এই মাত্র পাওয়া :

বাংলাদেশ , মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০

জুম চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী

লেখক : admin | প্রকাশ: ২০২০-০৯-১২ ১৩:৪৪:২১

বিকল্প কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, এলাকা ছেড়ে অন্যত্র অবস্থান, জুম চাষে ফলন কম ও পরিশ্রম বেশি হওয়ায় অনেকে বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ চাষ থেকে সরে আসছেন

বদরুল ইসলাম মাসুদ :
জুম চাষ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালে এক বিশেষ ধরণের চাষাবাদ পদ্ধতি। পাহাড়ি মানুষের ঐতিহ্যবাহী এই ‘জুম’ শব্দটি থেকে চাকমা ভাষায় ‘জুমিয়া’ (জুম চাষী) ও জুম্ম (পাহাড়ি জনজাতি) শব্দটির উৎপত্তি। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান-এই তিন জেলা নিয়ে গড়ে ওঠা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড়িই জুম চাষী।


পার্বত্য চট্টগ্রামে বংশ পরম্পরায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রাচীন পেশা জুম চাষ হলেও দিনে দিনে বিকল্প চাষাবাদে ঝুঁকছেন অনেকে। বৈরী আবহাওয়া, ফলন কমে যাওয়া এবং জুম চাষের পাহাড় কমায় আগ্রহ হারাচ্ছেন চাষীরা।
তবে বর্তমান সময়ে পাহাড়ে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, অসংখ্য বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও), ক্ষুদ্র ও মাঝারী পর্যায়ের শিল্প-কারখানা, পর্যটনের ব্যাপক প্রসার হওয়ায় সেখানে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরফলে কয়েকশত বছরের বংশ পরম্পরায় করে আসা এ জুম চাষের প্রতি আগ্রহ কমে গেছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকজনের। এছাড়া আগের তুলনায় লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর। উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেকেই পাহাড় ছেড়ে রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছেন। এছাড়া পাহাড়েও বর্তমানে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় পাহাড়িদের নতুন প্রজন্ম উচ্চ শিক্ষার জন্য শহরমুখী হয়ে পড়েছে। এরফলেও জুম চাষের পরিমাণ কমে আসছে।
পাহাড়ের বাসিন্দা ও জুম চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জুম চাষ হচ্ছে পাহাড়ের ঢালে এক বিশেষ ধরণের চাষাবাদ পদ্ধতি। পাহাড়ি মানুষের ঐতিহ্যবাহি এই ‘জুম’ শব্দটি থেকে চাকমা ভাষায় ‘জুমিয়া’ (জুম চাষী) ও জুম্ম (পাহাড়ি জনজাতি) শব্দটির উৎপত্তি। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- এ তিন জেলা নিয়ে গড়ে ওঠা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড়িই জুম চাষী।


এ দেশের পাহাড় ও বনাঞ্চল হচ্ছে সরকারি খাস জমি। যুগ যুগ ধরে বংশপরম্পরায় সেখানে বসবাসরত পাহাড় ও অরণ্যচারী মানুষের এ সব জমির বন্দোবস্ত কোনো সরকারের আমলেই দেওয়া হয়নি। তাই পাহাড় ও বনাঞ্চলের ওপর আদিবাসী মানুষের এখনো কার্যত জন্মেনি কোনো অধিকার।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে বন বিভাগ রাঙ্গামাটিতে সদর দফতর করে কৃষি প্রধান অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামে ‘জুম নিয়ন্ত্রণ প্রকল্প’ চালু করে। এর উদ্দেশ্য ছিলো- জুমিয়াদের জুম চাষে নিরুৎসাহিত করে সমতলের জমিতে বনজ ও ফলজ চাষে তাদের উৎসাহিত করা। এক দশক আগেও বন বিভাগের এই প্রকল্প খাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হতো। কিন্তু বাস্তবতার কারণেই এই প্রকল্প কখনোই সফল হয়নি। এখন এই প্রকল্পখাতে সরকারি অর্থ বরাদ্দও নেই।
গবেষণা সূত্রে জানা গেছে, জুম চাষের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরনো। পার্বত্য চট্টগ্রাম, গারো ও খাসিয়া পাহাড়ের বাইরে ভারতের অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও ত্রিপুরা- ‘সেভেন সিস্টার্স’ খ্যাত এই সাতটি রাজ্যে জুম চাষ ব্যাপকভাবে প্রচলিত। এছাড়া চীন, নেপাল, মায়ানমার, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন মঙ্গোলিয় জনগোষ্ঠির পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষের প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।


পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের নিজস্ব শাসনরীতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী কার্বারি (গ্রাম প্রধান) ও হেডম্যান (মৌজা প্রধান) নির্ধারণ করেন কোন পাহাড়ে কোন কোন জুমিয়া পরিবার কখন জুম চাষ করবেন। এ কারণে এ চাষাবাদ নিয়ে বিরোধ হয় না। পাহাড়ের এই চাষ পদ্ধতি বেশ কষ্টসাধ্য। জুম চাষে একটি পরিবারের পাহাড়ি নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর সকলেই অংশ নেন। আবার কোনো একটি বড় পাহাড়ে কয়েকটি গ্রামের জুমিয়ারা ঐক্যবদ্ধভাবে জুম চাষ করে থাকেন।
চাষের মৌসুমে প্রথমে নির্বাচিত পাহাড়টির জঙ্গল ও আগাছা বিশেষ কৌশলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। কৌশলে আগুন ধরানো হয় বলে বনাঞ্চলে এই আগুন যেমন ছড়িয়ে পড়ে না, তেমনি টিকে থাকার স্বার্থেই পাহাড়িরা জুম চাষ করতে গিয়ে বন ও চাষ এলাকার কোনো বড় বা দামি গাছের ক্ষতি করেন না। বৃষ্টির পর নির্বাচিত জুমের জমিতে পুড়ে যাওয়া জঙ্গল ও আগাছার ছাই সারের কাজ করে। এর পর বিশেষ ধরণের ছোট দা’এর মাধ্যমে ছোট্ট ছোট্ট গর্ত করে একই সঙ্গে কয়েক ধরণের ফসল বোনা হয়। ধান, গম, ভূট্টা, আলু, কলা, তরমুজসহ জুমের জমিতে প্রায় সব ধরণের খাদ্য শষ্য ও শাক-সব্জি চাষ করা হয়। জুমের ফসলের বীজ সমতলের চেয়ে ভিন্ন। এসব ফসল উৎপাদনে কোনো ধরণের সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হয়না। আর জুমের শষ্য, ফল-মূল ও তরি-তরকারির আকার-আকৃতি সমতলের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের চেয়ে ভিন্ন; এগুলো খেতে খুবই সুস্বাদু।


জুমের ফসল পরিচর্যার জন্য চাষাবাদের পাহাড়ে জুমিয়ারা গড়ে তোলেন অস্থায়ী মাচাং ঘর (চাকমা ভাষায়, মোনঘর)। এই মনঘরে চাষাবাদের মৌসুমে জুমিয়ারা একই সঙ্গে যেমন ফসলের দেখভাল করেন, তেমনি বুনো শুকর বা অন্য জীব-জন্তু ও পাখ-পাখালি যেনো ফসলের ক্ষতি করতে না পারে, সেদিকেও তারা লক্ষ্য রাখেন। জুমের জমি ঘিরে এ জন্য ‘কাবুক’সহ নানা ধরণের ফাঁদ পাতা হয়। তঞ্চঙ্গা জুমিয়াদের আবার এসব ফাঁদ পাতার সুখ্যাতি রয়েছে।
জুমচাষীরা জানান, ৫-৬ দশক আগেও একবার কোনো পাহাড়ে জুম চাষ করার পর অন্তত ১৫-২০ বছর সেখানে আর জুম করা হতো না। সেখানে এই দীর্ঘ সময়ে প্রাকৃতিক বনাঞ্চল গড়ে ওঠার সুযোগ দেয়া হতো; রক্ষা পেতো পাহাড়ি জমির উর্বরতা। কিন্তু ৬০ দশকে কাপ্তাই বাঁধের কারণে বিপুল সংখ্যক পাহাড় পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় সংকুচিত হয় জুমের জমি। আর ৮০ র দশক থেকে এখনো পাহাড়ে সমতল অঞ্চল থেকে অপরিকল্পিতভাবে বাঙালিদের অভিবাসন গড়ে উঠছে।
এমনিভাবে দিন দিন জনসংখ্যার চাপে ও বন বিভাগের নানা নিয়ম-কানুনের ফলে সংকুচিত হচ্ছে জুমের জমি। তাই জুমিয়ারা অনেক জায়গাতেই এখন বাধ্য হয়ে মাত্র পাঁচ-ছয় বছরের ব্যবধানে একই পাহাড়ে আবারো জুম চাষ করছে। এতে প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে যাচ্ছে পাহাড়ের উর্বরতাও। তাই বিচ্ছিন্নভাবে অনেক জুমিয়া এখন চাষের জমিতে ধুপ সার বা ইউরিয়া ব্যবহার করছেন; যা আগে কখনোই দেখা যায়নি।
অন্যদিকে নানা কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে লোকজন পাহাড়ে এসে বসবাস, জমি ক্রয় ও নানা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, জুমের জমি সংকুচিত ও পাহাড়ের উর্বরতা নষ্ট হওয়া, বিকল্প আয়ের অভাব, চার দশক ধরে জুম নিয়ন্ত্রণের নামে বন বিভাগের মিথ্যে মামলাসহ নানা হয়রানী, এসব কারণে অর্থনৈতিকভাবে মার খেতে খেতে প্রান্তিক চাষী জুমিয়াদের জীবন এখন প্রায় বিপন্ন।


এসব কারণে কয়েকশত বছরের ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের প্রতি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আগ্রহ কমে আসছে বলে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে। তারা বলছেন, জুম চাষের জন্য একেক সময় একেক জায়গায় অবস্থান করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এটা সম্ভব নয়। তাই তারা বিকল্প কর্মসংস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছেন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ পাওয়ায় জুম চাষে তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

Print Friendly and PDF