কী কী জানা গেছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে অন্য রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের নাম-পরিচয় জানতে পারেনি ।

এদিকে, বর্তমান সরকারের কোন প্রতিমন্ত্রী ছাত্রলীগ নেতা জিয়ানের জন্য সম্প্রতি সুপারিশ করেছেন তা নিয়েও মুখ খুলছে না চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। তাই বিষয়টি এখনো গোপন রয়েছে। তবে পুলিশ প্রশাসনে এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে নানা আলোচনা চলছে বলে সূত্রে জানা গেছে।

আগে ট্র্যাপে ফেলতেন আওয়ামী নেতাদের

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোবাইরুল হক জিয়ানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ইতিহাস নতুন নয়। ২০২০ সালের ২৯ মে সাতকানিয়া থানা-পুলিশের এক বিশেষ অভিযানে তিনি প্রথম গ্রেপ্তার হন। তখন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমের মেয়ের ছবি ও পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ভুয়া প্রেমের সম্পর্ক তৈরি করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। সেখানে ব্যক্তিগত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখিয়ে অর্থ দাবির পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে নারীকণ্ঠে কথা বলে ঘনিষ্ঠতা তৈরির প্রমাণ পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাতকানিয়ায় পরিচালিত ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের সময় আবারও গ্রেপ্তার হন জিয়ান। সে সময়ও ভুয়া নারী পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষকে ব্ল্যাকমেইল করা এবং মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার নাম করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিশ্চিত করেছিল পুলিশ।

বারবার গ্রেপ্তারের পরও তার অপরাধ কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার যোগাযোগের জাল রাজনৈতিক অঙ্গন পেরিয়ে পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।

সাতকানিয়া পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর রাসেল উদ্দিন  বলেন, প্রতারক জিয়ানের নানা অপকর্মের তথ্য পুলিশের কাছে প্রেরণ করা ও প্রতিবাদ করায় আমাকে ওসি বাবুল আজাদের নির্দেশে এসআই মনিরুলসহ একটি দল নগরের রাইফেল ক্লাব এলাকা থেকে আটক করে। পরে আমাকে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমি আড়াই মাস জেলে ছিলাম।

জিডি করেছেন আসল মডেল সায়মা

এদিকে নিজের নাম ও ছবি ব্যবহারের বিষয়টি জানতে পেরে পাঁচলাইশ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন প্রকৃত মডেল সানজিদা সায়মা।

তিনি  বলেন, আমার নাম ব্যবহার করে ফেক অ্যাকাউন্ট খুলে পুলিশের কর্মকর্তার সঙ্গে নানা অপকর্ম করেছে বলে জানতে পারি। এ ঘটনায় আমি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছি। যদিও পুলিশ এখন পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে আমাকে আর কোনো আপডেট দেয়নি। এভাবে আমার মানহানির জন্য দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

কী বলছেন অভিযুক্ত জিয়ান

অভিযুক্ত জোবাইরুল হক জিয়ান সব অভিযোগ অস্বীকার করে  বলেন, ‘এটি আমাদের পারিবারিক দ্বন্দ্বের বিষয়। বিষয়টি নিয়ে একটি পক্ষ অপপ্রচার চালাচ্ছে। যে দুই ওসির কথা বলা হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। সিএমপি কমিশনারের মতো মানুষের কাছে আমি কিছুই না। তিনি চাইলেই তো আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারতেন, তিনি নিলেন না কেন?’